You dont have javascript enabled! Please download Google Chrome!

শাড়ি ছেড়ে আধুনিক বস্ত্রে ঝুঁকছে বাঙালী নারীরা

শাড়িতে নারীকে যতটা সুন্দর দেখায়, নারীর আভিজাত্য ও স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে, আর কোনো পোশাকে সেটা সম্ভব হয় না। ছয় গজ দৈর্ঘের এই বস্ত্রখণ্ডে যেভাবে নিজের সংস্কৃতি- সৌন্দর্যবোধ, মেধা ও রুচি ফুটিয়ে তোলা যায়, তা আর কোনো পোশাকে সম্ভব হয় না। বিশেষ করে ‘বেঙ্গল বিউটি’ বলে যে কথাটি চালু রয়েছে, তা আর কোনো পোশাকের মাধ্যমে কি পূর্ণাঙ্গ করা সম্ভব?

কবি আল মাহমুদ বাঙালী ললনার শাড়িকে তুলনা করেছেন নদীর সঙ্গে। বলেছেন- নদীর মতো শাড়িরও দুই পাড় থাকে। বাংলার নারীরা যেন শাড়ি নয়, নদীই শরীরে জড়িয়ে রাখে। নদী যেমন বাংলার আদি ও অকৃত্রিম প্রতীক, এখানকার ভূপ্রকৃতি, পরিবেশ, সভ্যতা, সংস্কৃতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, অর্থনীতি- সবই নদীর আশীর্বাদ। একইভাবে বাংলার বস্ত্র মানচিত্র গঠিত হয়েছে ওই সরল এক ফালি বস্ত্রের জমিনকে কেন্দ্র করে। আদিতে সেলাইবিহীন এক টুকরো কাপড়ই ছিল নারীর রূপ, সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশের মাধ্যম। ঐটুকু কাপড়েই তাকে আব্রু রক্ষা করতে হয়েছে। নিজেকে সাজাতেও হয়েছে ঐ সামান্য কাপড়েই। কেননা জামা বা কামিজের চল তখনও হয়নি। সেলাই করা জামার প্রচলন হয়েছে আরও অনেক পরে।

এক সময় বাঙালি নারীর পোশাকে একচেটিয়া দাপট ছিল শাড়ির। শিশু থেকে বৃদ্ধা সবাই বেশ শখ করে পরতেন শাড়ি। কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে শাড়ির বিকল্প ছিল না। সময়ের বিবর্তনে নারীর পোশাকে শাড়ির দাপট কমেছে।

আধুনিক প্রজন্ম যেন শাড়ি পরতেই ভুলে গেছে। শাড়ির স্থান দখল করে নিয়েছে থ্রি-পিস, টু-পিস, মেক্সি, টপস, লেহাঙ্গাসহ বাহারি পোশাক। শাড়ির প্রতি যেন নারীর আর টান নেই।

একসময় পারিবারিক, সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাঙালী নারীরা সাজতো শাড়িতে। কিন্তু এখন আর শাড়িতে মন মানে না বাঙালীর। আধুনিক ও পাশ্চাত্যের সাথে তাল মিলিয়ে সবাই ঝুঁকছে বিদেশী পোশাকে। পরিবারের মা, বোন থেকে শুরু করে কন্যা শিশুরাও এখন অভ্যস্ত হচ্ছে বিদেশী পোশাক পড়নে।

যেখানে শাড়িই ছিলো বাঙালী নারীদের প্রথম পছন্দ। সেখানে বিদেশী পোশাকের ভারে হারাতে বসেছে আবহমান গ্রাম বাংলার শাড়ি শিল্প। ঢাকাইয়া, টাঙ্গাইলা, জামদানি আর মসলিন শাড়ির কথা আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম শুধু বইয়েই পড়বে, দেখতে বা গায়ে জড়াতে হয়ত পারবে না।

