You dont have javascript enabled! Please download Google Chrome!

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু স্মরণে

তালাত মাহমুদ: বিশ্ব-বিশ্রুত বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতা, প্রচন্ড সাংগঠনিক কর্ম-ক্ষমতা, অনন্য সাধারণ নেতৃত্ব ও অবিমিশ্র নীরব কর্তব্য পালন এবং তাঁদের আত্মত্যাগের মহিমায় যেসব জাতি ও দেশ বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীনতা লাভ করেছে তাদের মাঝে বাঙ্গালি জাতি ও স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ অন্যতম। আর স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তুলনাহীন বিশ্ববরেণ্য এক মহান নেতা। অগণিত শহীদের বুকের তাজা রক্ত আর দু’লাখ মা-বোনের পবিত্র ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’Ñ ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক জনসভায় এমন বজ্র হুঙ্কারে যিনি চারদিক প্রকম্পিত করে তুললেন, মুক্তি-পাগল বাঙালির ধমণীতে স্বাধীনতার মন্ত্রণা দিয়ে যিনি গোটা জাতিকে আবেগে উজ্জীবিত করে তুলেছিলেনÑ তিনিই স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি পাকিস্তান সরকারের হাতে বন্দী ছিলেন আর করাচীর মিয়াওয়ালী কারাগারে মৃত্যুর প্রহর গুণছিলেন।

দেশ স্বাধীন হবার পর আন্তর্জাতিক মহলের চাপের মুখে পাকিস্তানের পরাজিত স্বৈরাচারী সরকার বঙ্গবন্ধুকে ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ৮ জানুয়ারি মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করে প্রথমে বিমানযোগে ল-ন যান। সেখান থেকে ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১০ জানুয়ারি তিনি ভারতের নয়াদিল্লী হয়ে সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার তেজগাঁও (কুর্মিটোলা) বিমান বন্দরে অবতরণ করেন। এদিন তিনি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দিবেন। দেশব্যাপী এমন খবর প্রচারিত হলে বঙ্গবন্ধুকে দেখার জন্য সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত বাংলাদেশের সকল মানুষের মাঝে দারুণ উত্তেজণা বিরাজ করতে থাকে। জাতির অবিসংবাদিত নেতাকে এক নজর দেখার জন্য সারাদেশ থেকে লাখ লাখ মুজিব পাগল আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা রাজধানী ঢাকা অভিমুখে যাত্রা করে। ‘বঙ্গবন্ধু’ বলতে বাংলাদেশের মানুষ তখন অন্ধ।

বঙ্গবন্ধুকে দেখার জন্য ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ৯ জানুয়ারি আমার জ্যেঠাতো ভাই কলেজ ছাত্র আব্দুর রহমান (বড় খোকা) ও আব্দুর রহিম (ছোট খোকা) এই দুই জমজ ভাইয়ের সাথে গ্রামের বাড়ি (চন্দ্রকোণা, সরকারবাড়ি, থানা- নকলা, জেলা- ময়মনসিংহ) থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করি। আমি তখন স্কুলের ছাত্র। বাইরের জগত সম্পর্কে কিছু জানিনা, বুঝিও না। দুই ভাইয়ের সাথে জীবনে প্রথম ঢাকায় যাচ্ছি। বিকেলে জামালপুর রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে পৌঁছলাম। স্টেশনে হাজারও জনতার ভীড়। ট্রেন আসার কোন খবর নেই। রাত ১০টায় কয়লার ইঞ্জিন চালিত একটি ট্রেন ময়মনসিংহ থেকে জামালপুর রেলওয়ে স্টেশনে এসে পৌঁছায়। ট্রেনটির জগন্নাথগঞ্জ ঘাট অথবা বাহাদুরাবাদ ঘাট যাওয়ার কথা। কিন্তু স্টেশনে অবস্থানরত হাজারও জনতার চাপের মুখে জামালপুর স্টেশন থেকে ট্রেনটিকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যেতে চালককে বাধ্য করা হয়। প্রচন্ড ভীড় আর যাত্রীদের ভীড়ের মাঝে অনেক কষ্টে ট্রেনে উঠে পড়লাম। ট্রেনে কোন সীট খালি ছিলো না। ফাঁকা জায়গাগুলোতেও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। আমি দরজার কাছে ঠাসাঠাসি করে কোনমতে ঠাঁয় দাঁড়িয়েছিলাম।

ট্রেনটি জামালপুর থেকে ঢাকা অভিমুখে যাত্রা শুরু করে রাত ১১টায়। সারারাতের বিরামহীন ট্রেন যাত্রায় সব যাত্রীই নিদ্রাহীন। ট্রেনটি সকাল ৭/৮টার দিকে তেজগাঁও স্টেশনে এসে পৌঁছে। ট্রেনের সব যাত্রী একে একে নেমে যান। তারপর তারা দলে দলে রেসকোর্স ময়দানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। আমি সারারাতের বিনিদ্র অবসাদ, ক্লান্তি আর স্থবিরতার যাতনায় একেবারে নতজানু। তবু আমরা বঙ্গবন্ধুকে এক নজর দেখার জন্য রেসকোর্স ময়দানের দিকে ছুটে চলেছি। তেজগাঁও থেকে ফার্মগেট-কাওরান বাজার-বাংলা মটর হয়ে বিরতিহীন পদযাত্রায় শাহবাগ পর্যন্ত এসে আমাদের থমকে দাঁড়াতে হলো। চারদিক লোকে লোকারণ্য। বঙ্গবন্ধুর জনসভা স্থলে যাওয়ার কোনই সুযোগ নেই।

আমি এমনিতেই হালকা-পাতলা গড়নের ছেলে। তার মাঝে আবার গতকাল (৯ জানুয়ারি, ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দ) সারাদিন হাঁটা-খাটা-ক্ষুধা আর সারারাত নিদ্রাহীন ট্রেনযাত্রায় আজ (১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দ) সকালে নিজেকে খুবই ক্লান্ত ও দুর্বল মনে হচ্ছিলো। এতটা বেলা হয়ে গেছে নাস্তা পর্যন্ত করা হয়নি। আমরা শাহবাগ পিজি হাসপাতালের সামনে এসে দাঁড়ালাম। বঙ্গবন্ধুকে বুঝি আর দেখা হলো না! কতক্ষণ সেখানে ছিলাম মনে নেই। আমরা বাড়ি থেকে আটার রুটি আর গুড় নিয়ে গিয়েছিলাম। সেগুলো খেতেও ভুলে গেছি। লোক সমাগম কমার পর আমরা তিন ভাই নারায়ণগঞ্জে এক আত্মীয়ের বাসায় চলে যাই। সেখানে তিনদিন থাকার পর বাড়িতে ফিরে আসি।

১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাস। ভয়াবহ বন্যার পানিতে ভাসছে বাংলাদেশ। ভাসছে তৎকালের ময়মনসিংহ জেলার জামালপুর মহকুমার প্রতিটি থানা, ইউনিয়ন ও গ্রাম। বন্যার্ত মানুষের আহাজারীতে বাতাস ভারী! বানভাসী মানুষের আশ্রয় নেয়ার জায়গারও বড় অভাব। আমি তখন দেওয়ানগঞ্জ এ কে মেমোরিয়াল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। সাবেক এমএনএ ডাঃ রফিক উদ্দিন আহমেদের কণিষ্ঠ ভ্রাতা ও এরশাদ সরকারের আমলে শেরপুর ও জামালপুর জেলার সংরক্ষিত আসনের মহিলা এমপি জলি রহমানের ছোট দেবর প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা বদিয়র রহমান তালুকদার আমার বড় ভগ্নিপতি। আমার বড় ভগ্নিপতির বাসায় থেকেই আমি লেখাপড়া করছিলাম। আমি তখন মুক্তিযুদ্ধের মূখপত্র ‘সাপ্তাহিক দেশবাংলা’র (পরবর্তীকালে দৈনিক) দেওয়ানগঞ্জ থানা প্রতিনিধি এবং দেওয়ানগঞ্জ থেকে প্রকাশিত ‘সাহিত্য দর্পণ’ নামে একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকার আমি সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলাম। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দেওয়ানগঞ্জে অবস্থানকালীন সময়ে আমি পত্রিকাটি সম্পাদনা ও প্রকাশ করি। পরবর্তীতে ‘সাহিত্য দর্পণ’ জামালপুর জেলা শহর থেকে বের করি ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে দেওয়ানগঞ্জে প্রতিষ্ঠা করি ‘বর্ণসিন্ধু সাহিত্য পরিষদ’। আমি সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। সভাপতি ছিলেন প্রভাষক মো: সিরাজুল ইসলাম। সহ-সভাপতি ছিলেন প্রভাষক আব্দুল গণী, এডভোকেট আব্দুর রাজ্জাক ও মো: ইনছান আলী। সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন সাংবাদিক আব্দুর রাজ্জাক রাজু । পরবর্তীতে ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে খো.আ.ন.ম শফিকুল আলম (বর্তমানে পীর সাহেব ও সহকারী অধ্যাপক, ইসলামপুর কলেজ), নূর হোসেন খান বাবুল ব্যানার্জী (পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতা এবং ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় স্মৃতি সৌধে যাওয়ার পথে সাভারে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত!), খাজা আলম (বর্তমানে এডভোকেট), রেবেকা সুলতানা, সন্ধ্যারাণী ঘোষ (বর্তমানে শিক্ষিকা), লিলি আখতার (ল-ন প্রবাসী), হোসনে আরা (বর্তমানে কর্মকর্তা) সহ পূর্বাপর আরও অনেকে ‘বর্ণসিন্ধু সাহিত্য পরিষদ’-এর সাথে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে দেওয়ানগঞ্জে আওয়ামী লীগের এমপি ছিলেন মোঃ দেলোয়ার হোসেন।

