স্বপ্নবাজ পাপ্পু । হতে চান তরুণদের আইকন

অনেক তরুণের আগ্রহের জায়গা ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং। ইন্টারনেটের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তির নানা ধরনের কাজ করে অনেকেই সাফল্য পেয়েছেন। অনেকেই রাজধানী কেন্দ্রিক ছোট পরিসরে কাজ শুরু করে আজ সফলতার পথে হাঁটা শুরু করেছেন। আবার অনেকেই মফস্বল শহরে নিজের ঘর থেকেই শুরু করছেন ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং। বেশ চড়াই উৎড়াই পাড়ি দিয়ে তারাও আজ সফলতার পথে হাঁটতে শুরু করেছেন। তেমনি একজন তরুণ উদ্যোক্তা শেরপুরের ইফতেখার হোসেন পাপ্পু।

যেসময় তরুণরা স্মার্ট ফোন আর ইন্টারনেটকে বিনোদনের অনুসঙ্গ মনে করতেন, তিনি তখন স্বপ্ন দেখতেন নতুন কিছু করার। নিজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান করার বাসনা ছিল আগে থেকেই, যেখানে নতুন ফ্রিল্যান্সাররা কাজ করতে পারেন। পাশাপাশি মনে করতেন, নতুনদের শেখানোর জন্য ওয়েবে, ইউটিউবে ভালো টিউটোরিয়াল থাকা জরুরি। দেশের বিভিন্ন আইটি প্রতিষ্ঠানের টিউটোরিয়াল সহযোগিতা নিয়ে তিনি নিজেই কাজ শেখা শুরু করেন। প্রাতিষ্ঠানিক কোন আইটি শিক্ষা না নিয়ে তার যাত্রা শুরু করেন। সময়ের পরিবর্তনে পাপ্পু এখন সফলতার পথে। আজকের গল্পটা তাকে নিয়েই…

হ্যাঁ গল্পটা আমারই। গল্পটা ভেবে রেখেছিলাম ৩ বছর আগে। প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যেদিন সফল হব সেদিনই এইটা শেয়ার করবো। একদিন এই গল্প লেখার মত সাহস ছিলনা আমার, কিন্তু স্বপ্ন ছিল। আসলে এইটাকে গল্প বলা ভুল হবে, এটাতো বাস্তব। যদিও এখনো সফল হতে পারিনি, তবে সবার সহযোগিতায় সেই পথে হাঁটা শুরু করছি। স্বপ্ন পূরণের পথে সবার ভালোবাসা চাই।

শুরুর কথাঃ
আমার শুরুটা হয়েছিল ভুল পথে। যেই বয়সে সবাই মোবাইলটাকে খেলা আর বিনোদোনের সঙ্গী মনে করতো, সেই সময় আমি ভুল করেই ভাবতে থাকি- এই মোবাইল আর ইন্টারনেট দিয়ে কি টাকা আয় করা যায়? সেই ভুল থেকে শুরু… তার আগে শুধু পত্রিকায় পড়তাম অনলাইনে কাজ করে নাকি টাকা পাওয়া যায়। ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ ছিল। তাই ভাবলাম আমিও অনলাইনে কাজ করব আর টাকা কামাবো।

২০১২ এর কথা । ইন্টারনেট জগৎ সম্পর্কে ভাল ধারনা ছিল না। তারপরেও বিশাল একটা সুযোগ পেলাম টাকা ইনকাম করার। আর তা হল ক্লিক করে টাকা আয় করার। বহু কষ্টে কিছু টাকা যোগার করে নেমে পরলাম ক্লিক মারতে। মনে মনে ভাবলাম আমারে আর ঠেকাই কে? খালি টাকা আর টাকা। কিন্তু সবার কপালে কি আর সুখ থাকে? ঘরে বসে দিন শেষে কখন ক্লিক করবো, এর ভরসায় বসে থাকতে মন সাঁয় দিতো না।

কিন্তু আমার ভুল ভাঙতে সময় লাগেনি। ৩-৪ মাস পরে ক্লিক কোম্পানি উধাও। নেমে এলাম বাস্তবের জমিনে।

হতাশাঃ
শুরু হল জীবন সংগ্রাম। জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে উঠল। কয়েকটা বড় ভাইয়ের সাথে পরিচয় হয়েছিল ক্লিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর। তারা শুধু বলত ভাই কাজ দিব তোমাকে। এভাবে কেটে গেল ৩-৪ মাস। কিন্তু কাজ আর পেলাম না। প্রচন্ড টাকার অভাব দেখা দিল। সেই দিন গুলো বর্ণনা করার ভাষা আমার নাই। শুধু একটা উদাহরন দেই তাহলে বুঝতে পারবেন। একা বাসায় থাকার কারণে অনেক সময়েই অনাহারে কাটাতে হয়েছে, মোবাইলের স্ক্রিণের দিকে তাকিয়ে। কখন ক্লাইন্ট ফোন দিবে, কাজ পাবো? এই অপেক্ষা…

সংগ্রামঃ
লোকলজ্জার ভয় ফেলে ২০১৫ এর শেষের দিকে আমি নিজেই ইউটিউবে টিউটোরিয়াল দেখে কাজ শিখা করলাম। মফস্বলে ইন্টারনেট সহজলভ্য না হওয়া আর সেই সময় আমাদের শহরে থ্রিজি নামক গতির হাওয়া না লাগায় কাছের এক বড় ভাইয়ের স্বরণাপণ্ন হই। শহরের নিউমার্কেট এলাকায় সেই বড় ভাইয়ের অফিসে ব্রডব্যান্ডের সুবিধা নিয়ে প্রতিদিন নতুন টিউটোরিয়াল ডাউনলোড করে বাসায় নিয়ে যাই। ও হ্যাঁ… তখনো কিন্তু আমার কাছে ব্যক্তিগত কোন পিসি বা ল্যাপটপ ছিলো না। সারা রাত যা শিখতাম সকালে এসে মোবাইলে নতুন টিউটোরিয়াল ডাউনলোড দিয়ে বড়ভাইয়ের পিসিতে অনুশীলন করতাম।

