You dont have javascript enabled! Please download Google Chrome!

ডিজিটাল বাংলাদেশ ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

এক. ডিজিটাল কথাটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য স্পষ্ট না হলেও ডিজিটাল বাংলাদেশে শব্দযুগল ব্যাপকভাবে পরিচিতি পেয়েছে। ইংরেজী ডিজিট শব্দের বিশেষণ হলো ডিজিটাল । ডিজিটের বাংলা অর্থ অঙ্ক; এখানে অঙ্ক অর্থ গণিত শস্ত্র নয়। ব্যাপকভাবে ব্যবহার হওয়া দশমিক পদ্ধতির গণনার দশটি অঙ্ক : ০ হতে ৯ এই দশটি অঙ্কের ভিত্তিতে ডিজিটাল যন্ত্রপাতির বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব। কম্পিউটার, ক্যালকুলেটর, মোাবাইল ফোন সেট সহ সব ধরনের ডিজিটাল যন্ত্রপাতি ০ এবং ১ এই দুইটি অঙ্কের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়। আধুনিক সভ্যতা ডিজিটাল যন্ত্রপাতির ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। ডিজিটাল যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়িয়ে দেশকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যাওয়াই ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’- এর অর্ন্তনিহিত তাৎপর্য।

দুই. ডিজিটাল বাংলাদেশ বলতে আমরা এক বাক্যে বলি ২১ শতকের সোনার বাংলা। আবার কেউ কেউ বলেন, সুখী, সমৃদ্ধ, ক্ষুধা ও দারিদ্র মুক্ত বাংলাদেশ। ডিজিটাল বাংলাদেশ হচ্ছে সুখী, সমৃদ্ধ, শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর দূর্নীতি, দারিদ্র ও ক্ষুধা মুক্ত বাংলাদেশ। যার সকল প্রকারের বৈষম্যহীন প্রকৃত পক্ষে সম্পুর্ণভাবে জনগণের রাষ্ট্র এবং যার মূখ্য চালিকা শক্তি হচ্ছে ডিজিটাল প্রযুক্তি। এটি বাঙ্গালির উন্নত জীবনের প্রত্যাশা, স্বপ্ন ও আকাঙ্খা । এটি বাংলাদেশের সকল মানুষের নূন্যতম মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর প্রকৃষ্ট পন্থা। এটি ১৯৭১ এর মহান স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের রূপকল্প। এটি বাংলাদেশের জন্য স্বল্পোন্নত বা দরিদ্র দেশ থেকে সমৃদ্ধ, উন্নত ও ধনী দেশে রূপান্তরের জন্য মাথাপিছু আয় তথা জাতীয় আয় বাড়ানো অঙ্গীকার। এটি বাংলাদেশে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সোপান। এটি ২১ শতকের সোনার বাংলা।

তিন. ২০০৭ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারনাটির কথায় অনেকে বলেছেন যে, আমরা বাংলাদেশ নামক দুনিয়ার দরিদ্রতম একটি দেশ থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচী গ্রহণ করছি। কিন্তু অন্য দেশগুলো কি করছে? আর কোন দেশের নামের সাথে তো ডিজিটাল শব্দ যোগ হচ্ছে না। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে যখন এটি বর্তমান সরকারের ইশতেহারে লেখা হয়, তখনও আমরা এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি। তখনও আমাদের কাছে সারা দুনিয়ার পুরো চিত্রটা ছিল না। শুধু জানতাম দুনিয়ার প্রায় সকল দেশই তার নামে সাথে ইংরেজী ‘ই’ বর্ণটি যোগ করে সেই দেশটি তথ্য প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ করার চেষ্ঠা করেছে। তারা ই-গভর্নমেন্ট, ই-কমার্স ইত্যাদি নামে কর্মসূচী নিচ্ছে। আমরা ই-এস্তোনিয়ার কথা শুনেছিলাম, ই-শ্রীলংকার কথা শুনেছিলাম। কিন্তু আমেরিকা-ব্রিটেন, জার্মানী এই সব দেশের কোন কর্মসূচীর সাথে আমাদের কোন পরিচয় ছিল না। অন্যান্য দেশের সাথে আমাদের দেশের ভাবনাটা একটু আলাদা। আমরা কেবলমাত্র তথ্য প্রযুক্তির কথা বলছি না। কেবল মাত্র একটি ডিজিটাল রূপান্তরের কথা বলছি না। আমরা বৈষম্য দূর করার কথা বলছি, রাষ্ট্রের চরিত্র বদলানোর কথা বলছি। আমাদের সংবিধানে বর্ণিত জনগনের মৌলিক চাহিদা পূরণের কথা বলছি। জ্ঞান ভিত্তিক সমাজ সৃষ্টির উপযোগী জনগনের রাষ্ট্র বিনির্মাণের কথা বলছি।

