বাংলার খলনায়কেরা

 সাফি বিন দোহা সিফাত: ২৬ মার্চ এলেই বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ আর স্বাধীন সত্ত্বার অভ্যুদয় সংক্রান্ত নায়কদের নিয়ে আমরা কয়েক অংশে বিভক্ত হয়ে পড়ি। দুই বা ততোধিক অংশের মধ্যে তুমুল প্রকাশ্য-নীরব তর্ক এখন প্রচ্ছন্ন নয়! দেশের বিবাদমান জনগোষ্ঠীর একাংশ এখনো সকাল-সন্ধ্যা স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে রক্তপাতহীন যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে আছে, খুব দ্রুতই এই দ্বন্দ্ব শেষ হবার নয়!
একটা দেশের জাতীয়তাবাদ তখনই দৃঢ় হয় যখন ইতিহাস নিয়ে টানাটানি কম হবে, হতাশার সাথে একটা বিষয় লক্ষনীয় যে ইতিহাস নিয়ে বিগত সময়গুলোতে টানাটানি কম হয় নি, বরং এখনো তার রেশ বেশ প্রকট! এই গেঞ্জামের মধ্য পড়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ‘দেশপ্রেম’ নামক নিরীহ আবেগ।।
স্বাধীনতার নায়ক নিয়ে আমার মধ্যে কোনো দ্বিধার লেশমাত্র নেই, বরং যারা এই আলোচ্য বস্তুতে এসে দলকানা হয়ে যায় তাদেরও আমি জ্ঞান দিতে চাই না!  বরং আমার আগ্রহ এখন সেই খলনায়কদের নিয়ে, যাদের নিয়ে দেশের মতবিরোধী জণগণ মতৈক্যে পৌঁছাতে পারে।
সহজকথায় বলতে গেলে, নায়ক নিয়ে যদি আমরা তর্কে গিয়ে দেশপ্রেমকে সংকটাপন্ন করি, জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে আপোস করে দেশকে করি অবহেলা, তবে এর চেয়ে দেশের খলনায়কদের ঘৃণাভরে মনে রাখার মধ্যেই থাকবে ঐক্যমত!
যুদ্ধকালীন সময়ে মোড়ল রাষ্ট্র আম্রিকার প্রেসিডেন্ট ছিল নিক্সন, আর তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা  ছিল হেনরি কিসিঞ্জার; যে দীর্ঘ জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছে!
‘৭১পূর্ববর্তী সময়েই ইয়াহিয়ার সাথে নিক্সনের গভীর ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ সম্পর্ক ছিল। অনেক সময় ‘বৃহৎ সম্পর্ক’ টিকিয়ে রাখতে এবং একে অন্যকে খুশি রাখতে বহু ‘ক্ষুদ্র’ বিষয় আমলে নিতে হয় না!
২৫ মার্চ গণহত্যা ছিল তেমনই এক বিষয়!  আম্রি-পাকের ভালোবাসা এমন এক ‘অনন্য উচ্চতায়’ ছিল যে এই প্রেম টিকিয়ে রাখতে নিক্সন পারমাণবিক নিক্ষেপের পক্ষেও সায় দিয়ে রেখেছিল!  মার্চের রক্তপাত আর এই ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করেছিলেন, সেই মোড়ল দেশ আম্রিকার বেশ কিছু কূটনৈতিক কর্মকর্তা, যাদের একজনের নাম না বললেই নয়, ‘আর্চার ব্লাড’।
২১ জন কূটনীতিক মিলে কড়া ভাষায় এই গণহত্যা এবং আম্রিকার নীরব ভূমিকার জন্য লিখিত ভাবে প্রতিবাদ লিপি পাঠান!  ততোদিনে বিশ্বের গণমাধ্যমে টনক নড়ে গেছে! মার্কিন মুলুকেও নিক্সনের ভূমিকা নিয়ে চলছে সমালোচনা।
গণহত্যার বিষয় যখন বিশ্ববাসী জানে ঠিক তখনই নিক্সন-কিসিঞ্জার পাকি-প্রেমিকের মত বলে ওঠে যে, পাকিস্তানের বিষয়ে নাকগলানো মানেই ভারত-সোভিয়েত ইউনিয়নকে সাহায্য করা!!!
আর্চার ব্লাড তার প্রতিবাদের ফল পেলেন, তাকে কূটনীতিক কর্মকাণ্ড থেকে অব্যাহতি দেয়া হলো!  পাশাপাশি, কিসিঞ্জার সাহেব নিক্সন এবং ইয়াহিয়ার জন্য চীন, জর্ডান, ইরানের সাথে আঁতাত করা শুরু করে!
ইয়াহিয়ার মার্কিন অভিভাবক হিসেবে নিক্সনের হয়ে কিসিঞ্জার চীনকে উদ্বুদ্ধ করা শুরু করে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে! চীন যেন কাশ্মীরে সেনা মোতায়েন করে কিংবা প্রয়োজন হলে যুদ্ধ শুরু করে, যাতে ভারত পাকিস্তানের ইস্যু থেকে দূরে সরে যায় এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন এই ইস্যুতে এলে পরমাণু দিয়ে বিশ্বে আম্রিকার শাসন কায়েম করা যায়!!!
ততোদিনে ডিসেম্বর মাস চলে এসেছে, দেশে পাকি বাহিনী নাকানিচুবানি খাচ্ছে! ঠিক তখন নিক্সন প্রস্তত ছিল তার সপ্তম নৌবহর নিয়ে!!! যেকোনো মূল্যেই সে তার পাকি প্রেম অটুট রাখতে চেয়েছিলো!
দিনে দিনে অনেক বছর কেটে গেছে, ৩৭তম প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন পটল তুলেছে দুই যুগ আগে, কিন্ত তার সেনাপতি এখনো আছে! কিসিঞ্জার অস্ত্র জমা দিলেও ট্রেনিং জমা দেয় নাই!!! হোয়াইট হাউজে ঘনঘন যাওয়া আসা তার, ট্রাম্প বাবুর সাথে অবাধে মেলামেশা!  ট্রাম্প হয়তো এমন ‘অভিজ্ঞ শ্বেত আম্রিকান’দের খুব কদর করে। এদের নিয়েই আম্রিকা গ্রেট হবে!  চীন,পাকি,আম্রিকা ‘৭১এ যেমন প্রেমিকত্রয় ছিল, হয়তো ভবিষ্যতেও থাকবে!
অন্যদিকে, আমরা, বাংলাদেশীরা বাংলাদেশ, জাতীয়তাবাদ আর স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে প্রকাশ্যে খিস্তিখেউড়ে ব্যস্ত থাকবো!
২৬ মার্চ, ১৯
শেরপুর
মুক্তমত বিভাগের প্রতিটি লেখার দায় সম্পূর্ন লেখকের । কৃতপক্ষ এধরনের লেখার দায়ভার বহন করেনা । এই লেখাগুলো পাঠনের নিজস্ব মতামত মাত্র ।
শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের