ডাক্তারের দেয়া ওষুধ খেয়েই বুক জ্বালা অতঃপর মৃত্যু হয় ভাওয়াল রাজার!

মেজো কুমার রমেন্দ্রনারায়ণ ১৯০২ সালে বিয়ে করেন অপূর্ব সুন্দরী বিভাবতীকে। যদিও বিয়ের পর থেকেই ভাওয়াল রাজবাড়িতে রানী হিসেবে তিনি বিলাসবহুল জীবযাপন করছিলেন। তবুও বিভাবতী তেমন সুখী ছিলেন না। মেজো কুমারের উল্লেখযোগ্য কোনো গুণাবলিই ছিল না। তিনি শিকারে যেতেন, টমটম হাঁকাতেন। চেহারা রাজাদের মতো হলে কী হবে, চালচলন, পোশাক-আশাকে তাকে রাজপরিবারের সদস্য বলে মনে হতো না।

অন্য দুই কুমারের মতো বেহায়াপনার সঙ্গে বাড়তি যা বলার ছিল তা হলো মেজো কুমার কুৎসিত ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিলেন। এমনিতে রমেন্দ্র নারায়ণ মানুষ খারাপ ছিলেন না, প্রজাবৎসলও ছিলেন। তবে দু’টো বাজে স্বভাব ছিল তার, পানের নেশা আর নারীর নেশা। শিকারের ভীষণ শখ ছিল তার। বিভাবতীর মত অনিন্দ্যসুন্দরীও  তাকে মদ আর নারীসঙ্গ থেকে দূরে রাখতে পারেনি।

যা হবার তাই হলো একটা সময়ে, সিফিলিসে আক্রান্ত হলেন রমেন্দ্র নারায়ণ। স্ত্রীর সঙ্গে দূরত্ব আগে থেকেই ছিল তার। শোনা যায় বিভাবতীও নাকি স্বামীর আচরণে বিরক্ত হয়ে বহুগমনের পথ বেছে নিয়েছিলেন। রমেন্দ্র নারায়ণের ব্যক্তিগত চিকিৎসক আশুতোষ দাসগুপ্তের সঙ্গে রানী বিভাবতীর প্রণয় ছিল বলেও দাবি করেন কোনো কোনো ইতিহাসবিদ।

১৯০৭ সালে রাজমাতা রানী বিলাসমণির মৃত্যু হলে ভাওয়াল রাজপরিবারে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের বীজ বপন হয়। মেজো কুমারের রোগ দেহে বাড়তে থাকলে সবাই বুঝতে পারেন ঢাকার চিকিৎসকেরা রোগের নিদান দিতে পারছেন না। এজন শিগগিরই কলকাতায় যাওয়া চাই। রাজমাতার মৃত্যুর পর পরই ১৯০৮ সালে রানী বিভাবতীর ভাই সত্যেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ভাওয়াল রাজবাড়িতে প্রবেশ করেন। সত্যেন্দ্র রাজবাড়িতে এসেছিলেন শিলং এ ডেপুটির চাকরি নেবেন বলে। 

কিন্তু জমিদারি পরিচালনায় কুমারদের দুর্বলতা দেখে জেঁকে বসেন রাজবাড়িতে। রাজবাড়িতে রানী বিভাবতীর চেয়ে বেশি প্রতাপে চলতেন তিনি। মেজো কুমারকে কলকাতায় চিকিৎসা করানোর জন্য যারা সঙ্গে গিয়েছিলেন তাদের মাঝে সত্যেন্দ্রনাথ ছিলেন। ১৯০৯ সালের এপ্রিলে রমেন্দ্র নারায়ণের শরীর ভেঙে পড়লো ভীষণ। ব্যক্তিগত চিকিৎসক আশুতোষ দাসগুপ্ত তাকে পরামর্শ দিলেন দার্জিলিং এ গিয়ে হাওয়া বদল করে আসতে। তাতে যদি কিছু হয়। সেখানে বনে বাদাড়ে শিকারও করা যাবে, এরকম লোভ দেখানো হয়েছিল রমেন্দ্র নারায়ণকে।

দলবল নিয়ে দার্জিলিং যাত্রা করলেন ভাওয়াল এস্টেটের মেজো কুমার রমেন্দ্র নারায়ণ। সঙ্গে আরও ছিলেন রানী বিভাবতী, তার ভাই সত্যেন্দ্রনাথ, চিকিৎসক আশুতোষ দাসগুপ্তসহ আরও প্রায় বিশজন। যাত্রা শুরুর দুইদিন পর দার্জিলিঙে পৌঁছালেন তারা। দার্জিলিঙে গিয়ে শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলো রমেন্দ্র নারায়ণের। সেখান থেকে প্রতিদিন ভাওয়াল এস্টেটের জমিদার বাড়িতে মেজো কুমারের শারীরিক অবস্থার কথা জানিয়ে টেলিগ্রাম পাঠানো হতো।

প্রথম টেলিগ্রামে তার ৯৯ ডিগ্রি জ্বর, পরের টেলিগ্রামে জ্বর বৃদ্ধি, পেটে যন্ত্রণা, দার্জিলিং সিভিল সার্জন দেখে গেছেন ইত্যাদি খবর আসতে থাকে। মে মাসের ৫ তারিখের দিকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। মেজো কুমার রমেন্দ্রনারায়ণ অসুস্থ হয়ে পড়লে আশু ডাক্তার তাকে পেট ফাঁপার ওষুধ দিয়েছিলেন। তবে ৬ মে ১৯০৯ সালে রাত ৩টার দিকে মেজো কুমার আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। মেজো কুমারের অবস্থা দেখে আশু ডাক্তার সে রাতে আর ওষুধ দেননি বরং পর দিন সিভিল সার্জনের কাছে আরও ভালো চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করেন। স্ত্রী বিভাবতী যথাসম্ভব স্বামীর কাছে থাকতে চাইলেও তার ভাই সত্যেন্দ্র চিকিৎসকদের পরামর্শ মতো মেজো কুমারকে আলাদা ঘরে রাখেন।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।