আর মার্কেটিং… ফেসবুকের দুনিয়ায় বিভিন্ন আইটি বেজড সেবা প্রদানের নিশ্চয়তায় বিভিন্ন গ্রুপে পোষ্ট ও বিভিন্নজনের ব্যক্তিগত ওয়ালে মেসেজ পাঠাতে থাকি। বেশ কয়েকটা কাজ জুটে যায়। ওয়ার্ডপ্রেস প্লাটফরমে অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও ই-কমার্স ওয়েবসাইটের কাজ শুরু করি। থিম ফরেষ্ট থেকে খিম কিনে ক্লাইন্টের চাহিদা অনুযায়ী কাজ ডেলিভারী দেয়া শুরু করি।

হঠাৎ এক ক্লাইন্ট কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে টাকার বদলে একটি লেপটপ অফার করে। সাত পাঁচ না ভেবে হ্যাঁ বলে দেই। সময়মতো কাজ ডেলিভারী দেয়ায় ওই ক্লাইন্ট নিজে শেরপুরে এসে একটি লেপটপ উপহার দিয়ে যায়। কাছের কয়েকজন বড় ভাই আমাকে সাজেশন দিলো, যাই করিস প্রফেশনালি করিস। এবার থেকে শুরু করি নতুন যুদ্ধ।

এবার আর থিম কিনে নয়। শূণ্য থেকে শুরু করে নতুন থিম তৈরী শুরু করি। যে বিষয়ে না পারি, সেসময় গুগল আর ইউটিউবের সহযোগিতা নিই।

সফলতার শুরু যেখানেঃ
ইতোমধ্যে বেশ কিছু ফ্রিল্যান্স প্লাটফরমে আমার আনাগোলা শুরু হয়ে যায়। বিভিন্ন কাজ করা শুরু করি। দাম যতই হোক কাজ সফলতার সাথে সম্পন্ন করে ডেলিভারি দিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলি। আমি আমার প্রোফাইলটা আরেকটু ঘষামাজা করে আবার নতুন টেকনিকে বিড করা শুরু করলাম। আল্লাহর রহমতে এক সপ্তাহের মধ্যেই বেশ কিছু কাজ পেয়ে গেলাম।

কাজের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় পেতে নিজ উদ্যোগ আর কাছের মানুষদের ভালোবাসায় স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান বিডি আইটি জোনের যাত্রা শুরু করি। বিডি আইটি জোনের নামে দেশের বিভিন্ন এলাকাতে আইটি বেজড সেবা দিতে শুরু করি। গ্রাহকের চাহিদা পূরণে বিডি আইটি জোনের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিডি আইটি ২৪৭ এর যাত্রা শুরু করি। বর্তমানে শেরপুর থেকেই বিডি আইটি জোন ও বিডি আইটি ২৪৭ এর মাধ্যমে ওয়েবসাইট তৈরীর পাশাপাশি, ওয়েব বেজড এপ্লিকেশন, মোবাইল এপ্স আর এসইও এর কাজ শুরু করছি। ইতোমধ্যে ডজনখানেক মোবাইল এপ্স গুগল প্লে ষ্টোরে আপলোড হয়েছে বিডি অাইটি জোনের ব্যানারে। বড় পরিসরে কাজ শুরু করার প্রচেষ্টায় আছি প্রতিনিয়ত।

বর্তমানঃ
এখন আল্লাহর রহমতে কাজ সব সময় থাকে। আমি মুলত ওয়েব রিসার্চ, ওয়ব ডিজাইন এবং মোবাইল এপ্স তৈরীর কাজ করি। মাঝে মাঝে কাজের চাপ খুব বেড়ে যায়। নিজের ব্যক্তিগত ইচ্ছের চেয়ে গ্রাহেকর চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে কিছু কাজ করলেও লোকালি কাজ করে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।

আল্লাহর কাছে লাখো শুকরিয়া। আর আপনারা আমার জন্য সবাই দোয়া করবেন।

শেষ কথাঃ
আমি কোন প্রতিষ্ঠান বা ব্যাক্তির কাছ থেকে ট্রেনিং নিয়ে কাজ শিখিনি। যা শিখেছি তা সবই ইন্টারনেট থেকে। এক্ষেত্রে ইউটিউব ও গুগলের বড় অবদান আছে এতে। আর প্রতিনিয়ত আমাকে সামনের দিকে ঠেলে দেয়া মানুষটা প্রভাষক মহিউদ্দিন সোহেল ভাই। শূণ্য থেকে শুরু করে যার ভালোবাসা আর অণুপ্রেরণায় আজকের এই অবস্থানে আমার আসা। নিজের ভাই না হয়েও একজন পথপ্রদর্শক, শিক্ষক ও অভিভাবক হিসেবে যিনি আমার জীবনে সর্বদাই আশীন আছেন। সেই সাথে আমার বিডি আইটি জোনের তরুণ ও উদ্যোমী একদল স্বপ্নবাজ তরুণ। যাদের সাথে নিয়েই আমার এই সফলতার স্বর্ণ শিখরে পৌঁছবার যাত্রা। পরিশেষে একটা কথা বলবো পরিশ্রম করুন সফলতা আসবেই। কারন আল্লাহ কেবল পরিশ্রমী ব্যাক্তিদেরই ভাগ্য পরিবর্তন করেন।

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের