You dont have javascript enabled! Please download Google Chrome!

বাল্যবিয়েও জীবন সংগ্রাম থামাতে পারিনি আত্নপ্রত্যয়ী জয়িতা শাপলার

একজন শাপলা , ভাল নাম সাবিহা জামান । একাধারে শিক্ষক,সাংস্কৃতিক কর্মী ,সাংবাদিক ও একজন মহিলা উদ্যোগতা ।স্বনামেখ্যাত এই নারীর আজকের এ অবস্থানে আসতে পাড়ি দিতে হয়েছে কঠিন জীবন সংগ্রামের পথ। জীবনের পিছনের দিনগুলো যেন এক একটা রুপকথার রাক্ষস বধের গল্প। সীমাহীন কস্ট পায়ে মাড়িয়ে আজকের এ পথচলা । বলছি ২০১৭ সালে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের “জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ” শীর্ষক কার্যক্রমের আওতায় শেরপুর জেলায় শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে জয়িতা নির্বাচিত হওয়া সাবিহা জামান শাপলার কথা । একান্ত আলাপচারিতায় তিনি জানিয়েছেন তার বাল্যবিয়ে হলেও কিভাবে সব বাধা কাটিয়ে হয়েছেন আজকের জয়িতা । তার গল্পের অনুলিখন করেছেন শেরপুর টাইমস ডটকমের নির্বাহী সম্পাদক মহিউদ্দিন সোহেল ।

জন্ম জেলার সদর উপজেলার চরমোচারিয়া ইউনিয়নের নলবাইদ গ্রামে নিন্ম মধ্যবিত্ত শিক্ষক পরিবারে । বাবা সুরুজ্জামান , মা মোমেনা খাতুন। চার ভাইবোনের মধ্যে সে দ্বিতীয়। বাবা স্কুল শিক্ষক হওয়ার সুবাধে পড়াশুনার হাতে খড়ি বাবার স্কুলেই । কখনো বাবার সাথে সাইকেলে চড়ে আবার কখনোবা তিন কিলোমিটার পায়ে হেটে একই স্কুলে পড়ুয়া বড় বোনের সাথে যাতায়াত করা সত্যিই কষ্টকর ব্যাপার ছিল। এ যেন জীবন সংগ্রামের প্রথম ধাপ । স্কুলে ভাল ছাত্রী এবং ভাল নাচ করার জন্য সবার আদরের মধ্যমণি হওয়ায় সেই কষ্ট যেন কষ্ট মনে হতোনা তার। স্কুলের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ভাল নাচ করায়, প্রতিযোগিতায় বরাবরই ছিল প্রথম ।

এভাবেই পঞ্চম শ্রেনীতে বৃত্তি পরিক্ষা দিয়ে ওই ইউনিয়ন থেকে বৃত্তি লাভ করায় ও সাংস্কৃতিক প্রতিভার কথা বিবেচনা করে এবং অন্যান্য সন্তানদের সুন্দর আগামী গড়ে তুলার স্বপ্ন নিয়ে ছোট ছোট ৪ ভাইবোন নিয়ে শেরপুর শহরে ভাড়া বাসায় উঠেন স্বল্প আয়ের শিক্ষক বাবা । ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে স্কুলে ভর্তি করে পাশাপাশি নৃত্য শেখাতে ভর্তি করা হয় শিল্পকলা একাডেমিতে । নৃত্য শিক্ষক কমলকান্তি পালের দিক্ষায় চলে তার নৃত্যের প্রশিক্ষন। এখানেও নৃত্য ভাল করায় হয়ে উঠেন পরিচিত মুখ। ডাক পড়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রতিযোগিতা করার কিন্তু ভাল কোন শাড়ি গহনা না থাকায় প্রতিবেশিদের কাছ থেকে ধার করে চলতে থাকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন । সাফল্যের পালকে যোগ হতে থাকে প্রথম বা দ্বিতীয় হওয়ার পুরুস্কার ।

এদিকে প্রতিবেশি সমালোচকদের নানা টিপ্পনীতে হঠাৎ করেই নৃত্য করা বন্ধ করে দেন ধর্মিক মা মোমেনা খাতুন। এ যেন স্বপ্ন ভংঙ্গের আরেক ধাপ। কিছুদিন বন্ধ থাকার পরে কখনো মাকে বুঝিয়ে আবার কখনো বাবার অনুমতি নিয়ে মায়ের অজান্তে লুকিয়ে লুকিয়ে চলতে থাকে সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহন ।