চার. ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে সরকার ই-সেবার নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে চলেছে। জাতীয় ই-তথ্যকোষ থেকে দেখা যায়, সরকারি ই-সেবা এখন সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর, অধিদপ্তর, সংস্থা থেকে পরিচালিত হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় যেমন গ্ৰহন করেছে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রকল্প, তৈরি করেছে নিকস কনভার্টার; জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে চালু হয়েছে মোবাইলের মাধ্যমে গ্যাস বিল পেমেন্ট সিস্টেম ও নতুন গ্যাস সংযোগ আবেদনের ফরম। আবার অর্থ বিভাগ যেমন ই-প্রকিউরমেন্ট শুরু করেছে, তেমনি বাংলাদেশ ব্যাংক চালু করেছে অনলাইন সিআইবি সার্ভিসেস, ই-টেন্ডারিং সিস্টেম, অনলাইন রিক্রুটমেন্ট সিস্টেম, এলসি মনিটরিং সিস্টেম, অনলাইন ইনওয়ার্ডস রেমিটেন্স মনিটরিং সিস্টেম,অনলাইন ইনপোর্ট ম্যানেজমেন্ট সিষ্টেম প্রাইজবন্ড ম্যাচিংসহ আরো বিভিন্ন ধরনের ই-সেবা- (e-Services)। অন‍্যদিকে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড চালু করেছে অনলাইন ট্যাক্স পেমেন্ট সিস্টেম এবং রিটার্ন দাখিল, ট্যাক্স ক্যালকুলেটর, কাস্টমস হাউজ অটোমেশন; স্থানীয় সরকার বিভাগ গ্ৰহন করেছে অনলাইন বিল পেমেন্ট সিস্টেম (ওয়াসা),অনলাইন জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন সিস্টেম, আবার ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে, মোবাইল ব্যাংকিং, জীবন বীমা, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, ভিডিও কনফারেন্স, ইন্টারনেট ব্রাউজিং/ ই-মেইল, বিভিন্ন অনলাইন আবেদন, মোবাইল/ অনলাইনের মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য সেবা।

পাঁচ. ই-সেবার অংশ হিসেবে কৃষি মন্ত্রণালয় চালু করেছে অনলাইন সার সুপারিশ নির্দেশিকা, ই-বুক, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কৃষি তথ্য সেবা, অনলাইনে বিভিন্ন পণ্যের বাজার মূল্য যাচাই, ধান চাষ সম্পর্কিত ওয়েবসাইট। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় শুরু করেছে জয়েন্ট স্টক কোম্পানীর অনলাইন রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম, অনলাইন নেম ক্লিয়ারেন্স সিস্টেম, ৪ ঘন্টায় কোম্পানী রেজিস্ট্রেশন, অনলাইন রিটার্নস ফাইল। শিক্ষা মন্ত্রণালয় চালু করেছে শিক্ষা বোর্ডের অনলাইন সার্ভিস, অনলাইনে কল্যাণ ট্রাস্ট এর আবেদন-কল্যাণ ট্রাস্ট, অনলাইনে অবসর সুবিধা বোর্ডের আবেদন, TIF (Teacher’s Information Form), অনলাইন মার্কস সাবমিশন সিস্টেম-কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, অনলাইন রেজিষ্ট্রেশন (e-SIF)-সকল শিক্ষা বোর্ড, অনলাইন ফরম ফিলাপ, অনলাইন আবেদন(এমপিও, বিএড স্কেল, টাইম স্কেল অনলাইনে আবেদন), IMS (Institution Management System)-মাউশি অধিদপ্তর, ISAS(Institution Self Assesment Summary) -মাউশি অধিদপ্তর, Message Communication System-মাউশি অধিদপ্তর, অনলাইন ফরেন স্কলারশিপ, অনলাইন পাঠ্যপুস্তক, অনলাইন শিক্ষক নিবন্ধন সিস্টেম-এনটিআরসিএ, অনলাইন ও মোবাইলের মাধ্যমে অ্যাডমিশন সিস্টেম-বিশ্ববিদ্যালয়/কলেজ।

ছয়. ডিজিটাল সেবা দিতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় চালু করেছে অনলাইন ভিসা চেকিং আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিচ্ছে এমআরপি পাসপোর্ট অনলাইন আবেদন ব্যবস্থাপনা ও মোবাইল নোটিফিকেশনের সুযোগ। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে করা হচ্ছে হচ্ছে ই-টেন্ডারিং, মোবাইলের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সেবা প্রদান, মোবাইলের এসএমএস এর মাধ্যমে গর্ভবতী মহিলাদের সেবা প্রদান, ইউআইএসসি ও কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে টেলিমেডিসিন সার্ভিস, এসএমএস এর মাধ্যমে অভিযোগ-পরামর্শ গ্রহণ, মোবাইলের মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান, অনলাইনের মাধ্যমে মেডিকেল ও ডেন্টাল অ্যাডমিশন টেস্ট, স্বাস্থ্য সেবায় জিআইএস, হাসপাতাল অটোমেশন। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় চালু করেছে অনলাইন ট্রেড ইউনিয়ন রেজিস্ট্রেশন, অনলাইন ফ্যাক্টরী লাইসেন্স এন্ড রিনিউ, অনলাইন ইনকুয়েরী, অনলাইনে লেবার আপিল কোর্টের কেস স্ট্যাটাস। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় চালু করেছে সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ডাটাবেজ, অনলাইন ও মোবাইলের মাধ্যমে পরীক্ষার ফলাফল প্রাপ্তি, জিআইএস সিস্টেম, ডিজিটাল কনটেন্ট ভিত্তিক ভার্চুয়াল ক্লাসরুম, Non-Formal Education Management Information System। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে চালু হয়েছেপোস্টাল ক্যাশ কার্ড, থ্রিজি সুবিধা, এসএমএস এর মাধ্যমে বিল পেমেন্ট সিস্টেম। ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে চালু হয়েছে অনলাইন হজ্জ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, মোবাইলের হজ্জ যাত্রীদের তথ্য প্রদান, ডিজিটাল কোরআন, ডিজিটাল আর্কাইভ।

ছয়. আবার রেলওয়ে মন্ত্রণালয় চালু করেছে অনলাইন টিকেটিং সিস্টেম, মোবাইলের মাধ্যমে রেলওয়ের টিকেট ক্রয়ের সুযোগ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় চালু করেছে পরমাণু চিকিৎসা কেন্দ্রের অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট সিস্টেম, অনলাইন ডকুমেন্টস এন্ড রিসার্চ ইনফরমেশন সিস্টেম এবং প্রশিক্ষণ, সেমিনার/ কর্মশালা, থিসিস/ ফেলোশীপ ও নিয়োগ সংক্রান্ত আবেদন। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় শুরু করেছে Protecting and Maintaining Biodiversity using Geospatial (GPS & GIS) Technology (CEGIS), ডিজাস্টার অ্যালার্ট সিস্টেম, হাওড় ইনফরমেশন সিস্টেম, বাংলাদেশ জাতীয় যাদুঘরের জন্য অনলাইন আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম, Flood Forecasting and Warning System (বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড), Schemes Information Management Systems (SIMS) (বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড)। বিদ্যুৎ বিভাগ চালু করেছে অনলাইন বিল পেমেন্ট সিস্টেম, মোবাইলের মাধ্যমে বিল পেমেন্ট সিস্টেম, প্রি-পেইড মিটার, নতুন সংযোগের জন্য অনলাইন আবেদন। সড়ক বিভাগ নিয়ে এসেছে রেক্ট্রো-রিফ্লেক্টিভ নাম্বার প্লেট, আরএফআইডি ট্র্যাকিং সিস্টেম, স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স, টোল কালেকশন সিস্টেম,অনলাইন ফিনান্সিয়াল সিস্টেম, ই-টেন্ডারিং সিস্টেম, ই-টিকেটিং, পাঞ্চ কার্ড, আইসিটি রিডার সার্ভিস,অনলাইন মতামত, ডিজিটাল লাইব্রেরী, অনলাইন ট্যাক্স কালেকশনের মতো ই-সেবা। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় চালু করেছে জাতীয় আইসিটি ইন্টার্নশীপ প্রোগ্রামের জন্য অনলাইন আবেদন ব্যবস্থাপনা, আর দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় দিচ্ছে দূর্যোগের আগাম বার্তা মোবাইল ফোনে আইভিআর (Interactive Voice Response) প্রযুক্তির সাহায্যে প্রচার। (Early warning dissemination through mobile phone using IVR technology), সোসাইল প্রটেকশন ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিষ্টেম (Social Protection Management Information System), সাইক্লোন সেল্টার ইনফরমেশন সিষ্টেম (Cyclone Shelter Information System), ষ্টর্ম সার্জ ইনানডেশন ম্যাপ ( Storm Surge Inundation Map)। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ই-সেবা রং অংশ হিসেবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নকল/ পর্চার জন্য অনলাইনে আবেদন চালু হয়েছে। জন প্রশাসন মন্ত্রণলয় অনলাইনে বিসিএস পরীক্ষার আবেদন দাখিল (বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন) সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

সাত. ডিজিটাল বাংলাদেশের দ্বিতীয় ধাপে রয়েছে ই-কমার্স। আমাদের দেশে ই-কমার্সের সূচনা নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে যখন ইন্টারনেট জনসাধারণের হাতে পৌঁছে। এটি কয়েক প্রকার। দু’টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে (বি-টু-বি), বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে (বি-টু-জি), বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং ক্রেতার মাঝে (বি-টু-সি), এমনকি ক্রেতা এবং ক্রেতার মাঝেও (সি-টু-সি) এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক হতে পারে। বাংলাদেশে বি-টু-বি এর প্রচলন সবচেয়ে বেশি। এর কারন হচ্ছে আমাদের গার্মেন্টস সেক্টর। তৈরি পোশাক শিল্পের ক্রেতাগণ সাধারণত ইন্টারনেটের মাধ্যমেই বিক্রেতার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে এবং কোম্পানির ওয়েবসাইট থেকে স্যাম্পল সংগ্রহ করে থাকে। অনেক প্রতিবন্ধকতা সত্তেও আশার আলো হিসেবে ইন্টারনেটে কেনাকাটা বা প্রয়োজনীয় জিনিসের তথ্য খুঁজে বের করা এখন অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

আট. ই-কমার্সের ক্ষেত্রে আমরা এখন ইন্টারনেটের শরণাপন্ন হচ্ছি তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বিল পরিশোধ, হোটেল বুকিং, বিমানের টিকেট বুকিং, অনলাইন ব্যাংকিং, নতুন-পুরাতন দ্রব্যাদি ক্রয়-বিক্রয়, রিয়াল এস্টেট ব্যবসা, গাড়ি বা অন্যান্য যানবাহন ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদি। ঘরে বসেই মানুষ এখন বিভিন্ন সেবার যেমন: গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ, টেলিফোন ইত্যাদির বিল পরিশোধ করতে পারে। এগুলো সম্ভব হয়েছে মোবাইল ব্যংকিং এর কারনে। এছাড়া সম্প্রতি মোবাইল ব্যংকিং এর মাধ্যমে টাকা পাঠানো জনপ্রিয়তা লাভ করেছে সব শ্রেণী পেশার মানুষের কাছে। বিভিন্ন শপিংমলে এখন ইলেকট্রনিকালি বিল পরিশোধের ব্যবস্থা আছে। সুপারমার্কেটগুলোতে কার্ড পেমেন্টের ব্যবস্থা থাকায় ক্রেতারা অনেকটা নিশ্চিন্ত মনে বাজার করতে পারেন। উন্নত বিশ্বে মানুষ ঘরে বসেই তাদের নিত্য দিনের বাজার করছে অনায়াসে। ইবে, আমাজন ছাড়াও অনেক প্লাটফর্ম আছে যারা এই সুবিধা গুল প্রদান করে থাকে। আমাদের দেশে অনলাইনে কেনাবেচার জন্য বর্তমানে অনেক ওয়েবসাইট রয়েছে যেমন: বিপনি, ইবিপনন, আইফেরি, রকমারী, প্রিয়শপ, লামুদি, ক্লিকবিডি, এখনি, উপহারবিডি, কারমুদি, গিফটবিডি, সামগ্রি, বিডিহাট, ইত্যাদি। এই ওয়েবসাইটগুলো থেকে মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি বা উপহার সামগ্রী ঘরে বসেই ক্রয় করতে পারে।

নয়. ডিজিটাল বাংলাদেশের তৃতীয় ধাপে আছে শিক্ষায় কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের ব্যবহার। নতুন শিক্ষানীতির আওতায় মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষা বাধ্যতামূলক হয়েছে এবং সেই শিক্ষা বিনামূল্যে প্রদান করা হচ্ছে। শিক্ষার ন্যূনতম এই স্তরটিতে কোন বৈষম্য থাকছে না। স্কুল হোক, মাদরাসা হোক সবার জন্যই এক ধারার পাঠ্য বিষয় থাকছে। শহর-গ্রাম, ছোট-বড়, ধনী-গরীব সকলের জন্য নূন্যতম শিক্ষার একটাই ধারা প্রবাহমান থাকছে। প্রত্যন্ত গ্রামের শিক্ষার্থীর কাছেও কম্পিউটার এখন পরিচিত শব্দ। ইতোমধ্যে প্রায় ৫০০০০ স্কুলে ডিজিটাল ক্লাশরুম স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে । শিক্ষকদের মাল্টিমিডিয়া প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে ওয়াইফাই সংযোগ আছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থপনা হচ্ছে ইন্টারনেটে। ডিজিটাল পাঠাগার স্থাপন করা হয়েছে। সকল পাঠ্য পুস্তক ইন্টারনেটে বা ডিজিটাল ফরম্যাটে পাওয়া যাচ্ছে। এরই মাঝে অনেক বই, মুল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষক-শিক্ষিকা নির্দেশিকা ইত্যাদি ইন্টার একটিভ মাল্টিমিডিয়া সফটওয়্যরে পরিণত হয়েছে। শিক্ষকরা নিজেরা তৈরী করেছেন সফটওয়্যার। শিক্ষার্থীরা ডিজিটাল উপায়ে লেখাপড়া করার সুযোগ পাচ্ছে।

দশ. সরকারের ডিজিটাল তৎপরতার কারণেই বাংলাদেশ এখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের ও ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-স্বচ্ছল দেশে পরিণত হবে। ১৯৯২ সালে বিনামূল্যে সাবমেরিন কেবল স্থাপনের সুযোগ পেলেও তৎকালীন সরকার ‘বিদেশে তথ্য পাচার হয়ে যাবে’ অজুহাতে সেই সুযোগ কাজে লাগায়নি। অথচ আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিকতা ও বিচক্ষণতা এবং তার পুত্র তথ্য প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের সদিচ্ছার বদৌলতে প্রতিটি উপজেলায় অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল নেটওয়ার্ক স্থাপিত হয়েছে। আগামী ২০১৮ সালের মধ্যে তা উপজেলা থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে পৌঁছে দেয়া হবে। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে আন্তর্জাতিক মানের হাইটেক পার্ক নির্মাণ করা হচ্ছে। ২৫ হাজার সরকারি অফিসে প্রায় ৪৩ হাজার ওয়েবপোর্টাল চলছে সরকারি উদ্যোগেই, এটি পৃথিবীর কোন দেশে নেই বাংলাদেশ ছাড়া। দেশের ৬৪ জেলা ও ৪৯০টি উপজেলার ১৮ হাজার ১৩০টি অফিসে ভিডিও কনফারেন্সিং নেটওয়ার্ক চালু হয়েছে। এছাড়া ৪ হাজার ৭শ ইউনিয়ন ও কিছু পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন মিলে ৫ হাজার ৩শ স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শত শত ই-সেবার সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।

এগার. ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রাসঙ্গিক ভাবনায় জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের বিষয়টি আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিশ্ব যেভাবে এগিয়ে চলেছে, কোন সন্দেহ নেই, অচিরেই আমাদের চারপাশের সকল কিছু জ্ঞানভিত্তিক হবে। সভ্যতার চালিকাশক্তি হবে যে অর্থনীতি তা হবে জ্ঞানভিত্তিক। এসবের মূলে রয়েছে বিশ্বায়ন, তথ্য প্রযুক্তি, তথ্য, জ্ঞান, নিউমিডিয়া ও যোগাযোগ। বস্তুত পৃথিবী চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণ কর্মসূচির মাধ্যমে ২০২১ ও ২০৪১ সালের মধ্যে যে ভিশন বা স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে চলেছে তা এই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সাথে অত্যন্ত সংগতিপূর্ণ।

 

লেখক: প্রফেসর ড. এ কে এম রিয়াজুল হাসান,

অধ্যক্ষ, শেরপুর সরকারি কলেজ, শেরপুর।

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের

error: Alert: কপি হবেনা যে !!