কালো চাদরে ঢাকা আকাশ

মেঘলা আকাশ। রাতের আকাশ যেন কালো চাদর পরিধান করে আছে। কখনো কখনো দূর আকাশে দু-একটা তারকা মিটমিট করে জ্বলে মুহূর্তেে মধ্যেই কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে, কালো চাদরের (মেঘ) আড়ালে চাঁদ মামা যেন লুকোচুরি করে বেড়াচ্ছে। আর রাতের স্তব্ধতায় মানুষ গুলো যেন ঘুমের ঘরে অচেতন হয়ে পড়েছে। শুধু আমার দু’চোখের পাতায় ঘুম নেই। ঘুমের পাতা গুলো আমাকে গুড বাই জানিয়ে দূরনীলিমায় তারাদের আড্ডায় চলে গেছে। কারও স্মৃতি যেন আমাকে আজ বড্ড তাড়া করে চলছে। কারও শূন্যতায় যেন চোখ হতে শিশিরের মতো টপটপ করে ঝরে পড়ছে বেদনার নীল অশ্রু। কি করব, ভেবে পাচ্ছিলাম না। আমি আনমনে কাল চাদর পরিহিত আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছি। স্মৃতির মণিকোঠায় যেন ফেলে আসা দিনগুলো বার বার ভেসে উঠছে। আমি কল্পনার পঙ্খীরাজে ঘুরে বেড়াচ্ছি পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। যেখানে নেই কোন অভিমান, নেই কোন বাঁধা, নেই কোন জবাবদিহিতা। সাত রঙ দিয়ে এঁকে চলছে শতকোটি আলপনা। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে মনে পড়ে এসএসসি পরীক্ষার সময় আমার বন্ধু সোহেলের পাশের আসনে বসা পরীক্ষার্থী ফারহানার কথা। মেয়েটি আজ কেমন আছে, কোথায় আছে, ও কি আমায় মনে রেখেছে?

ফারহানা আমাদের পাশের ইউনিয়নের একটি গ্রামের বিদ্যালয় হতে এসএসসি পরীক্ষা দিতে আসে সদরের পরীক্ষা কেন্দ্রে। আর সেই কেন্দ্রে আমিসহ আমার চৌদ্দ-পনের জন বন্ধুর আসন পড়ে। তাও আবার একই হল রুমে। আমি ছোট কাল থেকেই একটু বক বক বেশি করতাম। বলতে পারেন বাচাল। আমার শিক্ষকদের কাছেও এ উপাধি পেয়েছিলাম। পরীক্ষা কেন্দ্রেও এর ব্যক্রিম নয়। প্রতিটা পরীক্ষা শুরুর আগ মুহুর্তে আমরা বন্ধু সবাই হই-হুল্লোর, মারামারি, দুষ্টুমি প্রচুর করতাম। কিন্তু এতসব কিছু যে একজনের ভাল লাগার কারণ হবে, জানতাম না। তৃতীয় পরীক্ষার দিন আমার পিছনের বেঞ্চে বসা ফারহানা সোহেলের কাছ থেকে আমার ফোন নম্বর সংগ্রহ করে। সোহেল আমায় মামা বলে সম্বোধন করত, আর এখনও তাই করে। পরীক্ষা শেষে বের হওয়ার পরেই সোহেল বলল, “মামা, আমার পাশের মেয়েটা তোমার মোবাইল নম্বর নিল, কারণটা বুঝলাম না”। আমিও কথাটা শুনে না শুনার বান করলাম। সোহেলকে বললাম বাদ দে তো। সবাই যার যার মত করে বাড়িতে চলে আসলাম।

