প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে নৈতিকতা, সমস্যা ও করণীয়

:নাজমুন নাহার:

শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড, শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনা। ব্যক্তি, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে নিজেকে উপস্থাপন করার জন্য সর্ব প্রথম যে বিষয়টা প্রয়োজন তা হলো শিক্ষা। শিক্ষা অর্জনের মৌলিক ভিত্তি তৈরীর স্থান হলো প্রাথমিক বিদ্যালয়। একটি জাতি কিভাবে তৈরী হবে তা নির্ভর করে প্রাথমিক শিক্ষার উপর।

আমরা জানি, এক দশক আগেও বাংলাদেশে স্কুলগামী ছাত্র-ছাত্রীর হার ছিল খুব কম। মেয়েদের হার ছিল আরও কম। সরকারের নানামুখী পদক্ষেপে যেমন শতভাগ উপস্থিতি, অভিভাবকদের সচেতন, শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্থা, সময়মত বই বিতরণ, বিনা বেতনে শিক্ষা, ফ্রি টিফিনের ব্যবস্থা, বাল্য বিবাহ রোধ, পোষাকের জন্য অর্থ বরাদ্দ প্রভৃতি কারণে স্কুলগামী ছেলেমেয়ের সংখ্যা যেমন বেড়েছে তেমনি শিক্ষার হারও প্রতি বছর বেড়েই চলেছে।

 

শিক্ষার জন্য বিনিয়োগ অর্থবহ ফলাফল বয়ে আনে। আপনার সন্তানকে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোন বিকল্প নেই। সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা প্রদানে নিয়োজিত থাকেন প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ শিক্ষকমন্ডলী। তাদের কাছেই আপনার সন্তান যথাযথ প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠবে। সেই লক্ষেই বর্তমান সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে অন্যতম অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনায় নিয়েছে। শিক্ষার হার বাড়ছে, শিক্ষিত সমাজের সংখ্যা আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পেলেও দুঃখের ব্যপার হলো আমরা তাদেরকে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তাদের মাঝে দেশ প্রেম জাগ্রত করে দিতে পারছি না। শিক্ষার পাশাপাশি ন্যায় অন্যায় পার্থক্য বুঝিয়ে নিজের জীবনে বাস্তবায়নের কতটুকু প্রয়োজনীয়তা উপলব্দি করাতে পেরেছি? যে ছেলেটি/ মেয়েটি প্রাথমিক শিক্ষার গন্ডি পেরিয়ে স্কুল কিংবা বিশ্বদ্যিালয় জীবনে এসে সন্ত্রাস, মাদকাশক্ত, জঙ্গীর মত আত্মঘাতী জীবনে জড়িয়ে যায় তখন প্রাথমিক শিক্ষার মান ও নৈতিকতা নিয়ে চরম প্রশ্ন স্বাভাবিক। প্রাথমিক শিক্ষা জীবনে শিক্ষকের সম্মান মর্যাদাবোধটুকু তার অন্তরে গেথে দিতে পেরেছি নাকি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে গিয়ে শিক্ষকের উপর হাত তুলে উল্লাস করাকেই ছাত্রত্ব বলাটা শিখিয়েছি? চাকরী জীবনে গিয়ে নিজের দায়িত্বানুভুতি থেকে নাগরিক সেবায় নিয়োজিত করে নাকি ঘুষ দুর্নীতির মাঝে নিজেকে ডুবিয়ে জাতির ধবংসের শিক্ষা দিচ্ছি? একজন সেবা প্রাপ্তির কাছে কেমন ব্যবহার করতে হবে তা কতটুকু শিখাতে পেরেছি? সরকারের এত সুযোগ সুবিধা ও আধুনিকায়নের যুগেও আমার মনে হয় এসব প্রশ্নে অধিকাংশরাই বলবেন আমরা চেষ্টা করেছি বাস্তবায়ন করতে পারিনি। এই শিক্ষা দিয়ে একটি দেশ ও জাতি বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নিজেকে প্রস্তুত করতে পারবে কি?

প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় সরকার এত গুরুত্ব প্রদান করার পরেও এই অবস্থার পেছনে যেসব সমস্যা মনে করি তার মধ্যে অন্যতম কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করবঃ

 

() নিজের দায়িত্ব পরিপূর্ন ভাবে পালন না করাঃ

আমরা যারা প্রাথমিক শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত তাদের মনে রাখতে হবে আমাদের শুধু পেশাগত দায়িত্ব পালনই আমাদের কাজ না বরং একজন সন্তানকে গড়ার জন্য যেরকম চতুর্মুখী চিন্তা করে সন্তানের ভবিষ্যত গড়তে, ঠিক তেমনি শুধু শিক্ষা নয় একটি শিশুর জীবন গঠনে র্পূনাঙ্গ দায়িত্ব পালন করা।

 

() নৈতিকতা শিক্ষা না দেয়া:

প্রাথমিক শিক্ষা স্তরের সিলেবাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, সেখানে নৈতিক শিক্ষা  বা নীতি কথার চেয়ে তাও্বিক কথা অনেক বেশী যা বাচ্চারা মুখস্থ করে পরীক্ষায় পাশের জন্য। আবার পরক্ষণে তা  ভুলেও যায়। আচরণগত শিক্ষা দেয়া হয় খুবই কম, এমনকি প্রতিদিন লাইনে দাঁড় করিয়ে যে শপথ বাক্য পাঠ করানো হয় তার অর্থ হৃদয় দিয়ে কতজন ছাত্র ছাত্রী অনুভব করে তা নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন রয়েছে। তাছাড়া কিছু পাঠ্য কথা রয়েছে যা দিয়ে অন্যায় কাজে অনুভুতি জাগ্রত করে এবং অবস্তাব অকল্পনীয় কিছু শিক্ষা দিয়ে গড়ে তুলি। সত্যিকারের নৈতিকতাবোধ জাগ্রত হওয়ার মত সিলেবাস থেকে আমরা অনেক দুরে।

() মান সম্পন্ন শিক্ষকের অভাবঃ

শুধু সার্টিফিকেট অর্জন করলেই যেমন শিক্ষিত হওয়া যায়না তেমনি শুধু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য আর যাই হেকে শিক্ষকতা পেশাই আসা ঠিকনা। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো আমরা অধিকাংশরা এই মানষিকতার হয়ে গেছি। বলতে দ্বিধা নেই, যারা মানুষ গড়ার কারিগর, তাদের অনেকেরই নৈতিক মান নিয়ে অনেক খবর আমাদের নজরে আসে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখানোর মহান দায়িত্ব যাদের তারা শিক্ষকতা নামক মহান পেশাটিকে নেহায়েতই আয় রোজগারের একটি উপায় হিসেবে বেছে নিচ্ছেন বা নিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের শিক্ষকতা করার যোগ্যতা সর্ম্পকেই প্রশ্ন চলে আসে। নিজেই যদি এসব বিষয়ে অজ্ঞ থাকে তাহলে কোমলমতিদের কি শিক্ষা দিবে।
অতিমাত্রায় রাজনৈতিক  হিসেবে উপস্থাপনঃ কিছু মানুষ জগতে সবসময় থাকবে যারা নিজেদের অযোগ্যতাকে ঢাকতে সবসময় প্রভাব বিস্তারকারী ব্যাক্তি বা গোষ্টির তাবেদারিতে ব্যস্ত থাকে বা যখস যে রাজনৈতিক ক্ষমতায় থাকে তাদের অনুকম্পা পাওয়ার জন্য ব্যস্ত থাকায় নিজের দায়িত্বটুকুও ভুলে যায়। যারা মহান পেশাগুলোতে ব্যাপকহারে দায়িত্বহীনতার ব্যাপার ঘটে যায়।

() শিক্ষকের অপ্রতুলতা:
বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র-ছাত্রী-শিক্ষকের যে অনুপাত তা মানসম্মত শিক্ষার জন্য মোটেও উপযোগী নয়। একটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলার জন্য যে জনবল প্রয়োজন সেই তুলনায় সংখ্যাটা অপ্রতুল। যার কারনে কাংখিত লক্ষ্যে পৌছার চিন্তা থাকলেও সীমাবদ্ধতার কারনে অনেক সময় পিছু হটতে হয়।

() শিক্ষার পরিবেশের অভাব:
আদর্শবান জাতি গঠনের লক্ষ্যই সুস্থমেধা বিকাশ উপযোগী যে ধরনের শ্রেণি কক্ষ দরকার তা অনেক বিদ্যালয়েই অনুপস্থিত। সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, অনেক বিদ্যালয়ে বসার বেঞ্চ নেই, খেলার সামগ্রী নেই। যা প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে অত্যন্ত জরুরি।

() দারিদ্র:
বাংলাদেশে এখনও অনেক পরিবার দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করছে। এসব পরিবারের মা-বাবারা মনে করেন তার সন্তান স্কুলে গিয়ে যে বৃত্তি পাবেন তার চেয়ে অনেক বেশি আয় করতে পারবে বাসাবাড়ী বা বাইরে অন্য কথাও কাজ করে। ফলে তারা তাদের সন্তানদের বিদ্যালয়ের চেয়ে জীবন জীবিকার কাজে নিয়োজিত করতেই বেশি পছন্দ করে। শিক্ষার সুদুর প্রসারী ফলাফল সম্পর্কে তাদের ধারণাও একবারেই কম।

() ব্যবস্থাপনা কমিটির দুর্বলতা:
বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি অন্যতম দায়িত্ব হলো শিক্ষার মান উন্নয়নে কাজ করা। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এসএমসির অনেক সদস্যই শিক্ষার গুরুত্ব বা গুনগত মান বৃদ্ধির বিষয়ে মোটেও সচেতন নয় । অনেকেই এসএমসির সদস্য হওয়াকে বা সভাপতি হওয়ার বিষয়টিকে সন্মান বৃদ্ধির/ক্ষমতা-আধিপত্য বৃদ্ধির/আয় রোজগার বৃদ্ধির উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হওয়ার ক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শকে বিবেচনায় না এনে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং  শিক্ষার প্রসারে তাঁর অবদানকে বিবেচনা করার জন্য বাধ্যতা মূলক করা যেতে পারে ।

() অভিভাবকদের অসচেতনতা:
বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ যেহেতু গ্রামে বসবাস করে এবং তারা কৃষি কাজে জড়িত, স্বাভাবিক ভাবেই তারা তাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে তাদের মত কৃষক বানাতে চায়। তাদের অনেকের ধারণা, পড়ালেখা করে গরীব মানুষের সন্তানদের চাকরি পাওয়া কঠিন। তা ছাড়া শিক্ষার গুরুত্ব বা সুদুর প্রসারী ফল নিয়ে চিন্তা করার মত কল্পনা শক্তিও তাদের নেই।

()সামাজিক প্রতিবন্ধকতাঃ

একজন সন্তানকে মানুষ হিসেবে গঠন করতে হলে অনেক সময় কঠোরতা অবলম্বন করতে হয় সেখানে এ কাজ পরিচালনা করতে গিয়ে অবিভাবক ও সমাজের অনেক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয় বিধায় অনেক সময় এই ধরনের দায়িত্ব কেউ নিতে চায়না।

 

প্রাথমিক  শিক্ষাকে নৈতিকতা সম্পন্ন ও  মান উন্নয়নে করণীয়:
 শিক্ষক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মেধাবী, চরিত্রবান ও যোগ্যতা সম্পন্ন প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে হবে। শিক্ষকদের পৃথক বেতন কাঠামো করে তাদের মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতে হবে।  ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত কমিয়ে আনতে হবে। শুধু সিলেবাসভুক্ত পড়াশুনা না করিয়ে আদর্শ ভিত্তিক নীতি নৈতিকতা সম্পন্ন মানসিকতা তৈরির পদক্ষেপ নিতে হবে। চার বছর বয়সে স্কুলে গমন বাধ্যতামূলক করে ছয় বছর বয়স পর্যন্ত শুধু নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। ভাল মন্দ, নিয়ম অনিয়ম, প্রাত্যাহিক জীবনে করণীয় গুলো হাতে ধরিয়ে শিক্ষা দেয়া। ৭ বছর বয়নের  হলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রদান শুরু করতে হবে। শুধুমাত্র মুখস্থ বিদ্যার দিকে মনোনিবেশ করার জন্য কোন ধরনের চাপ প্রয়োগ না করা। পর্যাপ্ত পরিমান খেলাধুলা ও শিশুদের মনের মত বিনোদনের ব্যবস্থা করা। মাতৃপিতৃ মমতায় তাদের লালন করা। বিদ্যালয়কে পরিপাটি ও পারিবারিক বাসস্থানের মত শিশু বান্ধব হিসেবে গড়ে তুলা। পাঠ্যপুস্তকের পাঠাপাশি নিয়ানুবর্তিতা শিক্ষার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করা। শিক্ষক হিসেবে নিজেকে যোগ্যতম হিসেবে গড়ে তুলে শিক্ষা দান করা। শিক্ষার ব্যাপারে অভিভাবকদের আরও বেশী সচেতন করতে হবে। সুস্থ্য মেধা বিকাশে  শিক্ষার পরিবেশ তৈরির জন্য যা যা প্রয়োজন সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য তা নিশ্চিত করতে হবে।

পরিশেষে আশাবাদ ব্যক্ত করতে চাই যে, বিনয়ী, সৎ ও যোগ্যতা সম্পন্ন একটি জাতি গঠনের জন্য যে সব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে সেগুলো অবশ্যই একদিন দূর হবে এবং যে স্বপ্ন সাধ নিয়ে এই জাতির পথ চলা শুরু হয়েছিল তা অচিরেই পূর্ণ হবে। আমরা পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, দায়িত্ববোধ এবং সেবাধর্মী একটি জাতি গঠনে সবাই কাজ করব। নীতি নৈতিকতা সম্পন্ন, দেশ প্রেম জাগ্রত করে কর্মসূখী হিসেবে গড়ে তুলতে প্রাথমিক স্তর থেকে মুল ভিত্তি রচনা করে দেব।

আসুন আমরা সবাই মিলে প্রাধমিক বিদ্যালয় গুলোকে আমাদের পছন্দের মতো করে গড়ে তুলি। কেবল সরকার করে দেব এই আশায় না থেকে সামাজিক উদ্যোগ থেকেই এটা করা সম্ভব।

 

 

লেখক:- সহকারি শিক্ষক, কালিনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নালিতাবাড়ী, শেরপুর।

 (সম্পাদনা: এম. সুরুজ্জামান, বার্তা সম্পাদক, শেরপুর টাইমস ডটকম)

 

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।