১৯৯৩ সাল ,নাচ করার পাশাপাশি যখন দশম শ্রেনীর ছাত্রী, এসএসসি পরিক্ষার দুইমাস আগে, ঠিক তখন হঠাৎ করেই পারিবারিক সিদ্ধান্তে বিয়ে হয়ে যায় বিদেশ ফেরত এক যুবকের সাথে অনেকটা জোর করেই। তখনকার সমাজে বাল্যবিয়ে রোধে আজকের মত এত আওয়াজ ছিলনা । বর্তমান প্রধানমন্ত্রী,শেখ মুজিব কণ্যা, শেখ হাসিনা এখন যেভাবে নারীর মূল্যায়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তখন এমন অবস্থা ছিলনা ।

একদিকে এসএসসি পরিক্ষার বাকী দুইমাস অন্যদিকে শুশুড়বাড়ী থেকে পড়াশুনার পাঠ চুকিয়ে সংসার ধর্মে মন দেয়ার তাগাদা অন্যদিকে বিয়ের একমাস পরই স্বামীর আবার বিদেশ চলে যাওয়া । সব কিছু মিলে যেন দিশেহারা করে দিয়েছিল আমাকে । সারাদিনই শুধু কান্না করতাম । কিন্তু আমার ফেরেশতাতুল্য শুশুড় যিনি একজন ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধের অন্যতম সংগঠক আবুল কাশেম ,উনার সরাসরি হস্তক্ষেপে আমি পরিক্ষায় অংশগ্রহনের অনুমতি পেয়ে যায় , পরিক্ষায় অংশগ্রহন করে ৭২৩ নম্বর পেয়ে প্রথম বিভাগে উর্ত্তিণ হই।

স্বামী বিদেশ থাকায় কলেজে ভর্তি হওয়া যাবেনা বলে কঠোর হুশিয়ারী শুশুড়বাড়ী তথা শাশুড়ির । আবারও শুশুড় মহাশয়ের সাহায্য প্রার্থনা , তার সুপারিশে বোরকা পড়ে শতভাগ পর্দা মেনে কলেজে যেতে হবে এমন শর্তে ভর্তি হলাম কলেজে । একদিকে সংসারের চাপ অন্যদিকে পড়াশুনা ।মাঝে স্বামী বিদেশ থেকে দেশে আসলে কিছুটা স্বস্তি মিললেও অনেকটা সংগ্রাম করেই ১৯৯৫ সালে ইন্টারমিডিয়েট ও ১৯৯৭ সালে বিএ সেকেন্ড ডিভিশনে পাশ করলাম ।

এর মধ্যেই কোলজুড়ে এলো আমার বড় ছেলে। সন্তান, সংসার সব ঝামেলা মাথায় নিয়েও সিদ্ধান্ত নিলাম মাস্টার্স করার, যেই সিদ্ধান্ত সেই কাজ,ভর্তি হলাম আনন্দ মোহন কলেজ, ময়মনসিংহে। চলতে থাকলো পড়াশুনা,সন্তান লালন পালন ও সংসার সামলানো । এবার গর্ভে এলো আমার ছোট ছেলে । ছোট ছেলেকে ৮ মাসের গর্ভে রেখেই খুব ঝুকি নিয়ে শেরপুর থেকে ময়মনসিংহ যাতায়াত করে অংশগ্রহন করি মার্স্টাস পরিক্ষায় ।এবারও সফল হই, সেকেন্ড ডিভিশনে পাশ করি মার্স্টাস পরিক্ষায় ।

বাবা শিক্ষক থাকায় ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখতাম বাবার মত আদর্শ শিক্ষক হবো। সেই চিন্তা থেকেই ২০০৩ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএড প্রশিক্ষন গ্রহন করি । সেই সাথে যুব উন্নয়ন থেকে গ্রহন করি কম্পিউটার প্রশিক্ষন । টানাপোড়েন সংসারে স্বামীকে সহযোগিতা করার জন্য শহরের একটি কিন্ডার গার্টেন স্কুলে শিক্ষকতার চাকুরী নেয়। সেই সাথে খন্ডকালীন বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর, শিশু কিশোর সংগঠন পাতাবাহারের নৃত্য প্রশিক্ষক হিসাবে দ্বায়িত্ব পালন করি।

