মিনারের পাশে লোহার খুটির অলৌকিক আস্তানা!

রহস্যের কাছে বিজ্ঞানও ব্যর্থ! এমন অনেক উদাহরণই আমাদের জানা! যেসব ঘটনা রহস্যে মোড়া। শত চেষ্টা করেও এসব অলৌকিকতা ভেদ করা হয়তো কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়!

১৯৮৪ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর। প্রায় ৪০০ মানুষ কুতুব মিনারের মধ্যে প্রবেশ করেছিলো। তারা সিঁড়ি দিয়ে ওপরের দিকে উঠছিলো। এদের মধ্যে বেশির ভাগই স্কুলের বাচ্চা। এই মিনারের সিঁড়িগুলো এতটাই সরু যে পাশাপাশি দু’জনও চলতে পারে না। মিনারটির বিশাল উচ্চতার জন্য এর ভেতরে প্রায় ৩৭৯ সিঁড়ি রয়েছে। এমনকি এই মিনারের ভেতরে সূর্যের আলো প্রবেশেরও কোনো ব্যবস্থা নেই। ভিতরের অন্ধকার দূর করার জন্য অবশ্য বিদ্যুতের আলোর ব্যবস্থা ছিলো। সেদিন হঠাৎই সেই আলো বন্ধ হয়ে যায়। অন্ধকারে সমস্ত মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ওঠে।

নিচের দিকে নামার জন্য ছোটাছুটি শুরু করে। এদিকে সিঁড়িগুলো ছোট হওয়ায় নীচে নামা সম্ভব ছিলো না। এতে প্রায় ৪৫ জন মানুষ মারা যায়। যার মধ্যে বেশিরভাগই ছিলো স্কুলের বাচ্চা। এরপর থেকেই কুতুব মিনারের ভেতরে প্রবেশ করা বন্ধ করে দেয়া হয়। যতবারই এই দরজাটি খোলার চেষ্টা করা হয়েছে ততবারই কোনো না কোনো অঘটন ঘটেছে আর সেজন্য এটিকে সরকারিভাবে বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আজো রাতের বেলা, এখানে অলৌকিক শক্তি ঘোরাফেরা করে বলে অনেকের দাবী।

কুতুবমিনার প্রায় ৯০০ বছর পুরনো। অনেকেই বলেন, দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া মৃত ব্যক্তিদের আত্মা আজো সেখানে ঘুরে বেড়ায়। কিছু মানুষ যারা এর আগে এই মিনারের ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন তারাও দাবি করেন, এই মিনারে অলৌকিক শক্তির অস্তিত্ব রয়েছে। আপনি যদি এই মিনারের ভেতরে প্রবেশ করেন তাহলে আপনার মনে হবে যে কেউ যেন আপনার সঙ্গে হেঁটে বেড়াচ্ছে। এখানকার প্রশাসন আজো বলে থাকে, এর ভেতরে কোনো রকম নিরাপত্তা নেই তাই এই দরজাটিকে বন্ধ রাখাই ভালো। তাহলে কি সত্যিই কি ভৌতিকতার কারণে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর জানে না কেউই।

কুতুব মিনার

কুতুব মিনার

ঐতিহাসিক স্থাপত্যস্থাপত্যের দিক দিয়ে আলোচিত ভারতের কুতুব মিনার প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে সৌন্দর্যে ভরপুর। দিল্লীতে অবস্থিত একটি স্তম্ভ বা মিনার। যা বিশ্বের সর্বোচ্চ ইট নির্মিত মিনার। এটি কুতুব কমপ্লেক্সের মধ্যে অবস্থিত, প্রাচীন হিন্দু মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের পাথর দিয়ে কুতুব কমপ্লেক্স এবং মিনারটি তৈরি করা হয়। লাল বেলে পাথরে নিৰ্মিত এই মিনারটির উচ্চতা ৭২.৫ মিটার (২৩৮ ফুট)। মিনারটির পাদদেশের ব্যাস ১৪.৩২ মিটার (৪৭ ফুট) এবং শীৰ্ষঅংশের ব্যাস ২.৭৫ মিটার (৯ ফুট)।

ত্ৰয়োদশ শতাব্দীর প্ৰথম দিকে এই মিনারের নিৰ্মাণকাৰ্য সমাপ্ত হয়। মিনার প্ৰাঙ্গণে আলাই দরজা (১৩১১), আলাই মিনার (এটি অসমাপ্ত মিনারের স্তূপ, এটা নিৰ্মাণের কথা থাকলেও, নিৰ্মাণকাৰ্য সমাপ্ত হয়নি), কুওয়ত-উল-ইসলাম মসজিদ (ভারতের প্ৰাচীনতম মসজিদসমূহের অন্যতম, যেসব বৰ্তমানে আছে), ইলতুৎমিসের সমাধি এবং একটি লৌহস্তম্ভ আছে। একাধিক হিন্দু এবং জৈন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ থেকে এই মিনার নিৰ্মিত হয় বলে কথিত আছে।

অনুমান করা হয়, ভারতে ইসলাম শাসনের প্ৰথম দিকে বহিরাগত আক্ৰমণে এই মন্দিরসমূহ ধ্বংসপ্ৰাপ্ত হয়েছিলো। প্ৰাঙ্গণ কেন্দ্ৰস্থল ৭.০২ মিটার (২৩ ফুট) উচ্চতাবিশিষ্ট যেখানে চকচকীয়া লৌহস্তম্ভ আছে। যা আজ পৰ্যন্ত একটু ও মরিচা ধরেনি। এই লৌহস্তম্ভে সংস্কৃত ভাষায় দ্বিতীয় চন্দ্ৰগুপ্তের একটা লেখা রয়েছে। ১১৯২ সালে কুতুবউদ্দিন আইবেক এই মিনারের নিৰ্মাণ কাজ আরম্ভ করেন। ইলতুৎমিসের রাজত্বকালে (১২১১-৩৮) মিনারের কাজ শেষ হয়। আলাউদ্দিন খিলজির রাজত্বকালে (১২৯৬-১৩১৬) এর প্রাঙ্গণ এবং মিনারের নিৰ্মাণ কাৰ্য সম্পাদিত হয়।

পরবৰ্তীকালে বজ্ৰপাতে মিনার ক্ষতিগ্ৰস্থ হয় যদিও তার সংস্কার করা হয়েছিলো। এর আশেপাশে আরো বেশ কিছু প্রাচীন এবং মধ্যযুগীয় স্থাপনা এবং ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। যারা একত্রে কুতুব কমপ্লেক্স হিসেবে পরিচিত। ইসলামিক স্থাপত্য এবং শিল্প কৌশলের এক অনবদ্য প্ৰতিফলন হিসাবে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় এই প্রাঙ্গণ বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মৰ্যাদা লাভ করেছে। এটি দিল্লীর অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। ২০০৬ সালে সর্বোচ্চ পরিদর্শিত সৌধ এটি। পর্যটকের সংখ্যা ছিল ৩৮.৯৫ লাখ যা তাজমহলের চেয়েও বেশি। যেখানে তাজমহলের পর্যটন সংখ্যা ছিল ২৫.৪ লাখ।

মিনার প্রাঙ্গণ

মিনার প্রাঙ্গণ

আফগানিস্তানের জাম মিনার এর অনুকরণে এটি নির্মিত হয়। পাঁচ তলা বিশিষ্ট মিনারের প্রতিটি তলায় রয়েছে ব্যালকনি বা ঝুলন্ত বারান্দা। কুতুব মিনারের নামকরণের পেছনে দুটি অভিমত রয়েছে, প্রথমত এর নির্মাতা কুতুব উদ্দিন আইবেকের নামানুসারে এর নামকরণ। দ্বিতীয়ত, ট্রান্সঅক্সিয়ানা হতে আগত বিখ্যাত সুফী সাধক হযরত কুতুব উদ্দিন বখতিয়ার কাকীর সম্মানার্থে এটি নির্মিত হয়। কুতুব মিনার বিভিন্ন নলাকার শ্যাফট দিয়ে গঠিত যা বারান্দা দ্বারা পৃথকীকৃত। মিনার লাল বেলে পাথর দিয়ে তৈরী। যার আচ্ছাদন এর ওপরে পবিত্র কোরআনের আয়াত খোদাই করা। ভূমিকম্প এবং বজ্রপাত এর দরুন মিনার এর কিছু ক্ষতি হয় কিন্তু সেটি পুনরায় শাসকদের দ্বারা ঠিক করা হয়।
ফিরোজ শাহ এর শাসনকালে, মিনাররের দুই শীর্ষ তলা বাজ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিন্তু তা ফিরোজ শাহ দ্বারা সংশোধিত হয়েছিল। ১৫০৫ সালে ভূমিকম্প প্রহত এবং সিকান্দার লোদী দ্বারা সংশোধিত হয়েছিল। কুতুব মিনার এর দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে ২৫ ইঞ্চি একটি ঢাল আছে যা নিরাপদ সীমার মধ্যে বিবেচিত হয়। কুতুব মিনারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে মনোরম একটি কমপ্লেক্স। ১০০ একর জমির উপর স্থাপিত এ কমপ্লেক্সে রয়েছে কুওয়াতুল ইসলাম মসজিদ, আলাই মিনার, আলাই গেট, সুলতান ইলতুৎমিস, সুলতান গিয়াস উদ্দীন বলবন, সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি ও ইমাম জামিনের সমাধি ও লৌহ পিলার।

