You dont have javascript enabled! Please download Google Chrome!

গারোদের ওয়ানগালা

প্রাঞ্জল এম, সাংমা :

হেমন্ত ঋতুর হাল্কা শীতের মেজাজে বদলে যায় প্রকৃতির রং। মানুষের মনেও তখন শান্তির বাতাবরন। এমন উঞ্চ সকালে ওয়ানগালার দামা, রাঙ, আদুরীর বাজে গারো পাহাড়ে।

গারোদের জীবনে ওয়ানগালা মানেই প্রানের উৎসব। একটি মিলন মেলা। এখানে মহামিলন হয় ঈশ্বর আর মানুষের। একে অন্যের, স্বজন- প্রিয়জনের। তাই প্রানের টানেই আসে ওয়ানগালায়। ওয়ানগালা উৎসবটি হয় ফসল তোলার পরে। এটি একাধারে গারোদের জুমভিত্তিক কৃষি কাজের শেষ ধারাপাত। এটি একাধারে বৃহত্তম ধর্মীয় এবং সামাজিক উৎসব। এটি তাদের নিজস্ব প্রাচীনতম উৎসব যা স্বতন্দ্র স্বকীয়তায় আধুনিক কালেও সমান জনপ্রিয়তা নিয়ে পালিত হচ্ছে। এ উৎসবেই গারোদের নিজস্ব জীবনবোধের পরিচয় খুঁজে পাওয়া যায়।

তাদের সামাজিক বন্ধন, কৃষি ফসল উৎপাদন পদ্ধতি, ধর্মবিশ্বাস, আচার অনুষ্ঠান এবং জীবন সংস্কৃতির উৎপত্তি জুমচাষ থেকেই। শস্য দানকারী দেবতার প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করার মধ্য দিয়ে সৃষ্টিকর্তার আদেশের প্রতি আনুগত্য থাকার বিষয়টি প্রকাশ পায়। দানকারী দেবতাকে উৎপাদিত কৃষি ফসল উৎসর্গ না করা পর্যন্ত্য তা ভোগ না করার নিদর্শন দুনিয়াতে বিরল। পৃথিবী থেকে অনেক জাতির প্রাচীন উৎসব অনেক আগে থেকেই হারিয়ে গেছে কিন্তু ওয়ানগালা বেঁচে আছে গারোদের মনে ও মননে।

পৌরাণিক কাহিনী মতে পৃথিবীতে তখনও খাদ্য শষ্যের জন্ম হয়নি। এক’দা শষ্য দেবতা ( মিসি আপিলপা সালজং গালাপ্পা) তার প্রিয়ভাজন (আনি আপিলপা চিনি গালাপ্পা) কে প্রথম শষ্যের ডানা দিয়েছিলেন। আর বলেছিলেন তুমি এই বীজ মাটিতে বপন কর। আর পরিচর্চা করে ফসল তোলে তা খেয়ে জীবন ধারন কর। আর ফসল ঘরে তোলা হলে আমাকে শ্মরন কর। তা হলে আমি মাটির উর্বরতা দিব, আলো-বাতাস দিব, আকাশ থেকে বৃষ্টি দিব এবং রোগ বালাই মুক্ত করে আরও প্রচুর শস্য দিব। দেবতার নির্দেশমত আনি আপিলপা চিনি গালাপ্পা বনের ঝোপঝার কেটে বীজ বুনল, ফসল হল।

ফসল সংগ্রহের পর তা ভোগ করার আগে শস্য দেবতা মিসি আপিলপা সালজং গালাপ্পার জন্যে নৈবেদ্য সহযোগে উৎসর্গ করল। মূলতঃ এটি একটি শষ্য উৎসর্গ উৎসব অনুষ্ঠান। গারো ভাষায় ‘‘অন্না’’ মানে দেওয়া আর ‘‘গাল্লা’’মানে উৎসর্গ করাকে বুঝায়। মন প্রান উজার করে প্রফুল্ল চিত্তে কোন কিছু উজার উৎসর্গকে অনগাল্লা বলে গারোরা। দেওয়া অর্থাৎ অন্না এবং গাল্লা বা অনগালা থেকে ওয়ানগালা শব্দটি এসেছে বলে পন্ডিত গন মনে করেন। মন প্রান উজার করে প্রফুল্ল চিত্তে কোন কিছু উজার উৎসর্গকে অনগাল্লার থেকেই ওয়ানগালা শব্দের উৎপত্তি বলেই জানা যায়।

গারোদের ঐতিহ্যবাহী নিজস্ব কৃষি চাষ পদ্ধতির নাম ‘‘জুম চাষ’’। বছরের ইংরেজী মাস জানুয়ারী-ফ্রেব্রোয়ারী থেকে চাষের জন্যে জায়গা নির্বাচন এবং জঙ্গল কেটে পরিস্কার করার কাজ শুরু হয়। ফ্রেব্রুয়ারী মার্চে সেই শুকনা ঝুপঝাড় আগুনে পুড়ানো হয় এবং তা পরিস্কার করে মার্চ এপ্রিল মাসে বপন করা হয় শস্য বীজ। নানা প্রজাতির ধান, ভূট্টা, কাউন, অরহর, শাক-সব্জি, আদা, কচুসহ একই ক্ষেতে ফলানো হয় প্রায় শত প্রজাতির কৃষি পণ্য। হাজার বছর ধরে বংশানুক্রমে এভাবেই আবর্তিত হয়েছে তাদের জীবন। ওয়ানগালাও হয়েছে একইভাবে।

ওয়ানগালা মূলতঃ বর্ষা শেষে শুষ্ক মৌসুমে হয়। এ দিক চিন্তা করে অক্টোবর মাসে ওয়ানগালার মহরত হয়ে থাকে। জুম চাষের আবর্তনে ছোটবড় নানা রকম পালনীয় পর্ব করা হলেও ওয়ানগানা বৃহত্তম একটি উৎসব। এবং একাধারে ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব বলে উৎসবের ব্যপকতা, গুরুত্ব এবং আমেজ থাকে অন্য রকম। উৎসবের আমেজ সবারই ভাললাগে। ওয়ানগালতে আধ্যাত্মিক বিষয়টি থাকে গুরুত্বে প্রধান। সাধারনত তিন দিন ধরে চলে ওয়ানগালা উৎসব।

প্রথম এবং দ্বিতীয় দিনটিতে ধর্মীয় পর্ব হয়। উৎপাদিত কৃষি পণ্য মিসি সালজং দেবতাকে উৎসর্গ করা হয় ধ্যূপ ও নৈবেদ্য সহযোগে। আধ্যাত্মিক নেতা (কামাল) দেবতার উপস্থিতি এবং সন্তোষ মনে গ্রহণের জন্যে মন্ত্র জবতে থাকেন এবং উৎসর্গ করেন। গারোরা উৎপাদিত কৃষিজ পণ্য দেবতাকে উৎসর্গ না করে নিজেরা ব্যবহার করেন না এবং একে অন্যের কোন বস্তুকে লোভ বসত নেয়না। তাদের বিশ্বাস তাতে গ্রহনকারীর অমঙ্গল হয়। চিরায়ত এ বিশ্বাসের ধারা থেকে তাদের নীতি মূল্যবোধ গড়ে উঠেছে এবং জাতিগত জীবনে এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। দ্বিতীয় দিনের শেষ সময়ের পর্বটি হয় সামাজিক। বিশেষ নৃত্য (গরিরওয়া, চাম্বিল মেসা-আ)। ভোজ ও পানাহারে সময় কাটে তখন।

গরিরয়া হয় নানা ঢঙের নানা তাল লয়ের চন্দ নৃত্যে মোহিত করে মন। ওয়ানগালায় দামা, আদুরী, ঢ়াং, খ্রাম, বাদ্যযন্ত্র বাজানো হয়। মিল্লাম এবং স্পি ব্যবহার করা হয় নাচের সময়। এমন একটি দিনের সময় কি ভাবে ফুরিয়ে যায় তা টেরই পায়না মানুষ। গারোরা যেন এমন নির্ভেজাল দিনের জন্যে প্রতীক্ষা করে বছরান্তে। অনুষ্ঠান শেষের দিনের সমাবেশে সবাই মিলে যায় নক্মার বাড়ী। নকমা যিনি গ্রাম প্রধান। তার বাড়ী থেকেই ওয়ানগালার যাত্রা শুরু হয় এবং ইতিও হয় তার উঠানেই। তখন উৎসবে ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র, নানা উপকরন সামগ্রী নকমার বাড়ীতে আনুষ্ঠানিক ভাবে পৌঁছিয়ে দেওয়া হয়।

