You dont have javascript enabled! Please download Google Chrome!

বিশ্বকাপ ফুটবল: ‘ফুটবল মানেই গণতন্ত্র’

রাজনীতির বাইরে কি এই দুনিয়ায় কিছু আছে? বিশ্ব যখন ফুটবলে মেতেছে, তখন ফুটবল বা খেলার সঙ্গে রাজনীতি ও রাজনৈতিক তত্ত্বের সম্পর্ক নিয়ে আলাপ-আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। ফুটবলের সঙ্গে ‘গণতন্ত্র’–এর সম্পর্কের বিষয়টি খুবই আলোচিত। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, একটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা যা–ই হোক, সবাই নিজেদের সবচেয়ে বেশি ‘গণতান্ত্রিক’ হিসেবে দাবি করতে চায়। ফলে ফুটবল আর গণতন্ত্রের সম্পর্ক খোঁজার কাজটি খুব সরলও নয়। একটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা গণতন্ত্রের সঙ্গে ফুটবলের কী সম্পর্ক বা খেলা হিসেবে ফুটবল কতটা ‘গণতান্ত্রিক খেলা’, এসব নিয়ে তাই নানা আলোচনা ও তাত্ত্বিক তর্ক-বিতর্কেরও শেষ নেই।

বিবিসির ক্রীড়া সম্পাদক ডন রোয়ান বছর তিনেক আগে একটি লেখা লিখেছিলেন ‘ডেমোক্রেসি ইন স্পোর্টস: অ্যান আনইজি রিলেশনশিপ উইথ ডেমোক্রেসি’ শিরোনামে। লেখাটি তিনি শুরু করেছেন ফিফার মহাসচিব জেরোম ভালকের একটি আলোচিত মন্তব্য দিয়ে, ‘বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য কখনো কখনো কম গণতান্ত্রিক দেশই ভালো।’ ব্রাজিলে গত বিশ্বকাপ (২০১৪) আয়োজন করতে গিয়ে কিছু ঝুটঝামেলায় পড়তে হয়েছিল ফিফাকে। ব্রাজিল সরকারের নানা পর্যায়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে গিয়ে বিরক্ত ফিফা মহাসচিব এই মন্তব্য করেছিলেন। তিনি আরও বলেছেন, ‘যদি একজন শক্তিশালী রাষ্ট্রনায়ক পাওয়া যায়, যিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সেখানে বিশ্বকাপ আয়োজন আমাদের জন্য সহজ; আশা করছি, ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে পুতিনের কাছ থেকে তা পাওয়া যাবে। জার্মানির মতো দেশে আয়োজন করা কঠিন। কারণ, এ ধরনের দেশে সরকারের নানা পর্যায়ে সমঝোতা করতে হয়।’

পুতিনের আয়োজনে রাশিয়ায় এখন বিশ্বকাপ চলছে। এই আয়োজন নিয়ে ফিফা খুব সমস্যায় পড়েছে, এমন কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। পরের বিশ্বকাপ ২০২২ সালে হতে যাচ্ছে কাতারের দোহায়। সেখানেও ফিফাকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের যে ‘সমস্যা’, তাতে পড়তে হবে না। ফিফা মহাসচিবের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অন্তত এটা বোঝা গেল যে গণতন্ত্রের সঙ্গে খেলার সম্পর্কটি বেশ জটিল। তবে একই সঙ্গে এটাও তো সত্য যে অলিম্পিক ও গণতন্ত্র দুটোরই জন্ম গ্রিসে। বিবিসির ক্রীড়া সম্পাদক ডন রোয়ান বিষয়টি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন। খেলার সঙ্গে গণতন্ত্র বা স্বশাসনের সম্পর্কের বিষয়টিও তাই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

গণতন্ত্র ও খেলার মধ্যে যে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে, এমন মতের একজন সমর্থক হচ্ছেন অধ্যাপক পল ক্রিস্টেন। স্পোর্টস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি ইন দ্য অ্যানসিয়েন্ট অ্যান্ড মডার্ন ওয়ার্ল্ড নামে তাঁর একটি বই রয়েছে। সেখানে তিনি বলতে চেয়েছেন, ১৯ শতকে ব্রিটেনে খেলার মাঠগুলোতে জনগণের যে ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল, তার সঙ্গে মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক অধিকারের একটি সম্পর্ক রয়েছে। এই অংশগ্রহণ মধ্যবিত্ত জনগণের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করেছে। তিনি মনে করেন, ক্লাব বা দলের ধারণা জনগণের সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে একটি সমতার পরিস্থিতি তৈরি করে এবং তা বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি শক্তি হিসেবে কাজ করে। গণতান্ত্রিক মনমানসিকতা তৈরির ক্ষেত্রে এর একটি ভূমিকা আছে। খেলাধুলা একে অন্যের মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থা তৈরিতে সহায়তা করে। আধুনিক সমাজে খুব বেশি নিয়ন্ত্রণ চলে না। খেলাধুলায় কিছু আইন ও নিয়মনীতি থাকে এবং এর সঙ্গে যুক্ত হওয়া মানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা মেনেই যুক্ত হওয়া। এসব নানা কিছু বিবেচনায় নিয়ে পল ক্রিস্টেন মনে করেন, গণতন্ত্রকে শক্তপোক্ত করতে খেলাধুলার একটি ভালো ভূমিকা আছে।

তবে অধ্যাপক পল ক্রিস্টেনের কথাই শেষ কথা নয়। খেলাধুলা বা ফুটবলের চর্চা আছে, এমন অনেক দেশে গণতন্ত্রের অবস্থা বেশ খারাপ। সরকার ও রাজনীতিবিদেরা হয়তো খেলাধুলায় উৎসাহ দেন, সফল ক্রীড়াবিদদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন বা বিভিন্ন ক্রীড়া অনুষ্ঠান আয়োজনে যুক্ত থাকেন, কিন্তু গণতন্ত্রের ওপর তা কোনো প্রভাবই ফেলতে পারেনি। আর বিশ্বে এখন তো নির্বাচিত কর্তৃত্ববাদের জোয়ার। গণতন্ত্র যখন বেকায়দায়, তখন গণতন্ত্র ও খেলাধুলার সম্পর্কের হিসাব-নিকাশ মেলানো একটু কঠিন হবেই।

তবে গণতন্ত্র, কর্তৃত্ববাদ বা অন্য যেকোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থাই হোক, সবই তো রাজনীতির অংশ। এই রাজনৈতিক দুনিয়ায় খেলাধুলা বা দল সমর্থন—কোনোটাই পুরোপুরি রাজনীতি ও এর বিচার-বিবেচনার বাইরে নয়। ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার ফুটবল এখন যে অবস্থায়ই থাক, আমাদের দেশে তাদের যে এত সমর্থক, তার কারণ ফুটবলের পরাশক্তি হিসেবে এই দেশ দুটি প্রতিষ্ঠিত। হোক খেলা, ‘পরাশক্তি’ শব্দটি খুবই রাজনৈতিক। এর সঙ্গে যেমন আছে প্রতিযোগিতা, তেমনি আছে পরস্পর বিরোধিতার সম্পর্ক। রাজনীতির সঙ্গে, বিশেষ করে আমাদের দেশের রাজনীতির সঙ্গে এর মিল যথেষ্ট। রাজনীতিতে যেমন এক পক্ষ আরেক পক্ষের বিনাশ চায়, আমাদের ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সমর্থকদের অবস্থাও তা–ই। যেকোনো দেশের সঙ্গে আর্জেন্টিনার পরাজয় ব্রাজিলের সমর্থকদের উল্লসিত করে। আবার ব্রাজিলের পরাজয়ে উৎফুল্ল হন আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা। এই দুটি দেশের বাইরে যে দলগুলো নিজেদের শক্তি নিয়ে গত কয়েক বিশ্বকাপে হাজির হয়েছে, তাদের অনেক সমর্থকও এখন বাংলাদেশে আছেন। এসব বাদ দিয়ে যাঁরা নানা দেশ বা কোনো একটি খেলায় কোনো দেশের পক্ষ নেন, তার পেছনে মূলত রাজনীতিই কাজ করে। কেউ দুর্বল বা গরিব দেশের পক্ষ নেন। কারও মধ্যে রয়েছে পাশ্চাত্য বিরোধিতা। সুতরাং সেই দেশের বিরুদ্ধে যারা খেলছে, তাদেরই সমর্থন করেন। ধর্ম, মহাদেশ, ধনী দেশ, গরিব দেশ, আরব, আফ্রিকান বা লাতিন দেশ, সাদা বা কালোদের দেশ—এসব নানা বিবেচনাই দল সমর্থনের ক্ষেত্রে দর্শক–সমর্থকদের মাথায় কাজ করে। এই বিবেচনাগুলোর সবই অতিমাত্রায় রাজনৈতিক।

