একজন স্বাভাবিক জ্ঞানসম্পন্ন, প্রাপ্তবয়স্ক, মুসলিম যদি ‘নিসাব’ পরিমাণ সম্পদের মালিক থাকেন, তাদের পক্ষ থেকে একটি কোরবানি দেওয়া ওয়াজিব বা আবশ্যক। ইসলামে ফজিলতপূর্ণ একটি ইবাদত হচ্ছে কোরবানি। আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় আত্মোৎসর্গ করাকে বলা হয় কোরবানি। তাৎপর্যমণ্ডিত আমল এটি। অনেককেই বলতে শোনা যায় যে, কোরবানি না দিয়ে এ টাকা গরিব-দুঃখী অসহায় মানুষের মাঝে দান করে দেওয়া উত্তম। এই ব্যাপারে ইসলামী শরিয়ত কি বলে চলুন জেনে নেই- ইসলামি শরিয়তে কোরবানি না করে গরিব-দুঃখীকে দান-অনুদান দেয়ার কোনো অনুমোদন নেই এবং কোনো সুযোগও নেই। যদিও অনেকে মহামারির এ সময়ে বিপুল সংখ্যক মানুষ অভাবের কথা চিন্তা করেই কোরবানি না করে তার অর্থ গরিবদের মধ্যে বিতরণ করে দেওয়া কথা বলেছেন। কোরআন সুন্নাহর দিকনির্দেশনার ভিত্তিতে প্রায় সব ওলামায়ে কেরাম এ বিষয়ে একমত যে, সামর্থ্যবানদের জন্য কোরবানির পশু জবাই করাই ওয়াজিব। একান্তই কেউ যদি নির্ধারিত তিন দিন (১০, ১১ ও ১২ জ্বিলহজ) কোনো কারণবশত কোরবানি করতে না পারে তবে কোরবানির দিনগুলো চলে যাওয়ার পর একটি বকরির মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। হজরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে কোরবানি (পশু জবাই) করেছেন। ঈদুল আজহায় পশু কোরবানি করা একটি সুনির্দিষ্ট ইবাদত ও বিধান। এটি পালন করতে হয় নির্দিষ্ট সময় ১০ থেকে ১২ জ্বিলহজের মধ্যে। এটা ওয়াজিব বিধান ও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন- وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنسَكًا لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَى مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ فَإِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌ فَلَهُ أَسْلِمُوا وَبَشِّرِ الْمُخْبِتِينَ ‘আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্যে কোরবানি নির্ধারণ করেছি, যাতে তারা আল্লাহর দেওয়া চতুস্পদ জন্তু জবেহ কারার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। অতএব তোমাদের আল্লাহ তো একমাত্র আল্লাহ সুতরাং তারই আজ্ঞাধীন থাক এবং বিনয়ীগণকে সুসংবাদ দাও।’ (সুরা হজ : আয়াত ৩৪) রাসূলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞাসা করা হলো- ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোরবানি জিনিসটা কী? জবাবে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, এটা হচ্ছে তোমাদের পিতা হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত।’ এ গুরুত্বপূর্ণ বিধানটি নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকের জন্য জ্বিলহজ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত এই তিন দিন পালন করা ওয়াজিব। মনে রাখতে হবে কোরবানির চেয়ে টাকা দান করে দেওয়া যদি উত্তম হতো বা সুযোগ থাকতো তবে রাসূলুল্লাহ (সা.) কোরবানিতে পশু জবাই না করে সে অর্থ গরিব-দুঃখী অসহায় মানুষের মাঝে দান করে দিতেন। তবেই প্রমাণিত হতো যে, অভাবের সময় কোরবানি না দিয়ে গরিব-দুঃখী ও অসহায়দের মাঝে কোরবানির অর্থ দান করে দেওয়াই সর্বোত্তম। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সা.) পশু জবাই করেছেন। শুধু পশু কোরবানি করেছেন তা-নয়; বরং, কোরবানির পশু তার সাহাবিদের মধ্যে বণ্টন করে দিয়েছেন এবং সাহাবিদের উদ্দেশে বলেছেন যে, তোমরা (কোরবানি) জবাই কর।’ তিনি কিন্তু এ কথা বলেননি যে, তোমাদের মধ্যে সদকা করে দিয়েছি, তোমরা নিয়ে যাও। বরং জবাই করতে নির্দেশ দিয়েছেন। পশু কোরবানি করার ব্যাপারে হজরত হাসান বসরি (রাহ.) বলেন, ‘আল্লাহর রাস্তায় তার সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি হিসেবে একটি ছাগল জবাই করা আমার কাছে ১০০ দিরহাম আল্লাহর রাস্তায় সদকা করার চেয়েও উত্তম। কারণ আল্লাহর রাস্তায় এই রক্ত প্রবাহিত করার বিষয়টিকে আল্লাহ তায়ালা ইসলামের একটি মৌলিক নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।’ সুতরাং সামর্থ্যবানদের জন্য এটি সুস্পষ্ট যে, কোরবানির টাকা গরিব-দুঃখীদের মাঝে বণ্টন নয়; বরং কোরবানি করাই উত্তম। তবে একটি বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে... যারা অন্যান্য বছরগুলোতে বেশি পরিমাণে কোরবানি করতেন; ইচ্ছা করলে তারা এবার বেশি কোরবানি বা অতিরিক্ত টাকা খরচ না করে; বাড়তি টাকা গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে পারেন। এটি করার সুযোগ রয়েছে। এতে কোরবানিও আদায় হবে আবার গরিব-অসহায় মানুষও সাহায্য পাবে। এখন করোনা চলছে। এ সময়ে অন্য সময়ের চেয়ে বেশি সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। কোরবানির হাটে ও কোরবানির সময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। সরকারিভাবে কোরবানির জন্য স্থান নির্ধারণ করে দেওয়া হলে; শৃঙ্খলার জন্য, পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখার জন্য নির্দেশ দিলে সেটাও মেনে চলা উচিত। #ডেইলি বাংলাদেশ