মানব সভ্যতা ধ্বংসের এক অস্ত্র ব্যবস্থা ‘দ্য ডেড হ্যান্ড’

এ যাবৎকালে পৃথিবীতে বিভিন্ন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে। আবার এমনো যুদ্ধ রয়েছে যেখানে কোনো রক্তপাত ছাড়াই যুদ্ধ চলেছে কয়েক যুগ ধরে। এমনি এক যুদ্ধ হল কোল্ড ওয়ার বা স্নায়ু যুদ্ধ। সরাসরি কোনো সংঘাত বা রক্তপাত না ঘটলেও এই যুদ্ধ বিশ্বযুদ্ধের মতই ভয়ংকর ছিল। কারণ স্নায়ু যুদ্ধ চলাকালীন সময় পুরো পৃথিবীব্যাপি চলছিল এক অস্থিরতা এবং ভয়। তখন দুই সুপারপাওয়ার যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিনিয়তই করছিল নিত্য নতুন সব নিউক্লিয়ার অস্ত্রের পরীক্ষা।

আর এসকল নিউক্লিয়ার বোমা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তা নিমিষেই ধ্বংস করে দিতে পারত অনেক সভ্যতা। পুরো পৃথিবীব্যাপিই ছিল নিউক্লিয়ার ওয়ার এর আশঙ্কা। কিন্তু এই আশঙ্কা থেকে জন্ম নিয়েছিল আরো ভয়ংকর একটি অস্ত্র ব্যবস্থা। যা নিমিষেই ধ্বংস করে দিতে পারত মানব সভ্যতাকে। সোভিয়েতদের তৈরি এই অস্ত্র ব্যবস্থার নাম ছিল ‘দ্য ডেড হ্যান্ড’। তাহলে জেনে নেয়া যাক এই ভয়ংকর অস্ত্র ব্যবস্থা সম্পর্কে-

‘দ্য ডেড হ্যান্ড’ সম্পর্কে জানার পূর্বে তখনকার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক। স্নায়ু যুদ্ধের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়ই একটি নিউক্লিয়ার ওয়ারের আশঙ্কা করছিল। এমনকি কয়েকবার এই দুই সুপার পাওয়ার নিউক্লিয়ার ওয়ারের কাছাকাছিও চলে গিয়েছিল। এজন্য পুরো যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নব্যাপি চলছিল ব্যাপক প্রস্তুতি। ভিআইপি তথা নেতাদের জন্য তৈরি হচ্ছিল বিশাল সব নিউক্লিয়ার অ্যাট্যাক থেকে বাঁচতে সক্ষম বাংকার। এছাড়াও দুই দেশই বিভিন্ন দেশে তৈরি করছিল নিজস্ব মিলিটারি বেস। কিন্তু দুই দেশের নেতারাই নিউক্লিয়ার ওয়ার থেকে বাঁচার জন্য এই ব্যবস্থাকে যথেষ্ট মনে করছিল না।

তাদের ধারণা, যদি এক দেশ অন্যদেশকে আক্রমণ করে তার যোগাযোগ ব্যবস্থা নষ্ট করে দেয় তাহলে তারা যুদ্ধে কীভাবে অংশ নিবে কিংবা কীভাবে টিকে থাকবে। সেই থেকে তৈরি হল নিউক্লিয়ার সাবমেরিন। তবে তাও যথেষ্ট ছিল না। তাই দুই দেশই নতুন ব্যবস্থা খুঁজতে শুরু করে। আমেরিকা আরো শক্তিশালী গ্লোবাল নেটওয়ার্ক তৈরির ব্যবস্থা শুরু করে। যা পরে ইন্টারনেট এ রুপ নেয়। অপরদিকে, অপেক্ষাকৃত প্রযুক্তিতে কম উন্নত সোভিয়েত ইউনিয়ন চিন্তা করে আরেক চরমপন্থী অস্ত্র ব্যবস্থার কথা। যা দ্য ডেড হ্যান্ড নামে পরিচিত হয়।

দ্য ডেড হ্যান্ড সিস্টেম বা দ্য ডুমসডে ম্যাশিন মূলত একটি মিসাইল ছিল। যা অত্যন্ত গোপন দ্য ডেড হ্যান্ড বাংকারের মধ্যে লুকানো ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরে নিউক্লিয়ার অ্যাট্যাকের আভাস পেলেই এই মিসাইল সয়ংক্রিয়ভাবে লঞ্চ হবে। এই মিসাইলের বিশেষত্ব হল এই মিসাইল কোনো প্রকার এক্সপোসিভ কিংবা নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড বহন করেনা। তবে এই মিসাইল অত্যন্ত শক্তিশালী একটি কম্পিউটার ও রাডার, সিস্টেম বহন করে। এই মিসাইল এক্টিভ হলে পুরো সোভিয়েত ইউনিয়ন এর উপর থেকে উড়ে যাবে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরে যত নিউক্লিয়ার মিসাইল বেস আছে তার সকল নিউক্লিয়ার মিসাইলকে শত্রু দেশের দিকে নিক্ষেপের জন্য ট্রিগার করে যাবে। এভাবে নিমিষেই ধ্বংস হয়ে যেত পৃথিবী।

এই ব্যবস্থা পুরোপুরি সয়ংক্রিয় বানানোর জন্য প্রস্তাব করা হলেও শেষমেশ দ্যা ডেড হ্যান্ড বাংকারে দু’জন হাইলি ট্রেইন্ড গার্ড রাখা হয়। যারা তিনটি পরিস্থিতিতে এই মিসাইল লঞ্চ করবে৷ পরিস্থিতি তিনটি হল। যদি ক্রেমলিন থেকে প্রিমিটার সুইচ অন করে, সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরে কোন নিউক্লিয়ার বোম্ব বিস্ফোরণ করানো হলে এবং যদি যুদ্ধাবস্থায় পুরো সোভিয়েত ইউনিয়নের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। এই তিনটি শর্ত একত্রে পূরণ হলেই দ্য ডেড হ্যান্ড মিসাইল লঞ্চ করার নির্দেশ ছিল।

সি আই এ এই মিসাইল টেস্টিং সম্পর্কে জানলেও তাদের এই ব্যবস্থা সম্পর্কে জানা ছিল না। ১৯৮৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন এই ব্যবস্থা চালু করে। তবে এই ডেড হ্যান্ড বাংকার কোথায় অবস্থিত তা এখনো অজানা। এই বাংকারকে স্নাযু যুদ্ধের সবথেকে বেশি গার্ডেড স্থান হিসেবে ধারনা করা হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে দ্য ডেড হ্যান্ড সম্পর্কে তথ্য বের হলেও এই ব্যাবস্থা এখনো সচল কিনা তা অজানাই রয়েছে।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।