বেশ কয়েকজন নারী উদ্যোক্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিদেশী সিরিয়ালের ভক্ত হয়ে উঠতি বয়সী কিশোরী ও তরুনীরা ওয়েষ্টার্ন কালচারের মত সর্ট ড্রেসে আসক্ত হয়ে পড়ছেন। যা দেশের ঐতিহ্যবাহী শাড়ি শিল্পের জন্য খুবই ক্ষতিকর।

শাড়িতেই নারীর আসল সৌন্দর্য ফুটে উঠলেও এসময়ের বেশিরভাগ তরুণীরা শাড়ি পড়তেই পারে না। শেরপুর নিউমার্কেট এলাকায় বেশ কয়েকজন তরুণী ও নারীদের সাথে এব্যপারে কথা হলে অনেকেই বলেন, “দৈনন্দিন প্রয়োজনে বের হলে শাড়ি পড়া হয়ে ওঠে না। কারণ শাড়ির সাথে মেচিং করে চুরি পড়তে হয়।”

সুমী নামের এক কলেজ ছাত্রী বলেন, শাড়ি পরা বেশ ঝামেলার। বিশেষ করে সুতির শাড়িতে কুচি ঠিক করা বেশ কষ্টের। অন্যের সাহায্য ছাড়া শাড়ি পরা যায় না।

এনজিও কর্মী পারভীন সুলতানা বলেন, সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটতে হয় আমাদের। শাড়ি পড়তে সময় লাগে বেশি। আর কালার মেচিং করে হিজাব ও চুড়ি না থাকায় শাড়ি পড়া হয়ে ওঠে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিউমার্কেটের এক পার্লারের সত্বাধিকারী বলেন, আগে ঈদ-পূজোসহ পারিবারিক যেকোন অনুষ্ঠানে শাড়ি পড়া ছিলো বাধ্যতামূলকের মত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে অনেকে শাড়ি পড়া ভুলে গেছে। গায়ে হলুদ বা কনে সাজানো বাদে নারীকে আর শাড়িতে দেখা যায় না। বয়স্ক নারীরাও এখন শাড়ি ছেড়ে মেক্সি পরা শুরু করেছেন।

নয়ানিবাজার এলাকার বেশ কিছু শাড়িবিতানের বিক্রেতার সাথে কথা বলে জানা যায়, বিগত ৫ বছরে আশংকাজনক হারে শাড়ি বিক্রি কমেছে। সে তুলনায় বিদেশী মডেলের জামা ও শটূ বোরকার বিক্রি বেড়েছে।

শাড়ি বিক্রি সম্পর্কে ব্যবসায়ী শামসুল হুদা বলেন, একটা সময় দেখেছি আমার মা, দাদীরা সব সময় শাড়ি পরতেন। এখন পরিবেশ আর তেমন নেই। নারীরা শাড়ি পরতে ভুলে গেছেন। বিয়ে বা একেবারে বিশেষ অনুষ্ঠান ছাড়া নারীরা শাড়ি পরছেন না। থ্রি-পিসসহ ভারতীয় বিভিন্ন পোশাকের প্রতি নারীদের এখন টান বেশি।

ঠিক এমনি করে আজকাল জেলার প্রতিটি উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলেও নারীরা শাড়িবিমুখ হয়ে পড়ছেন। এটা সবার পর্যবেক্ষণে খুব সহজেই চোখে পড়ে। যদিও শহুরে নারীরা কর্মক্ষেত্রে শাড়ি পরার বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কথা বলেন, সেখানে গ্রামাঞ্চলে নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অজুহাত নেই।

বস্ত্রের মা হিসেবে উল্লেখ করা শাড়ি ছেড়ে যাতে বিজাতীয় পোশাকে ঘরের নারীরা আসক্ত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরী। শাড়ি নিছক আবরন নয়; এর সঙ্গে বাঙালী নারীর আত্ম পরিচয়ের প্রশ্নটি নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে।

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের

error: Alert: কপি হবেনা যে !!