সীমান্তবাসীদের আয়ের উৎস রাবার বাগান

গহীন বন থেকে লাকড়ি আর ঝরা পাতা সংগ্রহ করে বিক্রী করে সংসার চালায় তাঁরা। কিন্তু যে টাকা বিক্রি হয় তাতে পরিবার চালানোতো দূরের কথা নিজের চলতেই কষ্ট হয়। তাই পাহাড়ি অধিবাসীদের আয়ের একমাত্র ভরসা রাবার বাগান। শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তবর্তী কর্নঝোড়া রাবার বাগান পাহাড়ের অধিবাসীদের সৃষ্টি করেছে কর্মসংস্থানের নতুন পথ।

জানা যায়, শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার সিংগাবরনা ইউনিয়নের উত্তর সীমান্ত এলাকা জুড়ে গারো পাহাড়। ভারতের সীমানা ঘেষা এ গারো পাহাড়ে রয়েছে লাউচাপড়া, মেঘাদল, দিঘলাকোনা, গারো পাড়া, বাবেলাকোনা, চান্দাপাড়া, হারিয়াকোনা ও রাজারপাহাড় গ্রাম। এসব গ্রামে একমাত্র কৃষি আর বনের লাকড়ি ও লতাপাতা কুড়িয়ে বিক্রি করা ব্যাতিত অন্য কোনো আয়ের পথ ছিলনা। ফলে তাদের জীবন জীবিকা নির্বাহ করতে অনেকে জড়িয়ে পড়তো নানা অপকর্মে। কেউবা জড়িয়ে পড়তো বনের বৃক্ষ চুরি ও মাদকসহ চোরাচালানে। এখানকার বেশিরভাগ লোক এগুতো এক অনিশ্চিত ভবিষতের দিকে।

একাধিকবার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উপজেলার কর্ণঝোড়া পাহাড়ে বনবিভাগের কাছ থেকে ৬২০ একর জমি নেয় বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন। ১৯৯৪ সালে কর্ণঝোড়া রাবার এস্টেট গড়ে তোলে। এ রাবার গাছের উৎপাদিত কষ থেকে চালু হয় রাবার উৎপাদন ও প্রসেসিং কারখানা। এতে রাবার বাগানে সুযোগ সৃষ্টি হয় স্থানীয় জনগোষ্ঠির কর্মসংস্থানের। বর্তমানে কর্ণঝোড়া রাবার বাগানে নিয়মিত ৭০/৮০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। একেকজন শ্রমিকের তত্বাবধানে তিনশ’ করে রাবার গাছ রয়েছে। আগস্ট থেকে জানুয়ারী পর্যন্ত রাবার সংগগ্রহের ভরা মৌসুম। সে সময় প্রতিদিন একেকজন শ্রমিক গড়ে সাড়ে ৪শ টাকা থেকে ৫শ টাকা করে আয় করেন। ঢাল সিজনেও প্রতিদিন একেকজন শ্রমিক আয় করছেন ২শ ৫০টাকা থেকে ৩শ টাকা। এখন তারা বনের গাছ কাটার পরিবর্তে রাবার বাগান দেখাশোনা, পরিচর্যা ও রাবার রস সংগ্রহ করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছেন। এতে বাড়ীর কাছেই সৃষ্টি হয়েছে আয়-রোজগারের পথ। তারা পরিবারের কাছে থেকে রাবার বাগানে কাজকর্ম করে উপার্জন করছেন। নিয়মিত আয়-রোজগার হওয়ায় আর তারা চুরি করে বনের গাছও কাটেন না। বরং রাবার বাগানে কাজ করে আর্থিকভাবে উন্নতি হচ্ছে তাদের। এখন তাদের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার জন্য স্কুল-কলেজে পাঠাচ্ছেন। রাবার বাগান হওয়ায় বনবিভাগের জমি বেদখল হওয়ার হাত থেকেও রা পেয়েছে। এর পাশাপাশি বনের গাছ চুরির প্রবণতাও কমেছে। সৃষ্টি হয়েছে স্থানীয় বেকারদের কর্মসংস্থান। অনেকের কাছে সীমান্তবাসীদের ভরসা রাবান বাগান। যেখান থেকে সহজেই আয় করা যায়।

ওই রাবার বাগানে কর্মরত শ্রমিক আলী আকবর ও আশরাফ আলী জানান, তারা আগে বেকার ছিলেন। এখানে কাজ পেয়ে তাদের দৈনিক আয় করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। রাবার বাগানের ট্রেকিং সুপার ভাইজার ইদ্রিস আলী এ প্রতিনিধিকে বলেন, এখন যে আয় হয় তা দিয়ে সংসারের খরচ চালিয়েও ছেলে মেয়েকে পড়া লেখা করাতে পারছি। কর্ণঝোড়া বনশিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশনের ম্যানেজার এ এম শাহাজাহান সরকার জানান, এ রাবার বাগানে প্রতিদিন ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ২শ কেজি রাবার রাবার পাওয়া যায়। যা প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে ৮শ কেজি থেকে ৯শ কেজি আরএসএস রাবার উৎপাদিত হয়। এখানকার রাবারের মান খুবই ভাল। বাজারে এর চাহিদাও বেশ। তিনি বলেন, কর্ণঝোড়া রাবার এস্টেটে বিদ্যুৎ না থাকায় কিছুটা সমস্য হচ্ছে। বিদ্যুৎ থাকলে আরও বেশী এবং মানসম্পন্ন রাবার উৎপাদন করা সম্ভব। এখানে আরো রাবার বাগান গড়ে তোলার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এখানকার আবহাওয়া ও মাটি রাবার চাষের খুবই উপযোগী। এই এলাকায় বনবিভাগের এমন আরও অনেক জমি রয়েছে যেখানে রাবার বাগান করা যেতে পারে। এতে গারো পাহাড়ের জনগোষ্ঠির যেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সেই সাথে বন সংরক্ষনের পাশাপাশি সরকারি কোষাগারেও আয় হবে বিপুল পরিমানের রাজস্ব। এমনটাই মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দা ও রাবার বাগান কর্তৃপক্ষ।

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের