বন্ধ হোক পলিথিনের ব্যবহার!

আমাদের বাংলাদেশে বিশেষ করে ময়নসিংহ বিভাগে একটা সময় ছিল, যখন বাজারে গেলে আমরা সবাই হাতে করে একটা চটের ব্যাগ নিয়ে যেতাম। কিন্তু আশির দশকে বাজারে প্রথমবারের মতো পলিথিনের ব্যবহার শুরু হয়। এরপর থেকে বাজারে যে ধরনের দোকানেই যান না কেনো বিনা পয়সায় পলিথিনের ব্যাগ দেয়া শুরু হলো। সহজে সব দোকানে বিনা পয়সায় চাইলেই পলিথিনের ব্যাগ পাওয়া যায়। কিন্তু আমরা কি জানি পলিথিন ব্যবহার করলে আমার কি কি সমস্যা হয়? পলিথিন এমন একটি পদার্থ, যা মাটির সঙ্গে মিশতে শত শত বছর সময় লাগে। এটি মাটির অভ্যন্তরে গেলেও ক্ষয় হয় না বা মিশে যায় না। পলিথিনের রাসায়নিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। পলিথিন অপচনশীল পদার্থ হওয়ায় দীর্ঘদিন অবিকৃত অবস্থায় থেকে মাটিতে সূর্যালোক, পানি ও অন্যান্য উপাদান প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করে। পলিথিন মাটিতে থাকলে মাটির উর্বরতা কমে যায়। মাটির অভ্যন্তরে উপকারী ব্যাকটেরিয়া বিস্তারে বাধা সৃষ্টি করে। তাছাড়া বিভিন্ন ড্রেনে এই পলিথিন পড়ে আটকার কারণে স্বাভাবিক পানির পানির প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। এর ফলে একটু বৃষ্টি হলেই জমে যায় পানি। যা আমাদের রাস্তা কিংবা বাসা বাড়িতে উঠে এসব দূগন্ধযুক্ত পানি। আর আমরা এই পানিতেই হাঁটাচলাচলা করি। এতে আমাদের অসুস্থ্য লেগেই থাকে।

আমরা কি কখনো ভেবেছি, পলিথিন মোড়ানো গরম খাবার খেলে মানুষের ক্যান্সার ও চর্মরোগের সংক্রমণ হতে পারে। পলিথিনে মাছ ও মাংস প্যাকিং করলে তাতে অবায়বীয় ব্যাকটেরিয়ার সৃষ্টি হয়। এছাড়া উজ্জ্বল রঙের পলিথিনে রয়েছে সিসা ও ক্যাডমিয়াম, যার সংস্পর্শে চর্মরোগ তৈরি হয়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রকাশনায় উল্লেখ করা হচ্ছে- এটি মানুষ, প্রাণী এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। পয়োনিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে বন্যার কারণ হিসেবে দেখা দেয়। সাগর ও নদীর তলদেশে জমার কারণে মাটি, পানি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং সামুদ্রিক জীবের ক্ষতি করে এবং যেসব প্লাস্টিক পুনরায় ব্যবহারের অনুপযোগী, তা মারাত্মকভাবে পরিবেশ দূষণ করে। মাটিতে প্লাস্টিকযুক্ত হওয়ার কারণে বর্জ্যের ব্যবস্থাপনা আরো ব্যয়বহুল হয়। প্লাস্টিক ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তৈরি করে এবং প্রজনন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে, শ্বাস-প্রশ্বাসের অসুবিধা এবং ক্যানসারের কারণ হিসেবে দেখা দেয়।

ইন্টারনেটে পাওয়া তথ্যনুযায়ী, ২০০২ সালে প্রথম পরিবেশ বিনষ্টকারী পলিথিনের উৎপাদন ও বিপণন কার্যক্রম এবং ব্যবহার বন্ধে আইন পাস হয়। দেশের সর্বত্র চলছে পলিথিনের নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার। আইন প্রণয়নের পরবর্তী সময়ে রফতানি করা সকল পণ্যের মোড়কের ক্ষেত্রে, রেণু পোনা পরিবহনের জন্য পণ্যের গুণগতমান রক্ষার স্বার্থে প্যাকেজিং কাজে ব্যবহারের জন্য, মাশরুম চাষ ও প্যাকেজিংয়ের জন্য এবং নার্সারির চারা উৎপাদন ও বিপণনের জন্য পলিথিন ব্যবহারে কিছুটা ছাড় দেয়া হয়। কিছু কিছু পণ্যের মোড়কের জন্য পলিথিন উৎপাদনের অনুমোদন থাকলেও পলিথিন উৎপাদন কারখানগুলো গোপনে নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন শপিং ব্যাগ তৈরি অব্যাহত রেখেছে। ফলে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে বাজার থেকে পলিথিন ব্যাগ নিধনের যে কার্যক্রম পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর হাতে নিয়েছে তা কিছু সময়ের মধ্যে পুরোপুরি ভেস্তে গেছে। কি ছিলো পলিথিন ব্যবহার আইনে,

‘সরকার নির্ধারিত পলিথিন সামগ্রী উৎপাদন, আমদানি ও বাজারজাতকরণে প্রথম অপরাধের দায়ে অনধিক ২ (দুই) বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ২ (দুই) লাখ টাকা অর্থদণ্ড (জরিমানা) বা উভয় দণ্ড এবং পরবর্তী প্রতিটি অপরাধের ক্ষেত্রে অন্যূন ২ (দুই) বছর, অনধিক ১০ (দশ) বছরের কারাদণ্ড বা অন্যূন ২ (দুই) লাখ টাকা, অনধিক ১০ (দশ) লাখ টাকা অর্থদণ্ড (জরিমানা) বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন অপরাধীরা’।

বিক্রি, বিক্রির জন্য প্রদর্শন, মজুদ, বিতরণ, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের দায়ে অনধিক ১ (এক) বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড (জরিমানা) বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

‘পরবর্তী প্রতিটি অপরাধের দায়ে অন্যূন ২ (দুই) বছর, অনধিক ১০ (দশ) বছরের কারাদণ্ড বা অন্যূন ২ (দুই) লাখ টাকা, অনধিক ১০ (দশ) লাখ টাকা অর্থদণ্ড (জরিমানা) বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন অপরাধীরা’।

‘পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর সামগ্রী উত্পাদন, বিক্রয় ইত্যাদির উপর বাধা-নিষেধ’ শীর্ষক আইনের ৬(ক) ধারায় বলা হয়, ‘সরকার মহাপরিচালকের পরামর্শ বা অন্য কোনোভাবে যদি সন্তুষ্ট হয় যে, সকল বা যেকোনো ধরনের পলিথিন শপিং ব্যাগ বা পলিইথাইলিন বা পলিপ্রপাইলিনের তৈরি অন্য কোনো সামগ্রী বা অন্য যেকোনো সামগ্রী পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর, তাহলে, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দিয়ে সারা দেশে বা কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় এ ধরনের সামগ্রীর উত্পাদন, আমদানি, বাজারজাতকরণ, বিক্রি, বিক্রির জন্য প্রদর্শন, মজুদ, বিতরণ, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার বা প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত শর্তাধীনে ওই সকল কার্যক্রম পরিচালনা বা ব্যবস্থাপনার বিষয়ে নির্দেশ জারি করতে পারবে। এবং ওই নির্দেশ পালনে সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি বাধ্য থাকবেন’।

‘তবে শর্ত থাকে যে, ওই নির্দেশ নিম্নবর্ণিত ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না, (ক) ওই প্রজ্ঞাপনে বর্ণিত সামগ্রী রফতানি করা হলে বা রফতানি কাজে ব্যবহৃত হলে, (খ) কোনো নির্দিষ্ট পলিথিন শপিং ব্যাগের ক্ষেত্রে ওই নির্দেশ প্রযোজ্য হবে না মর্মে ওই প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হলে’৷

‘পলিথিন শপিং ব্যাগ’ বলতে বোঝানো হয়েছে পলিইথাইলিন, পলিপ্রপাইলিন বা এর কোনো যৌগ বা মিশ্রণের তৈরি কোনো ব্যাগ, ঠোঙ্গা বা অন্য কোনো ধারক যা কোনো সামগ্রী কেনা-বেচা বা কোনো কিছু রাখা বা বহনের কাজে ব্যবহার করা যায়৷

তবে, পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করাকে বরাবরই স্বাগত জানিয়েছেন পরিবেশবাদিরা। তারা পলিথিনের বদলে পাটের তৈরি ব্যাগ ব্যবহারের পরামর্শ দেন। কিন্তু কোনো পণ্য কিনলে সহজেই একটি পলিথিন ফ্রি পাওয়া যায়। যে কারণে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না করেই সবাই আনন্দচিত্তে পলিথিন নিয়ে ঘরে ফেরেন।

পলিথিন ব্যবহারের কারণে জনজীবন, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতির পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব পাটের কদর কমে যাচ্ছে, কমছে পাট চাষ। বন্ধ হচ্ছে পাট দিয়ে উৎপাদিত পণ্যের কারখানা। বেকার হচ্ছে কুটিরশিল্পের মালিক ও শ্রমিক-কর্মচারীরা। সারা বিশ্বে পাটের চাহিদা বাড়লেও আমাদের অবহেলা ও সচেনতার অভাবে সোনালি আঁশ পাট আজ বিলুপ্তির পথে।

পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন, ২০১০ (২০১০ সনের ৫৩ নং আইন) (২০১৩ সনের ৩৮ নং আইন দ্বারা সংশোধিত) এর ধারা-৪ পণ্য সামগ্রীতে পাটজাত মোড়ক ব্যবহারঃ কোন ব্যক্তি বিধি দ্বারা নির্ধারিত পণ্য, পাটজাত মোড়ক দ্বারা মোড়কজাতকরণ ব্যতিত, বিক্রয়, বিতরণ বা সরবরাহ করতে পারবে না।

বিশ্বজুড়েই পলিথিন বর্জনের আওয়াজ উঠেছে। সেই লক্ষে ময়মনসিংহ বিভাগে পলিথিন মুক্ত করতে কাজ করছে সরকারের উদ্বর্তন কর্মকর্তারা। কিন্তু আজো কি কমেছে পলিথিনের ব্যবহার। পলিথিনের ব্যবহার কমাবার আগে প্রয়োজন নিজেদের উদ্যোগ। মানুষ সচেতন হলে দেশ এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা থেকে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন হয়ে যায়। আমরা কেনো পারি না পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করতে; কেনোই বা আমরা যেতে পারছি না আশির দশকের আগে চটের ব্যাগের ব্যবহারে। কি আমাদের সমস্যা; আমাদের সমস্যা আমাদেরই সমাধান করতে হবে। আসুন আমরা সবাই মিলে বন্ধ করি পলিথিনের ব্যবহার। আপনার আমার একটু সচেতনায় বন্ধ হতে পারে পলিথিনের ব্যবহার। আমরাই গড়তে পারি পলিথিন মুক্ত ময়মনসিংহ বিভাগ।

লেখক- শাকিল মুরাদ
সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী
মেইল: exclusivebyshakil@gmail.com

শেরপুর টাইমস ডট কম-এর মতামত পাতায় প্রকাশিত লেখার দায়ভার লেখকের নিজের। এর দায় শেরপুর টাইমস কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করবে না। সমসাময়িক বিষয় নিয়ে শেরপুর টাইমসের মতামত পাতায় আপনিও আপনার মতামত জানাতে পারেন sherpurtimesdesk@gmail.com এই মেইলে।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।