জলবায়ু পরিবর্তনে প্লাস্টিক

জলবায়ু পরিবর্তনে প্লাস্টিক
– নাওয়ার সালসাবিল দুর্দানা

পৃথিবী আর মানবসভ্যতার বয়স দিনকে দিন যত বাড়ছে, আমরা ততই কিছু অমীমাংসিত সমস্যার সম্মুখীন হয়ে চলছি, যার সমাধান বের করতে গিয়ে প্রায়শই আমাদেরকে অনেক জটিলতার বাঁধা পেরোতে হচ্ছে। আর সেই প্রধান সমস্যা, যা কি না আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্নে হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে, সেটা হলো “জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা”।জলবায়ু পরিবর্তনের একাধিক কারণ আমাদের সামনে দন্ডায়মান। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়- এসব যতটা না প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট তার থেকেও বেশি মানবসৃষ্ট। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্লাস্টিক দূষণ। বিপুল আলোচিত একটি বিষয়।
অনেকে এখনো এই বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না।

প্লাস্টিক দূষণ কত টা ভয়ংকর হতে পারে তার সামান্য ধারণা দিচ্ছি।১৯৫০ সালেই পুরো পৃথিবীতে প্লাস্টিকের উৎপাদন ছিল মাত্র ২ দশমিক ২ টন৷ ৬৫ বছর পর, ২০১৫ সালে সে পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৪৮ মিলিয়ন টনে৷২০১০ সালের ১৯ এপ্রিল The seattles Time (দ্যা সিটলস টাইম) নামক দৈনিকে একটি খবর খুব সাড়া দেয়। সীটল সমুদ্র সৈকতে মৃত পড়ে থাকতে দেখা যায় একটি বিশাল তিমিকে। পরে যখন সেই তিমির মৃত্যুর কারণ নিয়ে গবেষণা করা হয়, তখন দেখা যায় তিমির পাকস্থলীতে পাওয়া গিয়েছে বহু প্লাস্টিক পদার্থ। সেসব প্লাস্টিককেই সেই তিমির মৃত্যুর কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়।জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে একটি ভয়াবহ তথ্য তুলে ধরা হয়, যেখানে বলা হয়- প্রতি বছর প্রায় ৮০০ প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণী সমুদ্রযানের বর্জ্য পদার্থ দিয়ে আক্রান্ত হয়, আর এসবের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই হচ্ছে প্লাস্টিক জাতীয় বর্জ্য, যা নিতান্তই আমাদের দায়বদ্ধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।

এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, প্রায় অর্ধেক সামুদ্রিক কচ্ছপ প্রতিবছর প্লাস্টিক জাতীয় পদার্থ গলাধঃকরণ করছে, যে কারণে এদের অনেকেই মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, প্লাস্টিকদ্রব্য তাদের প্রজননেও বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফলশ্রুতিতে এই সামুদ্রিক কচ্ছপগুলোর অস্তিত্বই হুমকিই ভেতরে পড়ে যাচ্ছে।জাপানের ইওসুকায় অবস্থিত Japan Agency for Marine-Earth Science and Technology (JAMSTEC) এর একটি আবিষ্কারে, যা এই বছরের ৬ এপ্রিল মেরিন পলিসি জার্নালে প্রকাশিত হয়। সেখানে উঠে এসেছে পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর মহাসাগরীয় খাঁদ মেরিয়ানা ট্রেঞ্চের ১০,৮৯৮ মিটার (৩৫,৭৫৫ ফুট, বা ৬.৭ মেইল) তলদেশেও প্লাস্টিক ব্যাগ রয়েছে!গ্রেট পেসিফিক গারবেজ প্যাচ (GPGP) বা জিপিজিপি নিয়ে বেশ কিছু কথা বলার আছে। এখন সেটাই শুরু করছি। এটা হল প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে অবস্থিত একটি বিশালাকার প্যাচ, যার আয়তন ১৬ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার (প্রায় তিনটি ফ্রান্সের সমান)। এটা নিয়ে খারাপ সংবাদটি হচ্ছে, এর আকার আগে যা ভাবা হয়েছিল এটা তার থেকেও চার গুণ বিশাল, আর এর আকার জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জিপিজিপি নিয়ে টানা তিন বছরের সারভে করে গবেষকগণ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, আর এর রেজাল্ট প্রকাশিত হয় নেচার সাময়িকীতে এই বছরের ২২ মার্চে। গবেষকরা আবিষ্কার করেন যে, এই অঞ্চলে প্রায় ১.৮ ট্রিলিয়ন প্লাস্টিকের অংশ রয়েছে, যার ভর হবে প্রায় ৮০ হাজার টন! আর এটাই সেই ১৬ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার স্থান অধিকার করে আছে। আগে যে পরিমাণ প্লাস্টিক এখানে ভেসে এসে জমা হয় বলে তারা মনে করতেন, এর পরিমাণ তার চেয়ে অনেক বেশি। ফেলে দেয়া ফিশিং নেট থেকে শুরু করে, প্লাস্টিক ক্রেট, বোতল, এমনকি টয়লেট সিটও এখানে পাওয়া যায়। এই প্যাচের সবচেয়ে বেশি স্থান দখল করে আছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, যেগুলোর আকার ০.৫ মিলিমিটারের চেয়েও ছোট।

