হারিয়ে যাবে কি নগেন্দ্রবাড়ির পূজা মন্ডপ?

দুর্গাপূজা বা দুর্গোৎসব হলো হিন্দু দেবী দুর্গার পূজাকে কেন্দ্র করে প্রচলিত একটি উৎসব। দুর্গাপূজা সমগ্র হিন্দুসমাজেই প্রচলিত। তবে বাঙালি হিন্দু সমাজে এটি অন্যতম বিশেষ ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। আশ্বিন বা চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে দুর্গাপূজা করা হয়। আশ্বিন মাসের দুর্গাপূজা শারদীয়া দুর্গাপূজা এবং চৈত্র মাসের দুর্গাপূজা বাসন্তী দুর্গাপূজা নামে পরিচিত। শারদীয়া দুর্গাপূজার জনপ্রিয়তা বেশি। বাসন্তী দুর্গাপূজা মূলত কয়েকটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠ থেকে দশম দিন পর্যন্ত শারদীয়া দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচটি দিন যথাক্রমে “দুর্গাষষ্ঠী”, “মহাসপ্তমী”, “মহাষ্টমী”, “মহানবমী” ও “বিজয়া দশমী” নামে পরিচিত। আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষটিকে বলা হয় “দেবীপক্ষ”। দেবীপক্ষের সূচনার অমাবস্যাটির নাম মহালয়া; এই দিন হিন্দুরা তর্পণ করে তাঁদের পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধানিবেদন করে। দেবীপক্ষের শেষ দিনটি হল কোজাগরী পূর্ণিমা। এই দিন হিন্দু দেবী লক্ষ্মীর পূজা করা হয়। সেক্ষেত্রে মহালয়ার আগের নবমী তিথিতে পূজা শুরু হয়।

দুর্গাপূজা ভারত, বাংলাদেশ ও নেপালসহ ভারতীয় উপমহাদেশ ও বিশ্বের একাধিক রাষ্ট্রে পালিত হয়ে থাকে। তবে বাঙালি হিন্দু সমাজের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হওয়ায় শেরপুরে কিন্তু জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হয়। দুর্গা পূজা উপলক্ষে বড় বড় প্যান্ডেল বানানো হয়। বিভিন্ন রকম আলো দ্বারা সু-সজ্জিত করা হয়। এই উৎসবে সকলে নতুন জামা কাপড় পড়ে। এইসময় সমস্ত স্কুল, কলেজ, অফিস বন্ধ থাকে। সকালে পূজা হয় এবং সন্ধ্যায় হাজার হাজার মানুষ প্যান্ডেলে প্রতিমা দর্শন করতে বেড়ান। অষ্টমীতে কুমারী পূজা ও সন্ধিপুজা, নবমীতে নবমী পূজা এবং দশমীতে সিঁদুর খেলা এই উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ এবং দৃষ্টান্তমূলক বিষয়।

দূর্গাপূজার আর বাকী কিছুদিন। ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে পূজার রমরমা ব্যবসা। চলছে প্রতিমা তৈরির কাজ। হিসাবনুযায়ী ২৯ সেপ্টেম্বর (রবিবার) মহালয়া, তিন অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) পঞ্চমী, চার অক্টোবর (শুক্রবার) ষষ্ঠী, পাঁচ অক্টোবর (শনিবার) সপ্তমী, ৬ অক্টোবর (রবিবার) অষ্টমী, সাত অক্টোবর (সোমবার) নবমী, আট অক্টোবর (মঙ্গলবার) বিজয়া দশমী। তবে শেরপুরের ঐতিহ্যবাহী নগেন্দ্রবাড়ির পূজা মন্ডপ হবে কি; না হারিয়ে যাবে ১২৫তম এ পূজা মন্ডব? জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার খালডাঙ্গা পালবাড়ীর পূজা দেখা না হলে মন অতৃপ্ত থেকে যায়, মনে হয় দূর্গা পূজা দেখা হয়নি, তাই তো পরিবার-পরিজন নিয়ে প্রতি বছর নদীর ওপারে পালবাড়ীর দূর্গা পূজা দেখতে ছুটে আসে হাজারো ভক্ত; দূর্গামায়ের চরণে প্রণাম করে-অঞ্জলি দেয়’ এমন কথা অসংখ্য হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মুখে মুখে। পাহাড়ি খরস্রোতা নদী ভোগাইবিধৌত খালডাঙ্গা মহল্লার পালবাড়ীতেই হতো উৎসবমুখর পরিবেশে দূর্গা পূজা। কিন্তু এখন আর আগের মতো উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয় না দূর্গা পূজা। সময়ের স্রোতে তা কিছুটা ভাটা পড়ে যায়।

