হাত বাড়ালেই ভালোবাসা

হাত বাড়ালেই ভালোবাসা
– রফিক মজিদ

হাত বাড়ালেই ভালোবাসা। কথাটা শুনে যে কারোরই চোখ কপালো উঠবে। ভালোবাসা কি এতোই সহজ। হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়। কিন্তু আমি তো তাই দেখে এলাম ভারতের মেঘ রাজ্য খ্যাত মেঘালয়ের শিলং এ

হ্যাঁ, ওখানে ভালোবাসা মিলে প্রায় ৮ হাজার ফুট উচু পাহাড়ের চূড়ায় সারি সারি পাইন গাছের ছায়া ঘেরা পথে। যেখানে মেঘেদের ছুটাছুটি, রোদের কানামাছি খেলা আর পাহাড়ের গা’য়ে ঝর্ণার দাপাদাপিতে সেখানে ভালোবাসা থাকবে নাতো কি থাকবে ? প্রিয়জনকে নিয়ে যারা ওই মেঘ রাজ্যে গিয়েছে তারা প্রকৃতির প্রেমে হারিয়ে যেতে বাধ্য। সেইসাথে প্রকৃতির প্রেমের সাথে সাথে মানব-মানবীর প্রেমের গভিরতাও বেড়ে যায় বহুগুনে। অনেকেই বলে, প্রেম নাকি স্বর্গে থেকে আসে। প্রকৃতি তো স্বর্গেরই স্মৃষ্টি। আর মানুষ তো প্রেমে পড়ে প্রকৃতির রূপ তার প্রিয়ার মাঝে দেখে। যেমন, মেঘ কালো চুল, আকাশের মতো হৃদয়, ঝর্ণার মতো শিতল বুকের পাঁজর ইত্যাদি।

স্রষ্টার সৃষ্টি জীব মানুষ। তারপর এই মানুষের জন্য প্রেম-ভালোবাসায় মত্য থাকতে স্মৃষ্টি করেছে প্রকৃতি। ভারতের সেই মেঘালয়ের অপরূপ প্রকৃতির প্রেমে যেকোন মানব সন্তান মোহিত হবেই। সেইসাথে মানব-মানবি’র প্রেমের গভিরতা আরো বেড়ে যাবে সেই চোখ ধাঁধানো স্ররষ্টার স্মৃষ্টি দেখে। হাজার হাজার ফুট উচু পাহাড় থেকে কল কল শব্দে আঁছড়ে পড়ছে ঝর্ণা। মেঘের উপরে উঠা ওই পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে মেঘ ধরার অনুভূতি কেবল লেখনির মাধ্যমে বোঝানো সম্ভব নয়।

আমি আমার পরিবার নিয়ে মাত্র চার দিনের জন্য সম্প্রতি ঘুরে এলাম মেঘ রাজ্যের সেই মেঘালয়ের শিলং এ। শিলং শহর থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী বৃষ্টি পাত খ্যাত চেরাপুঞ্জির দুরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমটার পথ। কিন্তু সে পথে যেতে যেতে খাসিয়া পাহাড় ঘেরা আঁকাবাঁকা পথে প্রায়ই মেঘরা এসে আঁছড়ে পড়ে চলন্ত পথের পাহাড়ের গাঁয়। এছাড়া বড় বড় পাথরের উপর দিয়ে বয়ে চলা ঝর্ণার কল কল শব্দ আপনাকে ডাকবে আফিমের নেশার মতো। ঠিক থাকতে পারবেন না ওই শব্দ শুনে। ক্ষনিকের জন্য হলেও ছুটে যাবেন সেই ঝর্ণার বুকে। হাত দিয়ে তুলে আনবেন প্রেয়সির জন্য মুঠো ভরে ঝর্ণার স্বচ্ছ পানি। প্রেয়সির গায় ছিটিয়ে দিয়ে ভালোবাসায় শিক্ত হবেন দু’জনায়। সে এক অন্যরকম অনুভূতি। চেরাপুঞ্জির সেভেন সিস্টার খ্যাত ফলস বা ঝর্ণার মোহনীয় রূপ আর এই মেঘ এই বৃষ্টি যেকোন ভ্রমন পিপাসুদের মনে দারুন প্রেম জন্মায়। সে প্রেমে থাকে না কোন কৃত্রিমত্তা। কেবলই প্রকৃতি আর ভালোবাসা মিশে একাকার।