ভাববেন না যে এই প্লাস্টিকগুলো কেবলমাত্র প্রশান্ত মহাসাগরে ভেসে বেড়ানো জাহাযগুলো থেকেই আসে, এগুলো আসে প্রশান্ত মহাসাগরের আশেপাশে থাকা সকল দেশের সকল সমুদ্রতট থেকে, এমনকি এসব দেশের নদীগুলো থেকেও। এরপর স্রোতের টানে এই সকল গারবেজ এসে এই প্রশান্ত মহাসাগরের বিশাল জায়ারে এসে ঘনীভূত হয়, আর গঠন করে জিপিজিপি।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ পাখি প্লাস্টিক দূষণের শিকার হচ্ছে।

এখনই যদি আমরা এসব নিয়ে ভাবতে না শিখি তাহলে আমাদের নিজেদের অস্তিত্বই সংকটাপন্ন হয়ে যাবে। তাহলে আমরা কী করতে পারি?

১) আমাদের উচিত প্লাস্টিক জাতীয় পদার্থ বর্জন করা।
২) আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে প্লাস্টিক জাতীয় দ্রব্যের ব্যবহার সীমিত করা।
৩) পাটজাত দ্রব্যের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের দেশের হারানো ঐতিহ্য পাটশিল্পকে পুনরায় জাগিয়ে তোলা। সব জায়গায় প্লাস্টিকের পরিবর্তে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা।
৪) জনগণকে প্লাস্টিকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করে গড়ে তোলা।
৫) পাটজাতীয় পদার্থ ব্যবহারের কারণে সরকারীভাবে ভোক্তা এবং উদ্যোক্তাদের পুরষ্কৃত করে তাদেরকে এসবের ব্যবহারে আরো উৎসাহিত করা।
৬) যেখানে সেখানে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার কারণে পর্যাপ্ত শাস্তি এবং জরিমানার ব্যবস্থা করা।
৭) প্লাস্টিক জাতীয় পণ্যের উপর অত্যাধিক শুল্কারোপ করে পাটজাত পদার্থের মূল্য কমিয়ে পাটজাত পণ্যকে আরো সহজলভ্য করে তোলা।

লেখক : নাওয়ার সালসাবিল দুর্দানা
শিক্ষার্থী ও শিশু সাংবাদিক

 

শেরপুর টাইমস ডট কম-এর মতামত পাতায় প্রকাশিত লেখার দায়ভার লেখকের নিজের। এর দায় শেরপুর টাইমস কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করবে না। সমসাময়িক বিষয় নিয়ে শেরপুর টাইমসের মতামত পাতায় আপনিও আপনার মতামত জানাতে পারেন sherpurtimesdesk@gmail.com এই মেইলে।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।