You dont have javascript enabled! Please download Google Chrome!

যাকে ভালোবাসতে দিবস লাগে না

পৃথিবীর সবচেয়ে মধুরতম শব্দ হচ্ছে ‘মা’। পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যবহৃত শব্দও ‘মা’। ‘মা’ একটি ছোট্ট শব্দ। এই শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর সব মায়া, মমতা, অকৃত্রিম স্নেহে , আদর, নিঃস্বার্থ ভালোবাসার সব সুখের কথা। চাওয়া-পাওয়ার এই পৃথিবীতে বাবা-মায়ের ভালোবাসার সঙ্গে কোন কিছুর তুলনা হয় না। মায়ের তুলনা মা নিজেই। মা এক অক্ষরে একটি শব্দ অথচ পৃথিবী সমান এর সীমানা। মা’ মানুষের মনের গহীনের শব্দ। ভালোবাসার শব্দ। শ্রদ্ধার শব্দ। পৃথিবীর আর কোন ভাষায় এমন শ্রুতিমধুর শব্দ আছে বলে মনে হয় না।

কত রাত না ঘুমিয়ে তিনি আমাদের বুকে জড়িয়ে বসে ছিলেন। কতদিন নিজের মুখের খাবার তুলে দিয়েছেন নিজে ক্ষুধার্থ থেকে। সন্তান কোথাও গিয়ে আঘাত পেলে ভিজে উঠেছে মায়ের চোখ। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অভিনেতার মতো মুখ বুঝে সব সহ্য করেও কখনো যদি তাকে জিজ্ঞেস করা হয় কেমন আছো মা, সে উত্তর দিবে ভালো আছি। পৃথিবীর সব ভালোবাসা ছোট পরে যায় এই ভালোবাসার কাছে।

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত এক হাদিসে আছে, এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.) আমার সর্বোত্তম ব্যবহারের হকদার কে? হুজুর (সা.) বললেন, তোমার মা। লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, অতঃপর কে? হুজুর (সা.) বললেন, তোমার মা। লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, তারপর কে? এবারও জবাব দিলেন, তোমার মা। লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, অতঃপর কে? এবার নবী করীম (সা.) জবাব দিলেন, তোমার বাবা। (বুখারী ও মুসলিম)। মহাগ্রন্থ আল কোরআনের সূরা বনী ইসরাঈলের ২৩-২৪নং আয়াতে মা-বাবা সম্পর্কে বলা হয়েছে, তোমার প্রতিপালক এ আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাকে ভিন্ন অপর কারও ইবাদত করো না। পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ করো। যদি তাদের একজন অথবা উভয়ই তোমার নিকট উপনীত হয়; তবে তাদের কখনো ‘উহ’ শব্দ পর্যন্ত বলবে না। তাদের ধমক দেবে না বরং তাদের সঙ্গে মার্জিত কথা বলবে। আর তাদের উদ্দেশ্যে অনুগ্রহে বিনয়ের বাহু অবনমিত করবে। আর বল, (তাদের জন্য দোয়া কর) হে আমার প্রতিপালক তাদের উভয়কে অনুগ্রহ কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবে প্রতিপালন করেছে। মা-বাবা যে কত মূল্যবান তা কোরআন এবং হাদীসে স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাই ভালোবাসা দিবস হোক মা বাবা কে ঘিরেই। পৃথিবীতে যদি কেউ কাউকে নিজ জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসে সে হচ্ছে মা।

ভালোবাসা সকল প্রাণীকূলের মধ্যে সৃষ্টিকর্তার এক বিশেষ দান। আর এ ভালোবাসা সৃষ্টিকর্তার সেরা জীব মানুষ থেকে শুরু করে সকল প্রাণীর মাঝেই বিরাজমান। অন্যদিকে ভালোবাসার মাঝে হিংসা, বিভেদ, ভুল বুঝাবুঝির কারনে সৃষ্টি হয় নানা ধরনের প্রতিহিংসা এমন কি প্রাণহানির মত ঘটনা ঘঠে সমাজে প্রতিনিয়ত। ধ্বংস করে মানুষের মনুষ্যত্বকে। দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান বিশ্বে ভালোবাসা দিবসের দিনে বেড়ে যায় নানা ধরনের অপসংস্কৃতি ও অপরাধমূলক কর্মকান্ড, বেড়ে যায় অশ্লীলতা। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ২৬৯ সালে ইতালির রোম নগরীতে সেন্ট ভ্যালেইটাইন’স নামে একজন খৃষ্টান পাদ্রী এবং চিকিৎসক ছিলেন।

ধর্ম প্রচার-অভিযোগে তৎকালীন রোমান স¤্রাট দ্বিতীয় ক্রাডিয়াস তাঁকে বন্দী করেন। কারণ তখন রোমান সা¤্রাজ্যে খৃষ্টান ধর্ম প্রচার নিষিদ্ধ ছিল। বন্দী অবস্থায় তিনি জনৈক কারা রক্ষীর দৃষ্টহীন মেয়েকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলেন। এতে সেন্ট ভ্যালেইটাইনের জনপ্রিয়তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে রাজা তাকে মৃত্যুদন্ড দেন। সেই দিন ছিল ১৪ই ফেব্রুয়ারি। অতঃপর ৪৯৬ সালে পোপ সেন্ট জেলাসিউও ১ম জুলিয়াস ভ্যালেইটাইন’স স্মরণে ১৪ই ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেন্টাইন’ দিবস ঘোষণা করেন। সেই থেকেই ১৪ ফেব্রুয়ারী সারাবিশ্বে পালিত হয়ে আসছে বিশ^ ভালোবাসা দিবস।

ভালবাসা দিবসের মানে কি শুধুই প্রেমিকের প্রেমিকার প্রতি কিংবা প্রেমিকার প্রেমিকের প্রতি ভালবাসা প্রকাশের দিন? অবশ্যই না। একটু অন্যভাবে দেখলে ভালবাসা দিবস মানে সকলের প্রতি ভালবাসা প্রকাশের দিন কিন্তু কালের ¯্রােতে সে অর্থ বদলে শুধু প্রেমিক প্রেমিকার ভালবাসার বিশেষ বহিঃ প্রকাশের দিন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। আমরা কি পারি না সেই দৃষ্টিভঙ্গিটা বদলাতে? ভালোবাসা দিবসের শুরুতেই হাজার হাজার টাকার ফুল বিক্রি হয়। আর দিনের শেষে সেই ফুলই আবার পদপৃষ্ঠ হয় মানুষের।

একটি নির্মম সত্যি কথা হচ্ছে যে, একজন মা একসাথে দশটি সন্তানকে দেখাশোনা করতে পারেন কিন্তু কখনো কখনো দশজন সন্তান একজন মায়ের দেখাশোনা করতে পারেন না। এরকম হাজারো ঘটনা ঘটে চলেছে সমাজের সর্বস্তরে। সমাজের হাজারো গঞ্জনা সয়ে কোনো কোনো মা শুধু সন্তানের দিকে তাকিয়ে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যান জীবনের শেষ দিন পর্যন্তও। বিভক্তির এই দুনিয়ায় সবকিছুই যখন বৈষম্যের মোড়কে ঢাকা তখনো মায়ের ভালোবাসা অবিভক্ত। যে মা গর্ভধারণের কষ্ট সহ্য করলো, কষ্ট করে লালন পালন করে বড় করে তুললো, যে পিতা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অর্থ উপাজন করে সন্তানের খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজন মিটালো, আজকাল দেখা যায় তারা কখনও কখনও সন্তানের অসহ্যের কারণ হয়ে দাঁড়ান। তাই তাদের দুঃখ না দিয়ে তাদের ভালোবাসতে শিখুন। পিতা মাতাকে ভালোবাসতে কোন দিবস লাগে না।

কবি হেলাল হাফিজ তার এক কবিতায় বলেছেন- ‘তোমার জন্য সকাল, দুপুর তোমার জন্য সন্ধ্যা/ তোমার জন্য সকল গোলাপ এবং রজনীগন্ধা’। ভালোবাসাটা অনেকটা এরকমই। যাকে ভালোবাসা যায় তার জন্য জীবনের সব সময়, সব আনন্দ, সব সুন্দর উজার করে দেয়া যায়।

ভালোবাসা একটি দিন দিয়ে বাড়ানো কিংবা কমানো যায় না। তবে এই দিনে এসে অন্তত এইটুকু উপলব্ধি করা যায়, মানুষে মানুষে ভালোবাসা ছাড়া সম্পর্কগুলোর কোনো মূল্য থাকে না বা সম্পর্কগুলো সুখহীন হয়ে পড়ে। সম্পর্কগুলো তখন আর সম্পর্ক না থেকে বোঝা হয়ে পড়ে। তাই সকল মানুষের প্রতি ভালোবাসার মাধ্যমে আমরা আমাদের জীবনকে আরো সুন্দর করে তুলবো। এই হোক ভালোবাসা দিবসের অঙ্গীকার।

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের

error: Alert: কপি হবেনা যে !!