তাই ভালোবাসা হাত বাড়িয়ে ধরতে চাইলে ঘুরে আসুন শিলং এ। চেরাপুঞ্জির সেই ফলস বা ঝর্ণার ছাড়াও রয়েছে পাহাড়ের সর্বচ্চ চূড়ায় উঠে দেখতে পাবেন পুরো শিলং শহর। যেন কোন চিত্রকার প্রকৃতির গাঁয় একেঁছেন মনের মাধুরি মেশানো রঙে। শিলং এর পথে চলতে চলতে পাহাড়ের দু’পাশের সারি সারি পাইন গাছের ছায়া আর হিম শিতল বাতাসে একটু পর পর কুয়াসার মতো জল এসে কখন যে আপনাকে আলতো ছু’য়ে যাবে তা দেখতে বা বুঝতেই পাবেন না। শুধু অনুভূতিতে বুঝবেন মেঘ আপনাকে ছু’য়ে গেল। আর দিয়ে গেলো উষ্ণ ভালোবাসা।

শিলং শহরের ভিতরেও রয়েছে বেড়ানোর চমৎকার অনেক জায়গা। ওইসব জায়গা ঘুরে ঘুরে দেখতে সময় নিতে হবে কমপক্ষে সাত দিন। রবী ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত ঝাউ গাছের ছায়া ঘেরা বাড়ি, এলিফেন্ট ফলস বা হাতির ঝর্ণা, লেডি হায়াদ্রি পার্ক, ডন বস্কো মিউজিয়াম, উমিয়াম লেক, ক্যাথিলিক চার্চ, গলফ কোর্স, ওয়ার্ডস লেক ইত্যাদি। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং এর মনোরম দৃশ্যের জন্য প্রাচ্যের স্কটল্যান্ডও বলা হয়।

তাই দেরি না করে বেড়িয়ে পড়–র আর বেড়িয়ে আসুন প্রকৃতির ভালোবাসা ছড়ানো শিলং এ। আর নিজের জন্য নিয়ে আসুন সেই প্রকৃতির ভালোবাসার ছোয়া। ছড়িয়ে দিন নিজের প্রিয়জনের মাঝে।

প্রয়োজনীয় তথ্য : রাজধানী ঢাকা থেকে শিলং যাওয়ার জন্য মেঘালয়ের ডাউকি বর্ডার সহজ মাধ্যম। সিলেটের তামাবিল বর্ডার পার হলেই ডাউকি বর্ডার। ডাউকি থেকে ট্যাক্সি পাওয়া যায় শিলংয়ের। তবে সম্প্রতি আমাদের ময়মনসিংহ বিভাগের জেলাসহ দেশের রাজশাহী ও দক্ষিনাঞ্চলের মানুষের জন্য শেরপুরের এই নাকুগাঁও ইমিগ্রেশন হয়ে সহজ রাস্তা রয়েছে। শেরপুর হয়ে তুরা এবং ভরতের আসাম রাজ্যের গৌয়াহাটি হয়ে লম্বা ভ্রমন আপনাকে বাড়তি আনন্দ দিবে তুরার বিশাল বিশাল আঁকাবাঁকা পাহাড় আর গভীর জঙ্গলের শিহরিত পথ। এ পথে শিলং ভ্রমনে ইচ্ছে করলে এক দিনের যাত্রা বিরতি দিয়ে এক ঝলক আসাম রাজ্যের রাজধানী গোয়াহাটিও দেখে যেতে পারেন। এখানে শিলং এর চাইতে হোটেল ভাড়া অনেক কম। ৫শ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে হোটেল পেয়ে যাবেন। তবে এখানে বাংলাদেশের মতোই বেশীর ভাগ সময় প্রচন্ড গরম আবহাওয়া বিরাজ করে। কেবল মাত্র শীতকালে কিছু ঠান্ডা থাকে।