বন্যা কবলিত দেওয়ানগঞ্জের দুর্গত এলাকা ও ত্রাণ শিবির গুলোতে বন্যাপীড়িত অসহায় মানুষের করুণ অবস্থা স্বচোখে দেখার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে হেলিকপ্টার যোগে দেওয়ানগঞ্জে আসেন। দেওয়ানগঞ্জ কো-অপারেটিভ হাইস্কুলের ত্রাণ শিবির পরিদর্শন ও সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে তিনি ভাষণ দিবেন। দেওয়ানগঞ্জ এ কে মেমোরিয়াল কলেজ মাঠে হেলিকপ্টারটি অবতরণ করে। সেখান থেকে বঙ্গবন্ধুকে বহন করে নিয়ে আসা জীপটি কো-অপারেটিভ হাইস্কুলের তোরণ অতিক্রম করে ভিতরে প্রবেশ করার পর হঠাৎ থেমে যায়। বঙ্গবন্ধু হাত নাড়িয়ে সমবেত জনতাকে শুভেচ্ছা জানান। সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে আমি বঙ্গবন্ধুকে দেখছিলাম। উজ্জ্বল গৌরবর্ণের মায়াভরা ও আকর্ষণীয় চেহারার অনন্য ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন এক মহান পুরুষ। তাঁর মুখাবয়ব থেকে যেন অভুতপূর্ব আলোকচ্ছটা বেরিয়ে আসছিলো।

মাত্র দেড় থেকে দুই মিনিট অবস্থান করার পর বঙ্গবন্ধুকে বহন করে নিয়ে আসা খোলা জীপটি কো-অপারেটিভ হাইস্কুলের প্রবেশ দ্বারের ভিতর থেকেই কলেজ মাঠে ফিরে যায়। বঙ্গবন্ধু হেলিকপ্টার যোগে ঢাকায় চলে যান। পরে জেনেছি, নিরাপত্তা বলয় দুর্বল ছিলো এবং গোয়েন্দা রিপোর্ট অনূকুলে না থাকায় বঙ্গবন্ধুর কর্মসূচী স্থগিত করা হয়। সেদিন বঙ্গবন্ধু আর্ত-পীড়িত মানুষের দুঃখ দুর্দশা স্বচোখে দেখে যেতে পারেন’নি। দেখে যেতে পারেন’নিÑ অর্ধাহারে অনাহারে থেকে আর অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে রোগে ভোগে কঙ্কালসার মানুষগুলো কীভাবে বেঁচেছিলো! তাছাড়া দেওয়ানগঞ্জ কো-অপারেটিভ হাইস্কুল মাঠে সমবেত হাজারও জনতার উদ্দেশ্যে ভাষণও দিতে পারেন’নি। তবে বঙ্গবন্ধু হেলিকপ্টারের জানালা দিয়ে সর্বনাশা বন্যার করালগ্রাসী রূপ দেখে গেছেন। বন্যার পানিতে নিমজ্জিত জন-মানবহীন গ্রামের পর গ্রাম দেখে গেছেন।