এছাড়া মিনারের প্রাচীর গাত্র নানা প্রকারের অলঙ্করণ দ্বারা শোভিত। ভারত বর্ষের প্রথম মুসলিম শাসক ১১৯৩ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান কুতুব উদ্দিন আইবেক এই মিনারের গোড়াপত্তন করেন। তার তত্ত্বাবধায়নে ১ম ও ২য় তলা নির্মিত হয়। পরবর্তী সময়ে (১২১১-৩৬) সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুৎমিসের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধায়নে মিনারের ৩য় ও ৪র্থ তলা এবং শেষে সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের হাতে পঞ্চম তলা নির্মাণ সমাপ্ত হয়। ঐতিহাসিকদের অভিমত হচ্ছে, কুওয়াতুল ইসলাম মসজিদ-এর মুসল্লিদের সুবিধার্থে আযান দেয়ার জন্য কুতুব মিনার ব্যবহৃত হতো। নীচতলা হতে আযান দেয়া হতো নিয়মিত। সর্বাধিক উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে এটাকে নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ টাওয়ার হিসেবে ব্যবহারের উপযোগিতা লক্ষণীয়।

লোহার পিলার

লোহার পিলার

পিলার রহস্যএই কুতুব মিনার কমপ্লেক্সেই রয়েছে একটি রহস্যময় লোহার পিলার যা হয়তো অনেকেরই অজানা। রহস্যময় এই লোহার পিলারটি প্রায় ১৬০০ বছরের পুরনো। পরিপূর্ণ খাঁটি লোহায় তৈরি এই পিলারটির উচ্চতা ২৩ ফুট ৮ ইঞ্চি বা ৭.২১ মিটার। পিলারের গোঁড়ার দিকে ব্যাস ৩ ফুট ৮ ইঞ্চি, সরু মাথার মাপ ২৯ সেন্টিমিটার এবং পিলারটির মোট ওজন ৬ টন। পিলারটি ঠিক কীভাবে তৈরি হয়েছিলো সে বিষয়ে আজ পর্যন্ত সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই এটি ভারতীয়সহ বিশ্ববাসীর কাছে এখনো এক অজানা রহস্য।

প্রায় ১৬০০ বছর অতিবাহিত হলেও পিলারটির গঠনশৈলীর এতোটুকুও বিকৃত হয়নি আজো পর্যন্ত। পিলারটি এমন এক অদ্ভুত প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হয়েছে যে, এতে কোনো মরিচা ধরেনি কিংবা ক্ষয়ও হয়নি। গবেষকেরা ধারনা করেন, পিলারটি নির্মাণের সময় বিশেষ প্রক্রিয়ায় চাপ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এবং এতে ব্যবহার করা হয়েছে শতকরা ৯৮ ভাগ খাঁটি লোহা। লোককাহিনী অনুসারে, পিলারটিকে এর পূর্বেও বিভিন্ন জায়গায় দেখা গেছে।

একপর্যায়ে পিলারটি অলৌকিকভাবেই কুতুব কমপ্লেক্সে চলে এসেছে। কেউ এটিকে এখানে নিয়ে আসেনি। আবার অনেকের মতে, অদৃশ্য এক শক্তিতে পিলারটি এখানে আসার পরেই কুতুব-উদ-দীন এই মিনার কমপ্লেক্স নির্মাণ করেন। প্রত্নতত্ত্ববিদদের একটি অংশের ধারণা, এটি তৈরি করেন গুপ্ত বংশীয় রাজা দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত। কোনো মন্দির চত্বরে স্থাপনের জন্যই পিলারটি তৈরি করা হয়েছিলো। তবে এটি কীভাবে বর্তমান স্থানে এলো তার কোনো সঠিক ইতিহাস কারো জানা নেই।

রাতের কুতুব মিনার

রাতের কুতুব মিনার

আসলে এমন কিছু সৃষ্টি আছে যা কি-না মানুষকে ধাঁধায় ফেলে দেয়। তারপরও অতীতকালের এসব সৃষ্টি আজো মানুষের গবেষণার বিষয় হিসেবে সৃষ্টির রহস্য উদ্ঘাটনে লিপ্ত রেখেছে। যতই দিন যাচ্ছে ততই যেন মানুষ বিস্ময়ের ধাঁধায় খুঁজে বেড়াচ্ছে আরো কিছু দেখা ও জানার অফুরন্ত আকাঙ্খায়। প্রতি বছর দিল্লি পর্যটন কর্তৃপক্ষ নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে কুতুব কমপ্লেক্সে তিন দিনব্যাপী উৎসবের আয়োজন করে থাকে। রাতে বৈদ্যুতিক আলোর ঝলকানিতে কুতুব মিনার কমপ্লেক্স ধারন করে দীপ্তিময় ও বর্ণিল রূপ।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।