পাশাপাশি সিনিয়র সাংবাদিকদের সহযোগিতায় শুরু করি সাংবাদিকতা,অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আমি বর্তমানে দৈনিক আমাদের সময়ের শেরপুর জেলা প্রতিনিধি ও দুই মেয়াদের শেরপুর প্রেসক্লাবের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক । সাংবাদিকতা, নৃত্য এবং সামাজিক কার্যক্রম আমার আত্নার ক্ষুধা তথা সামাজিক সুনাম বৃদ্ধি করলেও সংসারের অসসচ্ছলতা থেকেই যায়। চিন্তা শুরু করি কিভাবে এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আর্থিকভাবে সাবলম্ভী হওয়া যায়।

হাত খরচ বাচিঁয়ে জমানো কিছু টাকা ও বাবার কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে ঢাকা থেকে গ্রহন করি পার্লারের প্রশিক্ষন। সেই প্রশিক্ষন কাজে লাগাতে একটি লেডিস পার্লার প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নিলাম কিন্তু এবার বাধা হয়ে দাড়ালেন খোদ জন্মদাতা পিতাই । তার সহজ কথা মাস্টার্স শেষ একটি মেয়ের পার্লারের ব্যবসা করা যাবেনা। সত্যি বললে পার্লার ব্যবসাকে তখন সমাজের মানুষগুলো ভাল চোখে দেখতো না । বাবার ইচ্ছের বিরুদ্ধেই নিউমার্কেটে ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠা করলাম প্রিয়াঙ্গন হারবাল বিউটি পার্লার, শুরু হলো জীবন সংগ্রামের আরো একধাপ। শুরুর দিকে হাতে গুনা দুই/একটি পার্লার শেরপুরে থাকলেও আমি দেয়ার পর শেরপুরেই শুরু করি পার্লারের প্রশিক্ষন । এখন সেই প্রশিক্ষন নিয়ে শেরপুরে কমবেশি পার্লার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অর্ধশতাধিক। অন্যদিকে আমার নিজের প্রতিষ্ঠানেও কর্মরত আছে ৭/৮ জন বিউটিশিয়ান।

পার্লার প্রতিষ্ঠার পর থেকে আমার সংসারে আর্থিক সচ্ছলতা ফিরতে শুরু করে। নিজে যেহেতু পার্লারে শুধু দেখভাল করি তাই হাতে প্রচুর সময় থাকায় এবং শিক্ষক বাবার সন্তান হওয়ায় শিক্ষকতা করার প্রবল ইচ্ছে থাকায় যোগদান করি এমপিওভুক্ত একটি ফাজিল মাদ্রাসায় মাধ্যমিক স্তরে সহকারী শিক্ষক হিসাবে এবং অদ্যবধি সেখানেই কর্মরত আছি।

সেই সাথে শেরপুর প্রেসক্লাবের সাধারন সম্পাদকের দ্বায়িত্ব পালন, জেলার প্রথম অনলাইন সংবাদপত্র শেরপুর টাইমস ডটকমের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, শিশু কিশোর সংগঠন পাতাবাহার,শেরপুর ও রবীন্দ্র পরিষদ,শেরপুরের সহ-সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন শেরপুর জেলা শাখার মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা হিসাবে দায়িত্বপালন, ময়মনসিংহ বিভাগীয় প্রেসক্লাবের সহ সম্পাদক হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন, প্রিয়াঙ্গন যুব মহিলা সংস্থার সভাপতির দ্বায়িত্ব পালন, মহিলা উদ্যোগতা হিসেবে শেরপুর চেম্বার অব কমার্সের সদস্যপদ গ্রহন সহ নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত আছি।

ব্যক্তিগত জীবনে এখন ব্যবসায়ী স্বামী সাইফুল ইসলাম ও দুই ছেলের মধ্যে বড়ছেলে সাকিব-উল-ইসলাম ঢাকার বিজিএমইএ এর ইঞ্জিনিয়ারিং এর শিক্ষার্থী,ছোট ছেলে সিফাত-উল-ইসলাম সদ্য জিএসসি পরিক্ষা শেষ করেছে তাদের নিয়ে সৃষ্টিকর্তায় অসীম দয়ায় খুব ভাল আছি। স্বপ্ন দেখি মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী থেকে নিজের শ্রম,মেধা, কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে সমাজের অসহায় নারীদের উন্নয়নে কাজ করার । নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াতের পথ ধরে এগিয়ে যেতে চায় আমৃত্যু। সহযোগিতা চাই সমাজের সর্বস্তরের গণমানুষের ।

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের

error: Alert: কপি হবেনা যে !!