সুন্দরবনের এক জোছনা রাতের গল্প

:মো. মুগনিউর রহমান মনি:

কোনো গল্পের আসরে যখন রহস্যময় সুন্দরবনের বিভিন্ন ঋতুর রূপের বর্ণনা আর রহস্যময়তা তুলে ধরার প্রয়াস পেতাম তখন অনেকেই মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে সেসব গল্প শুনতো। মনে হতো তাঁরা যেনো আমার চোখে সুন্দরবন দেখছে। আবার দু’ একজন বলে উঠতো- আরে সুন্দরবনে দেখার কি আছে? ওই নদী, খাল আর দুই পাশের গাছপালা? বাঘ তো দূরের কথা দু’একটা বক আর বানর ছাড়া কুমির ও অন্যান্য পাখি বা প্রাণীর দেখা পেলাম কই? একবার গেলেই তো দেখা শেষ। এই বন দেখতে বারবার যেতে হয়?

আমি তাঁদের উদ্দেশ্যে সব সময় বলি- ‘দুই নয়নে তোমায় দেখে নেশা কাটেনা দেখার নেশা কাটেনা’। আর এক জনমে দেখেও রূপময় সুন্দরবনের সৌন্দর্য ও রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব নয়। আর তাইতো সুন্দরবন বারবার ইশারায় ডাকে গহীন থেকে গহীনে।
বাংলাদেশের অন্যতম ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার, চিত্রশিল্পী ও লেখক ফরিদী নুমানের বই ‘আমাদের সুন্দরবন’ পড়ে সুন্দরবন দেখার নেশাটা কেমন যেনো গাঢ় হয়ে উঠলো। যদিও এর পূর্বে দু’বার সুন্দরবন গিয়েছি কিন্তু মুগ্ধ হতে পারেনি আমার নয়নযুগল বা মন। আর এখন পিছুটান ও সীমাহীন ব্যস্ততার মাঝেও প্রতিবছর একাধিকবার মন টানে কিসের নেশায়? জানিনা। আর জানতেও চাই না। শুধু এটুকু জানি, গহীনের টানে গভীর প্রেমে মজেছে এই মন।
২০১৮ সালের ২৯ জুলাই সকাল ৬ টায় চরাপুটিয়া খাল হয়ে শেলা গাং। শেলা গাং হয়ে বেতমোর-দুধমুখী গাং হয়ে সুন্দরী খাল। খালে বোট ট্রীপ। সে ট্রীপে বর্ষার সুন্দরবনের গাছ, ফুল, ফল আর খয়রাপাখ মাছরাঙার ছবি পেলাম। সুন্দরী খাল থেকে পড়ন্ত বিকালে পৌছলাম কটকা জামতলা খালে। খালে বোট ট্রীপ শেষে জামতলা জেটির পাশেই রাতে অবস্থান। কারণ আমাদের বহনকারী ‘আলোর কোল’ ট্যুরিস্ট ভ্যাসেল নোঙ্গর ফেলেছে জেটির পাশেই।

বৃষ্টি ও মেঘ কেটে গেছে অনেক আগেই। পূর্ণিমার চাঁদ এতক্ষণ লুকিয়ে ছিল মেঘের আড়ালে। অল্প অল্প করে মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে চাঁদ। আলোর রশ্মি আছড়ে পড়েছে বৃষ্টিস্নাত সুন্দরী, কেওড়াসহ অন্যসব গাছের পাতায়। হঠাৎ আলোয় বনের সবকিছু কেমন জানি রহস্য ছড়িয়ে দিল। এখন রাত ৮ টা বেজে ৩০ মিনিট। ইতিমধ্যে আমাদের রাতের খাবার পর্ব সমাপ্ত হয়েছে। ভ্যাসেলের সব আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু পাশের নৌকার মাথায় একটি আলো জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে। কারণ বরশি ফেলে মাছ ধরার চেষ্টা চালাচ্ছেন গউস ভাইসহ তাঁর দুই সঙ্গী ইব্রাহিম ও শহীদ ভাই। তাঁরা অল্প সময়ের ব্যবধানে বড় বড় চিংড়ি মাছসহ কয়েকটি কাকড়া ধরে ফেলেছেন।
জোছনার আলোয় ভাসছে ভ্যাসেল, ঢেউয়ের দোলায় দুলছে, সাথে আমরাও। ভ্যাসেলের সম্মুখভাগে ফরিদী নুমান, ইমদাদুল ইসলাম বিটু, ক্যাপ্টেন সাদাত আমীন ভাইসহ আমরা সবাই বসে বর্ষার জোছনা রাতে সুন্দরবনের প্রকৃতি উপভোগ করছি। আর আমাদের আসরের মধ্যমনি সুন্দরবন ও বাঘ বিশেষজ্ঞ খসরু চৌধুরী তাঁর ৪০ বছরের গবেষণার অভিজ্ঞতা থেকে রোমাঞ্চকর সব গল্প আর কথা শুনিয়ে যাচ্ছেন। আমরা মন্ত্রমুগ্ধ হচ্ছি, হচ্ছি শিহরিত, ভয়ও পাচ্ছি। আবার মনে জোর পাচ্ছি এই ভেবে যে, আমাদের সাথে তো অভিজ্ঞ খসরু ভাই রয়েছেন। নানা গল্প আড্ডায় রাত গভীর হচ্ছে। আর সুন্দরবনের পরিবেশও যেনো রহস্যময়তার গভীরে প্রবেশ করছে। জোছনা রাত হলেও মেঘের সাথে লুকোচুরি খেলা চলছে ক্ষণে ক্ষণেই। গা ছম ছম করা রাত। এই জোছনার ফিনিক ফোটা আলো আবার মুহুর্তেই মেঘের আড়ালে লুকিয়ে বনকে নিকষ অন্ধকারে ঢেকে দিচ্ছে।

ভোরে বোট ট্রিপে নামতে হবে- এজন্যই আসর ভেঙ্গে দেওয়া হলো। তাও রাত ১২:৩০ মিনিট। যার যার কেবিনে গিয়ে ঘুমের প্রস্তুতি। অজানা ভয় আতংক থাকলেও সারাদিনের ক্লান্তি ও অবসাদে কখন যেনো ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেলাম টেরও পেলাম না। রাতের শেষ ভাগে ঘুম ভেঙ্গে যেতো আমার। আর চোখে ঘুম আসতে চাইতো না। পানির শব্দ, প্রাণী ও রাত জাগা নিশাচর পাখির শব্দ আর আমাদের জাহাজে থাকা সহযাত্রীদের অদ্ভুত রকমের নাক ডাকার শব্দে এ এক অন্যরকম সুন্দরবন। জামতলা খালের জেটিতে আমাদের ভ্যাসেল পুবমুখো করে বাধা। ঘুম ভাঙ্গার পর কেবিন থেকে বের হয়ে দোতলায় গিয়ে জাহাজের সারেং ঘরের সামনের বেঞ্চিতে পুবমুখো হয়ে বসে আছি। হঠাৎ খালের ডান পাশের গোলপাতার ঝোপটা যেনো নড়ে উঠলো। ওদিকটায় চোখ পড়তেই দেখি মূহুর্তেই কী যেনো একটা পানিতে নেমে পড়লো। মাথা উঁচু করে সাতরে এগুতে থাকলো। হালকা আলো আঁধারে দেখছি সাদা-কালো ছবির মতো। জোছনার রেশ এখনও কাটেনি তাই ভালোই দেখতে পাচ্ছি। ভয় পাবার কথা কিন্তু চলে যাচ্ছে দেখে ভয় মনে আসেনি। কিন্তু ওপাড়ে যখন ডোরাকাটা লম্বা দেহটি পানি থেকে ভাসালো তখন ভয়টা ভালোই পেয়ে বসেছিল। এখন ভাটার সময়। খাল পার হয়ে পলি মাড়িয়ে গম্ভীর ভঙিতে একবার পিছনে তাকিয়ে বাম পাশের বনে ঢুকে পড়লো বনের রাজা বেঙ্গল টাইগার।

অন্ধকার এখনও কাটেনি। আর কিছুক্ষণ পরেই অন্ধকারের স্তব্ধতা কেটে ভোরের আলো ফুটবে। সেই আলোয় সবার যখন ঘুম ভাঙ্গবে তখন কি তাঁরা আমার বাঘ দেখার গল্প বিশ্বাস করবে? কিন্তু পাঠক ও সহযাত্রীদের বলতে চাই আমার বাঘ দেখার গল্পটা কিন্তু সত্যি। হ্যাঁ, আসলেই সত্যি! জোছনার আলো ফুরাবার আগে যে দৃশ্য দেখলাম তা কয়জনের ভাগ্যে জুটে!

(লেখক: কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, আলোকচিত্রী ও পরিবেশকর্মী)

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।