বঙ্গবন্ধুকে কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিলো আমার। তিনি সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে হাত নাড়িয়েছেন, শুভেচ্ছা জানিয়েছেন আর স্বভাব সুলভ হাসি উপহার দিয়েছেন। খোলা জীপে দাঁড়িয়ে সফেদ পাঞ্জাবী আর মুজিব কোট পরিহিত বঙ্গবন্ধু দেওয়ানগঞ্জবাসীর মাঝে উপস্থিত হয়েও অনিশ্চিত নিরাপত্তার কারণে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে কোন কথা না বলে তিনি নিঃশব্দে ফিরে গেছেন। ভয়াবহ বন্যার ক্রান্তিকালে বানভাসী মানুষের পাশে ছুটে আসা বঙ্গবন্ধুর দেওয়ানগঞ্জে উপস্থিতির মূহুর্তগুলো আমার স্মৃতিপটে আজও জীবন্ত হয়ে আছে। বঙ্গবন্ধুর সফর সঙ্গীদের মধ্যে ইসলামপুরের তৎকালীন এম.পি রাশেদ মোশাররফ এবং সাংবাদিক হিসেবে বাসস’র স্টাফ রিপোর্টার হারুন হাবিব ছিলেন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, সে সময় (১৯৭৪ খ্রিঃ) ত্রাণ শিবিরগুলোতে অনাহারে-অর্ধহারে মারা যাওয়া মানুষের লাশ সৎকারের জন্য আমরা ‘বেওয়ারীশ লাশ সৎকার সমিতি’ গঠন করেছিলাম। বিভিন্ন দানশীল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ সংগ্রহ করে সে সব লাশের সৎকার করেছিলাম। সর্বত্র বন্যার পানি থাকায় যানাজা শেষে মৃত ব্যক্তির কাফনাবৃত লাশ ব্রহ্মপুত্র নদে ভাসিয়ে দিতাম। ‘বেওয়ারীশ লাশ সৎকার সমিতি’র সভাপতি ছিলেন দেওয়ানগঞ্জ কো-অপারেটিভ হাইস্কুলের তৎকালীন সহকারী শিক্ষক আবুল হাসেম বিএসসি, আর আমি (এই নিবন্ধের লেখক) ছিলাম সাধারণ সম্পাদক। একজন ছাত্রনেতা হিসেবেও আমি সংগঠনের অন্যান্য নেতাকর্মীদের স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত করেছিলাম।

১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন শত কষ্ট করে ঢাকায় গিয়েও আমরা বাংলার অবিসংবাদিত নেতাকে এক নজর দেখতে পারি’নি। অথচ ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে (সঠিক তারিখ জানা নেই) বন্যা কবলিত দেওয়ানগঞ্জের আর্ত-পীড়িত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা স্বচোখে দেখতে আসা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কাছে থেকে এত সহজে দেখতে পাবোÑ তা কখনো কল্পনা করি’নি।

