শিশুর রং তুলিতে থাকলেও হারিয়ে যাচ্ছে মাটির ঘর

নাঈম ইসলাম: চারপাশে মাটির দেয়াল, ছাদে খড়ের ছাউনি। ঘরের সামনেই মাটির তৈরী দুটি চুলা। ড্রয়িং খাতায় এভাবেই গ্রামের বাড়ি আঁকছেন আইডিয়াল প্রিপারেটরী এন্ড হাইস্কুলে ২য় শ্রেণী পড়ুয়া সাবিকুন্নাহার হিয়া। সোমবার বিকাল চারটা, মেঘলা তার খাতায় ড্রয়িং করছে। এখানে মেঘলা গ্রামের যে বাড়িটি আঁকছে তা মাটির তৈরী। শুধু মাটি দিয়ে ঘর বানানো হয়, আর তাতে থাকা যায় কি? মা’কে মেঘলার প্রশ্ন-

একসময় গ্রামের অধিকাংশ বাড়িতেই ছিল মাটির ঘর। কিন্তু ইট, পাথর, আর সুরকির দালান-কোঠার ভিড়ে তা দিনেদিনে হারিয়ে যাচ্ছে। এ প্রজন্মের অর্থশালীরা বাপ-দাদার ঐতিহ্য বহনকারী মাটির ঘর ভেঙে রড সিমেন্টের বিলাসবহুল বাড়ি বানানোর দিকে ঝুঁকছেন। আর ততটা সামর্থ্য না হলেও নিদেনপক্ষে টিনের বেড়া ও টিনের চাল দিয়ে বানানো হচ্ছে ঝকঝকে ঘরবাড়ি।

জানা যায়, এঁটেল মাটি, বাঁশের ফলাসহ প্রয়োজনীয় উপকরণের সহজলভ্যতা ও শ্রমিক খরচ কম হওয়ায় আগেরদিনের মানুষ মাটির ঘর বানাতে আগ্রহী ছিল। এছাড়াও টিনের ঘরের চেয়ে মাটির ঘর অনেক আরামদায়ক। গ্রীষ্মের ভ্যাপসা গরমেও ঘরের ভেতর থাকে শীতল। আবার কনকনে শীতেও ঘরের ভেতরটা থাকে বেশ উঞ্চ। শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার গড়জরিপা, ঘোনাপাড়া, ঘোসাইপুর, কুরুয়া, বীরবান্ধা, ঝিনাইগাতীর ছোটগজনী, বাকাকুড়া, কালীনগর, ধানশাইল এলাকায় মাটির ঘরের অধিক্য ছিল। কিন্তু এসব এলাকায় টিন আর দালান-কোঠার ভিড়ে মাটির ঘরের দেখা মেলায় ভার।

শ্রুতিমতে, গ্রামের বড় বাড়ি, খান বাড়ি, মন্ডল বাড়ি, নয়া বাড়ি, মাতব্বর বাড়ি, জোয়াদ্দার বাড়ি, ফকির বাড়ি, মুন্সি বাড়ি, পশ্চিম বাড়ি, চেয়াম্যান বাড়ি ; এমন সম্ভ্রান্ত পরিবারের ঘরগুলোর মাটির দালানে প্রাকৃতিক নানান নকশা দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হত অভিজাত্য। ঘর গুলো তৈরীতে কাঠের মোটা বিম দেওয়া হত। যাতে ঘরগুলো যতেষ্ট মজবুত হয়। প্রতিবছর ঘরের দেয়ালে মাটির প্রলেপ দেওয়া হত । আর তাতে সারা বছরই ঘর ঝকঝকে দেখা যেত। আবার অনেকে বাড়তি সৌন্দর্য্যরে জন্য চুনকামও করাতেন। দিনবদলের পালায় এসব এখন শিক্ষারর্থীদের ড্রয়ং খাতায় আর ষাটোর্দ্ধ্যদের স্মৃতি।

গড়জরিপা ইউনিয়নের বাসিন্দা তমিজ উদ্দিন বলেন, সাধারণত এঁটেল মাটি দিয়ে এক-দেড় হাত চওড়া দেয়াল করে মাটির ঘর বানানো হতো। প্রতিবারে এক থেকে দেড় ফুট উঁচু করে মাটি ভরাট দেওয়া হয়। একেকটি ঘর তৈরীতে প্রায় দুইমাস সময় লাগতো।

সম্প্রতি শেরপুর টাইমসের এ প্রতিবেদক ছোটগজনী এলাকাটি পরিদর্শন করে। এই এলাকায় বেশ কয়েকটি মাটির ঘর রয়েছে। গীর্জা ঘরের পাশেই একটি মাটির ঘরে পরিবার নিয়ে থাকেন ডিভিশন সাংমা। ঘরটি সদরে-অন্দরে পরিপাটি। সাজানো গোছানো ঘরটির ভিতরে জ¦লছে ঝকঝকে সোলারের বাতি। দেয়ালের পাটাতনে ঝুলছে পাটের ছিঁকা, শানের কাঠি, চালুনি আর ডালা। একপাশে কাঠের তাক বসানো। সেখানে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন রকমের বয়ম আর মুড়ির টিন। উঠানে মাটির চুলাটি বলছে, আমরা আছি, এখনো হারিয়ে যাইনি ।

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের