সেই ভয়াল মুহূর্তের লোমহর্ষক বর্ণনা তামিমের

‘ক্রাইস্টচার্চ ট্র্যাজেডি’ এই সময়ের সব থেকে আলোচিত বিষয়। বাংলাদেশে আলোচনাটা আরও বেশি। শান্তির দেশ নিউজিল্যান্ডের ওই শহরের আল নূর মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় একদিকে চার বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন, অপরদিকে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সদস্যরা। ভয়াবহ ওই ঘটনা ক্রিকেটারদের মানসিকতায় বেশ বড় একটা ধাক্কা দিয়েছে। সব উদ্বেগ উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে শনিবার রাতে যখন তারা দেশে ফিরেছেন; তাদের চোখ মুখই বলে দিচ্ছিল সব। এরই মধ্যে ক্রিকেট বিষয়ক জনপ্রিয় ওয়েবসাইট ক্রিকইনফোকে ‘কিভাবে বেঁচে গেলেন’ তার বর্ণনা দিয়েছেন তারকা ওপেনার তামিম ইকবাল।
তার ভাষায় বাসে ওঠার আগে কী হয়েছে তা খুলে বলছি। এতে বুঝতে পারবেন ওই দুই-তিন মিনিট কীভাবে সব পাল্টে দিয়েছে। সাধারণত মুশফিক এবং রিয়াদ ভাই খুতবায় উপস্থিত থাকতে চান, যে কারণে আমরা একটু আগে-ভাগে জুমার নামাজে যেতে চেয়েছি। বাস ছাড়ার কথা ছিল বেলা দেড়টায়। কিন্তু রিয়াদ ভাই সংবাদ সম্মেলনে যান, সেখানে একটু দেরি হয় এবং সংবাদ সম্মেলন শেষ করে তিনি ড্রেসিং রুমে ফিরে আসেন।
ড্রেসিং রুমে আমরা ফুটবল খেলায় ব্যস্ত ছিলাম। তাইজুল হারতে চায় না। তবে বাকি সবাই ওকে হারাতে চাচ্ছিল। তাইজুল আর মুশফিক একে অন্যের বিপক্ষে খেলছিল, এতে কয়েক মিনিট দেরি হয়। শেষ পর্যন্ত এই ছোটখাটো বিষয়গুলোই আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছে।
এরপরই আমরা বাসে উঠি। শ্রী (দলের ভিডিও বিশ্লেষক শ্রীনিবাস চন্দ্রশেখরন) এবং সৌম্য সরকার (দুজনেই অমুসলিম) আমাদের সঙ্গে যাওয়ায় পরিকল্পনা ছিল নামাজ শেষে টিম হোটেলে ফিরব। অনুশীলন ছিল ঐচ্ছিক। যারা করবে না, তারা হোটেলে থাকবে। যারা করতে চায়, তারা মাঠে ফিরে যাবে। এটাই পরিকল্পনা ছিল।
আমি সব সময় (বাসের) বাঁ পাশের ছয় নম্বর আসনে বসে থাকি। যখন আমরা মসজিদের কাছাকাছি পৌঁছাই, আমার ডান পাশের সবাই জানালা দিয়ে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করছিল। আমি দেখলাম, মেঝেতে একটা দেহ পড়ে আছে।
স্বাভাবিকভাবেই আমরা তাকে মাতাল অথবা অজ্ঞান ভেবেছিলাম। তাই এরপরও বাস এগিয়ে যায়, মসজিদের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু সবার মনোযোগ ছিল মেঝেতে পড়ে থাকা দেহটি ঘিরে।
ওই মুহূর্তে আমার নজর যায় আরেকজন লোকের ওপর। রক্তমাখা শরীর, ধীরে ধীরে পড়ে যাচ্ছে। ভয়টা তখনই দানা বেঁধে উঠতে শুরু করে।
আমাদের বাস মসজিদের কাছাকাছি থাকা একটি গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। আমরা দেখলাম, বাসচালক এক নারীর সঙ্গে কথা বলছেন, যিনি কাঁপছিলেন ও কাঁদছিলেন। উনি বলছিলেন গোলাগুলি হচ্ছে, ওখানে জেয়ো না, ওখানে জেয়ো না।
আমাদের বাসচালক বললেন, এরা মসজিদে যাচ্ছে। ওই নারীর জবাব, না না মসজিদে জেয়ো না। গোলাগুলি মসজিদে হচ্ছে। তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। সবাই তার কথা শুনেছে এবং তাকে দেখেছে, তাতে ভয়টা আরও বাড়ল। তখন মসজিদ থেকে আমরা মাত্র ২০ গজ দূরে। বাস থেকে নেমে মসজিদে ঢুকব আরকি। দেখলাম, মসজিদের আশপাশে বেশ কিছু রক্তমাখা শরীর পড়ে আছে।
যখন আরও লাশ দেখলাম, বুঝতে পারছিলাম না ঠিক কি করা উচিত। অনেকেই ভয়ে মাথা থেকে নামাজের টুপি খুলে ফেলল। মানে বুঝতে পারছিলাম কিছু একটা ঘটছে। যারা পাঞ্জাবি পরে ছিল, ওপরে জ্যাকেট পরে নিল। এ ছাড়া আর কি করার ছিল?
