বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় হোক

:রফিকুল ইসলাম আধার:

‘বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের দুই কর্ণধারের শুভেচ্ছা বিনিময়’ শীর্ষক শেরপুরের একটি ছোট্ট খবর গত ১০ মার্চ সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (একাধারে জেলা প্রশাসক ও জেলা কালেক্টর) আনার কলি মাহবুবের উদ্যোগ ও আমন্ত্রণে তার অফিস কক্ষে আয়োজিত ওই শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে নবাগত জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ আল মামুনকে ফুলেল শুভেচ্ছাসহ সম্মাননা ক্রেস্ট দিয়ে বরণ করে নেন তিনি (জেলা ম্যাজিস্ট্রেট)। ওইসময় তারা এক চা চক্রে উভয় বিভাগের চলমান অবস্থা নিয়ে সংক্ষিপ্ত মতবিনিময়ের পাশাপাশি দুই বিভাগের স¤প্রীতির বন্ধন আরও সুদৃঢ় করতে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

এ কথা বলার অবকাশ রাখে না যে, রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের অন্যতম প্রধান দুই স্তম্ভ হচ্ছে বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ। কিন্তু নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের পর থেকে যেখানে দুই বিভাগের চলমান সম্পর্ক অনেকটা বৈরী ভাবাপন্ন, সেখানে শেরপুরে দুই বিভাগের কর্ণধারের মধ্যে ওই শুভেচ্ছা বিনিময়ের বিষয়টি কেবল ইতিবাচক ও প্রশংসনীয়ই নয়, তা অনুসরণীয়ও বৈকী!
এ কথাও আমাদের জানা যে, ব্রিটিশ শাসনামল থেকে শুরু করে আমাদের স্বাধীনতার দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে একটি নিবিড় সম্পর্ক ছিল। পরবর্তীতে উচ্চ আদালতে মাজদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ করে তৎকালীন তত্ত¡াবধায়ক সরকার। সেই থেকে বিচার বিভাগ পুরোপুরি স্বাধীন কিনা তা নিয়ে কিছুটা সংশয় থাকলেও নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণই স্বতন্ত্র অবস্থানে রয়েছে। দেওয়ানীসহ ফৌজদারী মামলাগুলোর বিচারিক কার্যক্রম নিম্ন আদালত থেকে (অর্থাৎ সহকারী জজ ও জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত) জেলা জজ বা সমমর্যাদার আদালতে বা ট্রাইব্যুনালে চলে আসছে বিস্তৃত পরিসরে। একইভাবে উচ্চ আদালতেও চলছে বিচার বিভাগের চূড়ান্ত পর্যায়ের কার্যক্রম।

অন্যদিকে, পৃথকীকরণের পর থেকে জেলা প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা জেলা ম্যজিস্ট্রেটের অধীনে সীমিত পরিসরে কিছু ফৌজদারী ও দেওয়ানী প্রকৃতির মামলার কার্যক্রম চলছে। অর্থাৎ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারী কার্যবিধির ১০৭/১১৭, ৯৮ ও ১০০ ধারা এবং অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারী কার্যবিধির ১৪৪ ধারাসহ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাজার বিষয়ে বিবিধ আপিল গ্রহণ ও শুনানী কার্যক্রম চলছে। আর নির্বাহী বিভাগের উচ্চ পর্যায় দেখভাল করছে বিচারকদের পদায়ন, বদলী ও অবসরজনিত কাজসহ অন্যান্য কার্যাদিসহ রাষ্ট্র/সরকার পক্ষে আইন কর্মকর্তাদের নিয়োগের বিষয়টি।

আর এ অবস্থায় ফিবছর ডিসি সম্মেলনের মধ্য দিয়ে একদিকে নির্বাহী বিভাগ চাচ্ছে তাদের বিচারিক ক্ষমতার পরিধি আরও বাড়ানো হোক। অন্যদিকে বিচার বিভাগ তাদের কোন প্রকার বিচারিক ক্ষমতা রাখার পক্ষে নয়। যে কারণে নির্বাহী বিভাগের আওতায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বিষয়ে এখনও উচ্চ আদালতে চলছে লড়াই। ইত্যকার বিষয়গুলো বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের জেলা পর্যায় থেকে শুরু করে চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত বিদ্যমান বলেই মনে করেন পর্যবেক্ষক মহল। ফলে বিচারপ্রার্থী মানুষের ন্যায়বিচারের পথ তুলনামূলকভাবে অনেকটা সুগম হলেও বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের পর থেকেই উভয় বিভাগের মধ্যে স্নায়বিক দূরত্ব চলে আসছে, যা কোন কোন ক্ষেত্রে তিক্ততারও বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। সম্প্রতি পিরোজপুরে এক সাবেক এমপি ও তার স্ত্রীকে দুর্নীতির মামলায় জামিন না দিয়ে হাজতে পাঠানোর ঘটনায় সেখানকার জেলা ও দায়রা জজকে স্ট্যান্ড রিলিজ এবং সেদিনই অধস্তন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজকে দিয়ে জামিন করানোর ঘটনা সেই তিক্ততারই জানান দেয় বৈকী!