সেখানেও চলে এক প্রকার নাচ গানের অনুষ্ঠান, পানাহার, খোশ গল্প। সব শেষে নকমা সকলকে ধন্যবাদ জানান এবং আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে ওয়ানগালা উৎসবের সমাপ্ত ঘোষণা করেন। এভাবে গারোদের অহম করার মতো সবই ছিল একদিন । নিজস্ব ধর্ম বিশ্বাস, সংস্কৃতি, ভাষা, জীবনবোধ সব। তার জন্যে বিন্দু মাত্র অন্যের কাছ থেকে ধার করে আনা ছিলনা। এবং তখনই গারোরা নিজস্বতার সন্মান এবং গুরুত্ব উপলদ্ধি করতে পারত। কিন্তু আস্তে আস্তে বদল হতে থাকল নিজস্বতার রং।

অষ্টাদ্বশ শতকের মাঝামাঝি থেকে ইউরোপের খ্রীষ্টান মিশনারীরা খ্রীষ্ট ধর্ম প্রচার শুরু করতে লাগল। ১৮৬৩ সালে ভারতের আসাম রাজ্যে অমেদ এবং রামখে মোমিন দুই মামা ভাগ্নে প্রথম খ্রীষ্ট ধর্মে দীক্ষা গ্রহন করলেন। তার পর খ্রীষ্টধর্ম প্রচার ও প্রসার লাভ বাড়তে থাকলে নিজস্ব ধর্ম বিশ্বাস ম্লান হতে থাকে। বড়দিন হয় ধর্মীয় উৎসব। এবং তা পালনে প্রাধাণ্য বেড়ে গেলে তাদের ইতিহাস ঐহিহ্যের ওয়ানগালা উৎসবটি সংকটে পরতে থাকে। একদিকে ধর্মীয় উৎসব বড়দিন অন্য দিকে রক্তে মাংসে ও চেতনায় ওয়ানগালা। এ ক্ষেত্রে সেই সময়ের বিদেশী মিশনারী এবং নব্য খ্রীষ্টীয়বাদের গারো ধর্মীয় নেতারা জাতির চেতনাকে অবহেলা করে। একদিকে জাতীয় সংস্কৃতি অন্য দিকে ধর্মীয় রীতিনীতি।

আগের জামানার সব রীতিনীতি বিশ্বাস ভঙ্গিকে বিসর্জন না দিলে খ্রীষ্টান হওয়া যায়না আর খ্রীষ্টান হলে আগের সময়ের কোন আচার, রীতি রেওয়াজকে মানা যাবেনা বলে প্রচার করেন তারা। সে থেকে গারোদের নিজস্ব সংস্কৃতিতে ভাটা পরতে দেখা যায়। বাংলাদেশে ওয়ানগালা হয়নি প্রায় শতবর্ষকাল ধরে। সময়ের পট পরিবর্তনের সাথে গারোরাও আধুনিক শিক্ষা দীক্ষায় উন্নত হতে থাকে। তবুও তাদের প্রানের গভীরে উদসারিত চেতনায় নিজস্বতাবোধ তাড়া করতে থাকে।

তাই দীর্ঘকাল অবহেলার পর উনিশ শতকের আশির দশকে গারো বুদ্ধিজীবি, গবেষকগণ আবারও ওয়ানগালা পূনরুজ্জীবনের প্রয়াস চালায়। তাদের মতে ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে বড় দিন খ্রীষ্ঠানদের বড় উৎসব-যা বিশ্বজনীন, এটা ধর্মীয় সংস্কৃতি। কিন্তু ওয়ানগালাতে নিজস্ব ঐতিহ্য এবং অহমবোধ (ঊমড়) বহন করে, এটা জাতীগত সংস্কৃতি। তাই নব্বইয়ের দশক থেকে বাংলাদেশে ওয়ানগালা উৎসব জেগে উঠছে আবার। আর ওয়ানগালায় এসে গারোরা যে নিরেট আনন্দ পায় তা অন্য কোন উৎসবে পায়না । তাই ওয়ানগালা গারোদের-গারোরাও ওয়ানগালার।

 

প্রাঞ্জল এম, সাংমা
সাংবাদিক, সমাজ ও কবিতাকর্মী।

 

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের

error: Alert: কপি হবেনা যে !!