দেওয়ানগঞ্জের সে সময়কার বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য গণ্যমান্য ব্যক্তিত্বের মুখচ্ছবি আজও আমার চোখের সামনে ভেসে উঠে। যেমন- ডাক্তার রফিক উদ্দিন আহম্মেদ এমএনএ, আলহাজ্ব মোঃ আব্দুস সামাদ এমএনএ, মোঃ নঈম উদ্দিন আহম্মেদ (নঈম মিয়া) এমপি, অধ্যক্ষ মাওঃ মোঃ আব্দুল কদ্দুস, প্রধান শিক্ষক মোঃ আব্দুল লতিফ, শিক্ষক ফিরোজ চৌধুরী, শিক্ষক জগবন্ধু সাহা, ব্যারিষ্টার মইনুল হক (ছোট খোকন) (পরবর্তীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন), মমতাজ বেগম বিদ্যুৎ (পরবর্তীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন), আব্দুস সামাদ মার্চেন্ট, আব্দুল লতিফ মার্চেন্ট, ভদ্র, সজ্জন ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এককালের তুখোর ছাত্রনেতা এডভোকেট আব্দুর রাজ্জাক এমএসসি (প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নির্মম শিকার হয়ে নিহত), বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী নাছিরউদ্দিন (কোম্পানী কমা-ার), প্রভাষক (পরবর্তীতে অধ্যক্ষ) বাবু নারায়ণ চন্দ্র সাহা, প্রভাষক (পরবর্তীতে উপাধ্যক্ষ) মোঃ সিরাজুল ইসলাম, আওয়ামী লীগ নেতা মোঃ বদিয়র রহমান তালুকদার, ন্যাপ নেতা কামাল চৌধুরী, শিক্ষক ইনসান আলী, পরবর্তীতে ইউপি চেয়ারম্যান মেজবাহ্উল হক (বড় খোকন), সাখাওয়াত হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা মাহাবুবুর রশিদ খুররম, মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদ, তুখোর ছাত্রনেতা ফজলুর রহমান ফজলু (রক্ষী বাহিনীর নির্মম নির্যাতনে নিহত), ছাত্রনেতা আব্দুর রউফ তালুকদার (পরবর্তীতে বকশীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের পর পর দুই বারের উপজেলা চেয়ারম্যান), দেওয়ানগঞ্জ থানা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি আমজাদ আলী, শওকতুল হায়দার খসরু, ছাত্রনেতা আব্দুর রাজ্জাক রাজু (পরবর্তীতে সাংবাদিক), সংগীত শিল্পী আলতাফ হোসেন, ছাত্রনেতা হেলাল উদ্দিন, চন্দ্রমোহন দাস (বাম রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন), মোঃ আব্দুর রশিদ দুলা (প্রথমে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও পরে দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন), এম, রশিদুজ্জামান মিল্লাত ((তখন কিশোর। পরবর্তীতে জামালপুর জেলা বিএনপি’র সভাপতি ও দেওয়ানগঞ্জ-বকশীগঞ্জের এমপি নির্বাচিত হন।), আলহাজ্ব ইস্তিয়াক হোসেন দিদার (বর্তমানে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান), রাজনীতিক আব্দুস সাত্তার সুলতান, পীর সাহেব খো.আ.ন.ম শফিকুল আলম (সহকারী অধ্যাপক), মোঃ বেদার হোসেন, বিএনপি নেতা শ্যামল চন্দ, লেবু তালুকদার, মুজাহিদুল ইসলাম আঞ্জু (পরবর্তীতে কলেজ শিক্ষক), বাদল তালুকদার, সুকুমার সাহা, খাজা আলম (বর্তমানে আইনজীবী), রফিকুল ইসলাম বাচ্চু (বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেতা), কণ্ঠশিল্পী রেজাউল করিম এলান (বর্তমানে সাংবাদিক), মোঃ খাদেমুল ইসলাম ((তখন কিশোর। বর্তমানে সাংবাদিক ও কলামিস্ট)। এছাড়া শিক্ষিকা তাহেরা বেগম র‌্যালি (পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষিকা), আওয়ামী লীগ নেত্রী মততাজ রহমান, সমাজ সেবিকা ফেরদৌসী বেগম সহ আরো অনেক চেনা মুখ আজ চোখের সামনে আনাগোনা করছে। মনে হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর দেওয়ানগঞ্জে আগমন উপলক্ষে এইসব চেনামুখের মানুষগুলো সেদিন কো-অপারেটিভ হাইস্কুল মাঠে সমাবেত হয়েছিলেন। আমি তাদের শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতার সাথে স্মরণ করছি। তাদের মধ্যে অনেকের আদর স্নেহ ও অনুপ্রেরণায় আজ আমি একজন কলমযোদ্ধা হতে পেরেছি। তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়ানগঞ্জ সফরের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে সেইসব কৃতি সন্তানদের মুখচ্ছবি আমার চোখের সামনে ভেসে উঠায় এবং সেই দিনগুলোতে তাদের সান্নিধ্যে থাকায় সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

সেই সাথে জামালপুরের প্রথম জেলা প্রশাসক মোঃ নুরুল ইসলাম এবং ‘দেওয়ানগঞ্জ জিলবাংলা চিনিকলের পিআর কমিটি’র তৎকালীন সম্পাদক ও ইসলামপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুস সামাদ খন্দকার বিএসসি’কে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। কারণ ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে বিচারক ম-লীর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে তাঁরা আমাকে সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় ‘জিলবাংলা সাহিত্য পুরস্কার’-এ ভূষিত করেছিলেন।