গণতন্ত্রের সঙ্গে খেলাধুলা বা ফুটবলের সম্পর্কের জট খোলা কঠিন হলেও খেলা হিসেবে ফুটবল কতটা ‘গণতান্ত্রিক’, সেই বিতর্ক খুব জটিল না–ও হতে পারে। মনে আছে, টাইম সাময়িকী ২০১০ সালের বিশ্বকাপের সময় একটি সম্পাদকীয় লিখেছিল ফুটবল নিয়ে। এর মূল কথা হচ্ছে, সবচেয়ে গণতান্ত্রিক খেলার নাম ফুটবল। এর পক্ষে দাঁড় করানো যুক্তিগুলো এ রকম—ফুটবল যেকোনো বস্তু দিয়ে যেকোনো জায়গায় খেলা যায়। গোল করে কিছু একটা বানিয়ে নিলেই হলো। এই খেলা খেলতে তেমন কিছু জোগাড়যন্ত্র করতে হয় না। ব্যাট, প্যাড বা হেলমেট— এসব কিছুই লাগে না। খেলোয়াড়দের উচ্চতারও কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। শুধু একটু ক্ষিপ্রগতি আর তুখোড় হলেই হয়। যেকোনো দেশ, যেকোনো ধর্ম, যেকোনো গোত্র বা যেকোনো অর্থনৈতিক অবস্থা থেকেই আসুক না কেন, ফুটবলে ‘গ্রেট’ হওয়ার জন্য তা কখনো সমস্যা তৈরি করে না।

এসব যুক্তিকে বাতিল করা কঠিন। এমন একটি খেলাকে ‘গণতান্ত্রিক’ না বলে উপায় কী! তবে ফুটবলকে ‘সবচেয়ে’ গণতান্ত্রিক খেলা হিসেবে মানতে চাননি ম্যারাথন দৌড়বিদ এমবি ব্রুফট। তাঁর পক্ষপাত দৌড়ের পক্ষে। তিনি বলতে চান, দৌড় হচ্ছে সবচেয়ে গণতান্ত্রিক খেলা—‘দৌড়াতে কোনো সরঞ্জাম লাগে না। একাই দৌড়ানো যায়, অন্য খেলোয়াড় না থাকলেও চলে। নিজে তৈরি হয়ে দৌড়ানো শুরু করলেই হলো। আর কেউ চাইলেই বোস্টন, নিউইয়র্ক, শিকাগো, লন্ডন বা অন্য কোনো ম্যারাথনে দুনিয়ার সেরা দৌড়বিদদের সঙ্গেও দৌড়ানো যায়। এমনকি এমন দৌড়ে নারীদেরও পাশে পাওয়া যায়।’ ব্রুফট যে যুক্তিগুলো দিয়েছেন, তা–ও ফেলে দেওয়া যায় না। কোন খেলা ‘বেশি গণতান্ত্রিক’, সেই সিদ্ধান্তে আসা হয়তো কঠিন। কিন্তু চরিত্রের দিক দিয়ে দুটি খেলাই যে গণতান্ত্রিক, তা আমরা স্বীকার করে নিতে পারি।

গণতন্ত্রের সঙ্গে যেমন সবার যুক্ততা বা অংশগ্রহণের সম্পর্ক আছে, তেমনি সম্পর্ক আছে বিরোধিতারও। প্রতিযোগিতা মানেই বিরোধী পক্ষের উপস্থিতি। এটা গণতন্ত্রের একটা বড় শর্ত। বিশ্বকাপ ফুটবলে প্রতিযোগিতা হচ্ছে দেশে দেশে। সব দলের জন্য এখানে একই আইন। ফুটবল তো বটেই, ফুটবল নিয়ে বিশ্বকাপের আয়োজনটিও চরিত্রের দিক দিয়ে গণতান্ত্রিক। ফিফার নির্বাচন নিয়ে ফুটবল লেখক জেসি ফিঙ্কের এক লেখার শিরোনাম ছিল, ‘ফুটবল মানেই গণতন্ত্র, আর গণতন্ত্রে দরকার বিরোধী পক্ষ।’

প্রিয় পাঠক, লেখাটিকে নিছক ফুটবল বা খেলা নিয়ে লেখা হিসেবেই বিবেচনা করুন!
…….এ কে এম জাকারিয়া প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহকারী সম্পাদক।

সূত্র: প্রথম আলো।

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের

error: Alert: কপি হবেনা যে !!