এরপর আমরা বাসের মেঝেতে শুয়ে পড়ি। এভাবে সাত-আট মিনিট কাটল। ঠিক কি ঘটছে তা বুঝতে পারছিলাম না তবে সহিংস কিছু যে ঘটছে, তা টের পেয়েছি।
ভীষণ ভয় পেতে শুরু করি। দেখুন, ঠিকমতো কথা বলতে পারছি না। আমরা বাসচালককে বললাম, এখান থেকে বের করুন। কিছু একটা করুন। কিন্তু তিনি অনড়। সবাই চিৎকার করে তাকে বললাম। আমিও চিৎকার করেছি। ওই ছয়-সাত মিনিট সেখানে কোনো পুলিশ ছিল না।
হঠাৎ করেই পুলিশ এল এবং ওদের বিশেষ বাহিনী যেভাবে ঝড়ের বেগে মসজিদে ঢুকল, আমরা ভাষাহীন হয়ে যাই। প্রায় অনুভূতিশূন্য অবস্থা। আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছিল। রক্তমাখা শরীর নিয়ে আহত আরও অনেকে বের হতে শুরু করে মসজিদ থেকে।
আমরা তখন আর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। চিৎকার করতে শুরু করি ‘আমাদের যেতে দাও, যেতে দাও।’ কেউ একজন বলল, ‘বাইরে বের হলে যদি কেউ গুলি করে?’ আরেকজন বলল, ‘বাসে থাকলে আমরা বিপদে পড়ব।’ আমারও তাই মনে হলো, বাস থেকে বের হতে পারলে পালানোর সুযোগ পাব। বাসে আমরা সহজ লক্ষ্যবস্তু। কিন্তু যাব কোথায়? দুটি দরজাই বন্ধ।
ঠিক সেই মুহূর্তে বাসচালক ১০ মিটারের মতো বাসটি এগিয়ে নেন। জানি না তিনি এই কাজটা কেন করলেন। আমরা তখন ভেঙে পড়েছি। সবাই প্রায় আশা ছেড়ে দিয়েছে। মাঝের দরজায় ধাক্কা ও লাথি মারছি। বাসচালক দরজা খুললেন।
বাসটা তিনি (চালক) যখন সামনে নিচ্ছেন, তখন আপনাকে (ক্রিকইনফোর প্রতিবেদক মোহাম্মদ ইসাম) ফোন করেছিলাম। আপনি ভেবেছিলেন মজা করছি। কিন্তু আমি কতটা সিরিয়াস, তা বলা কিংবা বোঝানোর মতো অবস্থায় ছিলাম না। প্রায় আট মিনিট পর বাস থেকে শেষ পর্যন্ত নামা হলো। সবাই বলছিল, পার্ক দিয়ে দৌড় দেই। কেউ বলল, পার্কে আমরা সহজ লক্ষ্যে পরিণত হব। বন্দুকধারী যদি আমাদের দেখে গুলি করতে শুরু করে?
আমার কাছে যেটা ভীতিকর লাগছিল, পুলিশ আমাদের দৌড়াতে দেখে কি ভাববে? এর মধ্যে দেখলাম আপনারা তিনজন (প্রতিবেদক মোহাম্মদ ইসাম, উৎপল শুভ্র ও মাজহারউদ্দিন) আসছেন। তখন বুঝতে পারিনি। কিন্তু কাল রাতে বুঝলাম, আপনারা কত বড় ঝুঁকি নিয়েছিলেন। অনেক কম মানুষই এমন ঝুঁকি নেয়। ওই রকম পরিস্থিতিতে কাছের মানুষেরাও হয়তো আপনাদের মতো ভূমিকা নেয় না। আসলে আপনাদের দেখে কিছুটা শান্ত হই এবং হাঁটতে শুরু করি। কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর সবাই মাঠের দিকে দৌড়াতে শুরু করে।
জানেন, মৃত্যুকে নিজের চোখে দেখেছি। শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছিল। এটা এমন কিছু যা আমরা সারা জীবনে ভুলতে পারব না। দলের সবারই এই এক কথা। সবার মুখে কিছুটা হাসি ফিরেছে ঠিকই কিন্তু ভেতরে-ভেতরে বিধ্বস্ত।
আমরা হোটেলে ফিরে সোজা রিয়াদ ভাইয়ের কামরায় চলে যাই। বন্দুকধারীর ভিডিও দেখি। খেলোয়াড়েরা কাঁদতে শুরু করে। ড্রেসিংরুমে আমরা সবাই কেঁদেছি। একটা কথা নিশ্চিত করে বলতে পারি, এই ঘটনা ভুলতে অনেক সময় লাগবে। পরিবারের সাহায্য লাগবে। চোখ বুজলেই দৃশ্যগুলো ভেসে ওঠে। কাল রাতে বেশির ভাগ ক্রিকেটার একসঙ্গে ঘুমিয়েছে। আমি ঘুমিয়েছি মিরাজ ও সোহেল ভাইয়ের সঙ্গে। স্বপ্নে দেখেছি, বাইকে করে ওরা গুলি করছে।
বিমানবন্দরে আসার পথে আমরা একে অপরকে বলছিলাম, একটু এদিক-সেদিক হলেই আমরা নই, লাশগুলো ঘরে ফিরত। মাত্র ত্রিশ সেকেন্ডের ব্যাপার।
সূত্র: সময়ের আলো
শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের