হারিয়ে গেছে প্রেমের রঙিন চিঠি

হারিয়ে গেছে প্রেমের রঙিন চিঠি
নাঈম ইসলাম

‘‘করুণা করে হলেও চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও/ আঙ্গুলের মিহিন সেলাই/ ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও, এটুকু সামান্য দাবি, চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতো/ অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি। কবি মহাদেব সাহার এ কবিতার মতো প্রেমিকাকে করুণা করে হয়তো এখন আর বলেনা প্রেমিক।

হারিয়ে গেছে চিঠি! হারিয়ে গেছে প্রিয়জনকে লেখা কাগজে লেখার সেই সোনালী যুগ। “নাই টেলিফোন, নাইরে পিয়ন, নাইরে টেলিগ্রাম, বন্ধুর কাছে মনের খবর কেমনে পৌঁছাইতাম” গানগুলোও এখন আর গাওয়া হয়না।

চিঠি লিখলাম ও লিখলাম তোমাকে পরে জবাব দিয়োগো আমাকে।’ সিনেমার এ গানের মতো কোনো প্রেমিকও প্রেমিকার চিঠির অপেক্ষায় আর থাকে না। সাইকেলের বেল বাজিয়ে ডাক পিয়নের ‘চিঠি এসেছে…চিঠি…এই যে চিঠি…’ এমন কথাও আর শোনা যায় না।

ইন্টারনেট এর কল্যাণে মুঠোফোন, ইন্টারনেট, চ্যাট, মেসেঞ্জার, গ্রুপ মেসেজ, ই-মেইল, এসএমএস আর ফেসবুকের গতির ধাক্কায় কাগজ-কলমে হাতে আবেগের লেখা হয় না।

প্রেমের চিঠি কাগজে লিখতে কত পাতা যে ভরে যেত তার কোন সীমারেখা থাকত না। বিশেষ করে নতুন প্রেম হলে ত কথায় নেই। চিঠিতে বেশি পাতা হলে খামের ওপর বাড়তি টিকিট লাগাতে হতো। এর জন্য দিতে হতো বেশি টাকাও। প্রেমের চিঠিতে লেখার সঙ্গে মিশে থাকত ভাবনা আর আবেগের রুপালি মিশ্রণ। একে অপরের হৃদয়ের কত গভীরে পৌঁছা যায় তার প্রতিযোগিতা শুরু হতো লেখা দিয়ে। আবার চিঠি পাঠানোর কাগজের ভাঁজে গোলাপের পাপড়ি ছিটিয়ে দেয়া ছিল বাড়তি অনুভূতির বিষয়।

প্রেমের এই চিঠি আদান-প্রদানও ছিল অপূর্ব অনূভুতি। লুকিয়ে চিঠি লিখে তা খামে ভরে পোস্ট অফিসের বাক্সে ফেলার পর শুরু হতো ফিরতি চিঠির প্রহর গোনা। আর চিঠি পড়তে হতো খুব গোপনে, যেন বাড়ির কেউ না দেখে। এই ক্ষেত্রে প্রেমিক-প্রেমিকা উভয়ই সুসম্পর্ক রাখত পিয়নের সঙ্গে।

কারণ অভিভাবকের হাতে যেন চিঠিটা কোনভাবেই না পড়ে। আর প্রেমিক-প্রেমিকার বিয়ে হলে সেই বিয়েতে অবশ্যই নিমন্ত্রণ পেত পিয়ন মশাই।

আমার হাতের লেখা মোটামুটি সুন্দর ছিল। তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। আমার ক্লাসমেট আঃ আজিজ পাশের স্কুলের লতাকে পছন্দ করত আর লতাও। ত আমি চিঠি লিখে দিতাম আঃআজিজ কে। সে টিফিনের সময় বাই সাইকেলে করে স্কুলফিল্ডের ঝালমুড়ির দোকানে দাঁড়িয়ে থাকতো, লতা আসত সেখানে। টুপ করে চিঠিটা লতাকে দিয়ে চলে আসত বেচারা। এভাবেই ছিল তাদের চিঠির প্রেম। এইতো সেদিন আঃআজিজের সাথে দেখা। সাথে স্ত্রী আর ৬ বছরের কন্যা। লতারও নাকি বিয়ে হয়েছে খুব ভাল ঘরে। তবে, স্কুলজীবনের পরে আর লতার সাথে আর দেখা হয়নি আমার।

বন্ধু রিপনের প্রেমের চিঠিও আমি লিখে দিতাম সুরাইয়ার জন্য। খুব রসায়ন ছিল তাদের প্রেমে। তারপর, ক্লাস এইটেই অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায় সুরাইয়ার। শুশুরবাড়ির ঠিকানাতেও কয়েকটা চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কয়েকজন ছাত্রীর চিঠিও আমি লিখে দিতাম সেসময়ে।

এখন আর চিঠির সেই সোনালী দিন আর নেই।

উল্লেখ্য , বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল কুষ্টিয়া জেলার মুজিবনগরে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় ৫০টি মাঠ পর্যায়ের ডাকঘর চালুর মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেছিল ডাক বিভাগ।

লেখক – নাঈম ইসলাম,
সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী।

 

শেরপুর টাইমস ডট কম-এর মতামত পাতায় প্রকাশিত লেখার দায়ভার লেখকের নিজের। এর দায় শেরপুর টাইমস কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করবে না। সমসাময়িক বিষয় নিয়ে শেরপুর টাইমসের মতামত পাতায় আপনিও আপনার মতামত জানাতে পারেন sherpurtimesdesk@gmail.com এই মেইলে।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।