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, জেলা পর্যায়ে এ দুই বিভাগের সাথে দীর্ঘদিন কাজ করার সুবাদে দেখা গেছে, জেলা পর্যায়ে পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেসী মিটিং, লিগ্যাল এইড কার্যক্রম পরিচালনা, নির্বাচনী আপিল, স্পর্শকাতর মামলার দ্রæত বিচার নিস্পত্তিসহ বেশ কিছু ক্ষেত্রে পুলিশ ও আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট আরও কিছু দপ্তরের প্রতিনিধিদের মধ্যে বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের কর্ণধার বা প্রতিনিধির ভূমিকা সর্বাগ্রে। সঙ্গত কারণে তাদের উপস্থিতি ও সমন্বয়ের বিষয়টি অপরিহার্য হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমন্বয়হীনতার কারণে অনেক সমস্যাই সমাধান করা সম্ভব হয় না বা সেই কাজে আসে না গতি। বলাবাহুল্য, বিচার বিভাগ তথা চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেসী সভাসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সভায় অন্যতম প্রধান সদস্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের পাশাপাশি পুলিশ প্রধানের উপস্থিতি অনেকটাই কম দেখা যায়। বিচারপ্রার্থী হতদরিদ্র মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে জেলা ও দায়রা জজের নেতৃত্বে (পদাধিকারবলে চেয়ারম্যান) জেলা আইনগত সহায়তা কমিটি কাজ করলেও সেই কমিটিরও অন্যতম প্রধান সদস্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিও খুব একটা সন্তোষজনক দেখা যায় না। বরং ওই পৃথক দু’টি কমিটির অধিকাংশ সভাতেই দেখা যায় তাদের প্রতিনিধিত্ব করছেন একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পরিদর্শক পদমর্যাদার একজন পুলিশ কর্মকর্তা। সর্বোপরি উপজেলা পর্যায়ে লিগ্যাল এইড কমিটিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাগণ পদাধিকারবলে সাধারণ সম্পাদক বা সদস্য সচিবের দায়িত্বে রয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীনতার কারণে উপজেলা পর্যায়ের কমিটিগুলোর কার্যক্রমে এখনও আসেনি গতি। ফলে ইউনিয়নসহ মাঠ পর্যায়ে লিগ্যাল এইড কমিটির কার্যক্রম এখনও বিস্তৃত হয়ে উঠেনি। আশার কথা, এই প্রথম একজন সিনিয়র সহকারী জজ জুলফিকার হোসাইন রনি সার্বক্ষণিক জেলা লিগ্যাল এইড কর্মকর্তার দায়িত্ব গ্রহণ করায় জেলা পর্যায়ের কর্মকান্ডে গতি অনেকটাই বেড়েছে। আর নির্বাচনী মামলাগুলো সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে বিচার নিষ্পত্তি হলেও তার আপিল চলে একজন যুগ্ম জেলা জজ ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সমন্বয়ে গঠিত আপিল আদালতে। কিন্তু এক্ষেত্রেও দেখা যায়, নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তার ব্যস্ততার কারণে সময়মতো সেই আপিল শুনানী কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

তবে শেরপুরে পরিবর্তিত অবস্থায় আমরা অনেকটাই আশান্বিত এ জন্য যে, প্রায় দেড় বছর আগে জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগদানের পর থেকে একজন আনার কলি মাহবুবকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নান্দনিক শেরপুর গড়তে তার সকল কর্মকান্ডে যতটা সাহসী, আন্তরিক ও সক্রিয় দেখা যাচ্ছে এবং ব্যক্তিত্বের আপন মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে যখন নিজেকে ইতোমধ্যে একজন জনবান্ধব প্রশাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন, ঠিক তখন প্রায় এক মাস আগে যোগদানকারী নবাগত জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ আল মামুনও তার বিচারিক কার্যক্রমসহ ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণে সততা, নিষ্ঠা ও সাহসিকতায় ততোধিক আন্তরিক হবেন- এমনটাই মনে করা হচ্ছে।
সুতরাং বর্ণিত অবস্থায় এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ে তার বাস্তবায়ন এবং বিচারপ্রার্থী মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণের স্বার্থে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দুই স্তম্ভ বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের সমন্বয়ের কোন বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে দুই বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট সভাগুলোতে দুই বিভাগের কর্ণধারদের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ এবং গৃহিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে স্ব-স্ব দায়িত্বশীলতা নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি বিচার ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে দুই বিভাগের মধ্যে ন্যূনতম ত্রৈ-মাসিক, ষান্মাসিক সভা অনুষ্ঠান বা মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নিজেদের মধ্যকার সম্প্রীতির বন্ধন আরও সুদৃঢ় করা যেতে পারে।

‘মুজিববর্ষে’ সরকারের ঘোষণার সাথে একমত পোষণ করে যখন সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান ও দপ্তরসহ অনেকেই বাড়তি পরিশ্রম করছে বা অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় দেশকে এগিয়ে নিতে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, ঠিক তখন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে শেরপুরের বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় করার নজির স্থাপন করবে এবং এখান থেকেই একসময় সেই ইতিবাচক ও অনুসরনীয় নজির সারাদেশে প্রতিফলিত হবে এমনটাই প্রত্যাশা আমাদের।

লেখক: আইনজীবী, সাংবাদিক ও রাজনীতিক, শেরপুর।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।