যদিও বর্তমানে ঢালু বর্ডার থেকে সরারসি শিলং এর কোন বাস সার্ভিস চালু হয়নি এবং ঢালু থেকে তুরা শহরের ৪৫ কিলোমমিটার সড়কের উন্নয়নের কাজ শুরু হয়েছে। তাই ঢালু থেকে ৭০ থেকে ১০০ টাকায় ভাড়ায় বাস ও উইঞ্জার (মাইক্রোবাস জাতীয়) করে এক থেকে দেড় ঘন্টার মধ্যে তুরা পৌছে সেখান থেকে ভোরে উইঞ্জার এবং নাইট বাসে শিলং যেতে পারেন। এছাড়া ঢালু বর্ডার থেকে বর্তমানে গৌয়াহাটি যাওয়ার জন্য প্রতিদিন বিকেল ৫ টায় একটি বাস চালু রয়েছে। ইচ্ছে করলে ওই বাসে গৌয়াহাটি গিয়ে সেখান থেকে মাত্র ২ ঘন্টায় পৌছতে পারবেন ভাড়া করা ট্যাক্সি, পাবলিক বাস সার্ভিস অথবা উইঞ্জার জাতীয় বিভিন্ন পরিবহনে। ভাড়া ট্যাক্সি ৪ সিটের জন্য ১ হাজার ৫ শত টাকা আর বাস ভাড়া মাত্র ১০০ টাকা। সরাসরি পুলিশ বাজার গিয়ে বুক করতে পারেন যে কোন হোটেল। তবে আগে থেকে অললাইনে হোটেল বুকিং থাকলে ঘুরে ঘুরে হোটেল খোজার ঝামেলাটা আর থাকে না।

থাকার জন্য শিলং পুলিশ বাজারে ভালো মানের অনেক হোটেল রয়েছে। ভাড়া ডবল রুম ২০০০ থেকে ৭০০০ রুপি পর্যন্ত। এ ছাড়াও কমবেশি মানের হোটেল আছে। সিঙ্গেল বা ডবল রুমে চাইলে আলাদা ম্যাট নিয়ে বাড়তি লোকও থাকতে পারবেন। ম্যাটের জন্য আলাদা কিছু রুপি দিতে হবে। এক রুমে একজনই অতিরিক্ত থাকতে পারবেন। ডলার ভাঙানোর জন্য পুলিশ বাজারে অনেক মানি এক্সচেঞ্জ আছে।

খাওয়ার জন্য পুলিশ বাজারের আশপাশে অনেক বাঙালি খাবারের হোটেল আছে। ১০০ রুপি থেকে ৩০০ রুপিতে ভাত-মাছ-মাংস-রুটি সবই পাবেন। একই দামে খাবার পাবেন দর্শনীয় স্থানগুলোর পাশে থাকা হোটেলগুলোতেও। এছাড়া অর্ডার দিলে হোটেল থেকেও খাবারের ব্যবস্থা করে দিবে। তবে সেক্ষেত্রে মূল্য একটু বেশী পড়বে।

 

লেখক :
রফিক মজিদ
কবি ও সাংবাদিক,
উপদেস্টা সম্পাদক, শেরপুর টাইমস ডটকম।

 

শেরপুর টাইমস ডট কম-এর মতামত পাতায় প্রকাশিত লেখার দায়ভার লেখকের নিজের। এর দায় শেরপুর টাইমস কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করবে না। সমসাময়িক বিষয় নিয়ে শেরপুর টাইমসের মতামত পাতায় আপনিও আপনার মতামত জানাতে পারেন sherpurtimesdesk@gmail.com এই মেইলে।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।