‘মুজিবুর রহমান নামের গুরুত্ব’ : আল্লাহ পাকের ৯৯টি অতিউত্তম নামের মাঝে ‘ইয়া মুজিবু’ একটি নাম। যার অর্থ- হে প্রার্থনা গ্রহণকারী। কোন দোয়া করার আগে এই নাম পড়ে নিলে দোয়া সহজে কবুল হয়। আরেকটি নাম হচ্ছে- ‘ইয়া রাহমানু’। যার অর্থ- হে অতীব অনুগ্রহকারী। বিসমিল্লাহ সহযোগে আল্লাহ তায়ালার এই পবিত্র নামটি জগতে সর্ব প্রথম প্রচারিত হয়। (তফসীরে কাশ্শাফ) প্রত্যেক নামাযের পর এই নাম ১০০ বার পড়লে মনের অলসতা, গ্লাণী ও ভ্রম দূর হয়। মাকরুহ কাজ থেকে বিরত থাকা যায়। (তথ্য সূত্রঃ সিরাতুল জান্নাত ও প্রাত্যাহিক জীবনে ইসলাম)।

নবজাত শিশুর জন্য মা-বাবার একটি বিশেষ কর্তব্য হলো-জন্মের ৭ দিনের মধ্যে নবজাতকের একটি শ্রুতিমধুর ও অর্থবোধক নাম রাখা। মুসলমান মা-বাবার কাছে ইসলামী নাম সবচেয়ে পছন্দের। তন্মধ্যে আল্লাহ পাকের ৯৯টি নাম থেকে অনেক মা-বাবা তাদের সন্তানের জন্য এক বা একাধিক নাম নির্বাচন করে থাকেন। আল্লাহ পাকের অধিকাংশ গুণবাচক নাম মানুষের নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আবার কোন কোন ব্যক্তি বা মানুষের নামে আল্লাহ পাকের একাধিক নামেরও সংযোগ রয়েছে। যেমন- ‘মুজিবুর রহমান’। এ ক্ষেত্রে ‘ইয়া মুজীবু’ (হে প্রার্থনা গ্রহণকারী) এবং ‘ইয়া রাহমানু’ (হে অতীব অনুগ্রহকারী) আল্লাহ পাকের এই দুটি গুণ বাচক অতিউত্তম নাম সংযুক্ত হয়ে ‘মুজিবুর রহমান’ হয়েছে। আবার এই নামের সাথে বংশের নাম (শেখ) যুক্ত হয়ে ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ নামটি বিশ্ববিশ্রুত হয়েছে।

শেখ মুজিবুর রহমান হলেন- হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি। তিনি জাতির জনক। তিনি বঙ্গবন্ধু এবং তিনিই বাংলার মুকুটহীন সম্রাট। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট একদল জিঘাংসা পরায়ন বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে আক্রমণ চালিয়ে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের প্রায় সকল সদস্যকে নির্বিবাদে হত্যা করেন। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশের বাইরে অবস্থান করায় ভাগ্যক্রমে ঘাতকদের হাত থেকে তাঁরা প্রাণে বেঁচে যান।

বাংলাদেশের তিনবারের প্রধান মন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সরকার গঠন করে দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নেয়ার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন এবং ২০২১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার সংকল্প ব্যক্ত করছেন। ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

শেষ কথা ; সুনির্দিষ্ট কর্মসূচী, বলিষ্ঠ নেতৃত্ব আর ঘুষ-দুর্নীতি মুক্ত সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জন-গণতন্ত্র কায়েমে উদ্যোগী হলে দেশের মানুষের ভাগ্যের দ্রুত পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব। লাগাম ছাড়া ঘোড়াকে নিয়ন্ত্রনে রাখা যায়না। লাগাম ছাড়া ঘোড়া মনিবেরও কাল হয়। এই লাগাম ছাড়া ঘোড়াগুলোই একদিন বঙ্গবন্ধুর কাল হয়েছিলো।

লেখক ; কবি সাহিত্যিক সাংবাদিক কলামিস্ট ও দৈনিক ঢাকা রিপোর্টের প্রধান সহকারী সম্পাদক এবং জাতীয় লেখক কবি শিল্পী সংগঠন-লেকশি ও কবি সংঘ বাংলাদেশ-এর সভাপতি।

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের

error: Alert: কপি হবেনা যে !!