ইতিহাসনুযায়ী, ১৮৯৫ সালে পালপাড়ায় মঙ্গল রাম সরকার পারিবারিকভাবে তৈরি করেন শ্রী শ্রী মঙ্গল ভবন পূজা মন্ডপ। তৈরির পর থেকেই পারিবারিকভাবে চলতে থাকে দূর্গা পূজা। হঠাৎ মঙ্গল রাম সরকার সর্গীয় হয়। এরপর থেকেই ঐতিহ্যবাহী এ মন্ডপটির হাল ধরেন তার ছেলে নালিতাবাড়ীর শিক্ষাগুরু নগেন্দ্র। যাকে (নগেন্দ্র স্যার) হিসেবেই সবাই চিনেন বা জানেন। এরপর নগেন্দ্র সর্গীয় হলে তার ৪ছেলে মন্ডপটি রক্ষায় কাজ করেন। ধীরে ধীরে শ্রী শ্রী মঙ্গল ভবন পূজা মন্ডপটি পালবাড়ির নগেন্দ্র পূজা মন্ডপ হিসেবে মানুষের মনে জায়গা করে নেয়। যা পারিবারিক থেকে সার্বজনীন এ পরিণিত হয়। তারপর অনেক বছর উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয় দূর্গা পূজা। শতবর্ষী পুরনো ঐতিহ্যবাহী এ মন্ডপে আগে দূর্গাপূজাকে ঘিরে এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এক সম্প্রীতির বন্ধন সৃষ্টি হতো। কে হিন্দু কে মুসলিম তার বালাই নেই। সকলে মিলে একসঙ্গে দূর্গোৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করতেন। পূজা মণ্ডপের সামনে প্রতিদিন সন্ধ্যায় আরতি ও লোকজ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কেবল দূর্গাপূজার ধর্মীয় অনুসঙ্গ থাকেনি, হয়ে উঠেছে সব শ্রেণীর মানুষের আনন্দ-বিনোদনের অংশ। কিন্তু ২০০৮সালে পূজা চলাকালিন সময়ে একটি শিশু মারা যায় সেখানে। এরপর কিছুদিন পর শিল্প মন্ত্রনালয়ের সহকারি সচিব নগেন্দ্র’র ছোট ছেলে উৎপলাখ্য সর্গীয় হওয়ার পর থেকেই মন্ডপটি কিছুটা ভাটা পড়ে যায়। যা এখনো ভাটায় রয়ে আছে। কিন্তু অনেকেই মনে করছেন ঐতিহ্যবাহী নগেন্দ্রবাড়ির পূজা মন্ডপটি কি হারিয়েই যাবে?

লেখক- শাকিল মুরাদ
সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী
মেইল: exclusivebyshakil@gmail.com

শেরপুর টাইমস ডট কম-এর মতামত পাতায় প্রকাশিত লেখার দায়ভার লেখকের নিজের। এর দায় শেরপুর টাইমস কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করবে না। সমসাময়িক বিষয় নিয়ে শেরপুর টাইমসের মতামত পাতায় আপনিও আপনার মতামত জানাতে পারেন sherpurtimesdesk@gmail.com এই মেইলে।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।