দুপুরের খাবার শেষ করলাম। তারপর বিছানায় শুয়ে মনে মনে ভাবছি ওই মেয়েটি আমার মোবাইল নম্বর কেন সংগ্রহ করল। নম্বর সেটা আবার আমার কাছে নয়, সোহেলর কাছ থেকে নিল। ঠিক ওই মুহুর্তেই আমার মোবাইলটা বেজে উঠল। মোবাইলটা রিসিভ করেই মিষ্টি কণ্ঠে শুনতে পেলাম, আচ্ছা পরীক্ষা কেন্দ্রে আপনি এত বক বক করেন কেন। পরিচয় না নিয়েই আমিও বলে ফেলাম, আমি তো বাচাল তাই। শুনে হেসে উঠল মেয়েটি। তারপর বললাম এবার বলুন আপনি কে? পরিচয় হলাম। দীর্ঘ সময় কথা শেষে বলল আমি যে আপনার সঙ্গে মোবাইলে কথা বললাম সেটা কিন্তু আপনার বন্ধুদের বলবেন না। প্লিজ কথা দেন, বলবেন না। আমি বললাম, আচ্ছা বাবা বলব না। দু-একদিন কথা চলে মেয়েটির সঙ্গে। এর মাঝে আপনি থেকে তুমি সম্বোধনে চলে আসছি আমরা। পরের পরীক্ষায় সোহেল জানতে চাইল, মামা ওই মেয়েটা তোমারে কল দিয়েছিল? আমি জবাবে বললাম না তো। কিছুক্ষণ পরেই সোহেল বলল,“মামা মেয়েটির সঙ্গে প্রেম করব আমি”। আমি শয়তানি অর্থ্যাৎ ফাজলামু করে বললাম, তর কয়টা লাগেরে, তুই তো আমার ভাগ্নী জামাই। তুই এসব বাদদে। আমিই প্রেম করুম ওই মেয়ের সঙ্গে। ওইদিনই মেয়েটির দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে দেখলাম। তার পর সামনাসামনি কথা বলা, নীরব মনে তাকিয়ে থাকা, হাসি ঠাট্টায় মেতে ওঠা আরও অনেক কিছু।

ওবলে রাখি, দুই তিনদিনের মধ্যেই মেয়েটির সঙ্গে আমার মোবাইলে বন্ধুত্ব হয়, কথা হয় তার দুই-একজন বান্ধবীর সঙ্গে। তার বান্ধবীরা আমার জীবন বিস্তারিত সমন্ধে জানতে চায়, জীবন বিস্তারিত মানে আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চান। হঠাৎ এতদিন সন্ধ্যায় আমার মোবাইলে কল দেয় মেয়েটি, প্রায় আধঘন্টা কথা চলে। এই কথাগুলোর মাঝে সে জানতে চাইল আমি কাউকে ভালবাসি কি না? তবে সে যে আমাকে পছন্দ করত তা আমার জানা ছিল না। আমি দ্বিধা-দন্ধ না রেখে বললাম নেই, তবে তোমার মত কাউকে পেলে ভেবে দেখবো। তখন ফারহানা বলে, কী দেখলেন আমার মাঝে, আমায় পছন্দ করেন? সত্যি করে বলুন, আপনি কাউকে পছন্দ করেন কি না। সেই দিন আর এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া হল হল না আমার। তবে তার সঙ্গে মেবাইলে আমার নিয়মিত কথা চলে। আর সেই মোবাইল থেকেই পথ চলা শুরু, অজানার এক পথে। আমি এই পথে কি ভাবে হারিয়ে গেলাম তা আমার জানা নেই। অজানা এ পথে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে গভীর বনে চলে এলাম। হঠাৎ পিছনে তাকিয়ে দেখি আমি গভীর বনে আটকে পড়েছি আমি। সামনে কোন পথ নেই। চারদিকে সবুজ বৃক্ষ গুলো আমাকে জড়িয়ে আছে। আর আমাকে মুগ্ধ করে চলছে অজানা মিষ্টি এক ঘ্রাণ। বাগানের কত ফুলের ঘ্রাণ আমার নাক নিয়েছে। কিন্তু এত অন্য ঘ্রাণ যার সাথে আগের কোন পরিচয় নেই। যত দিন গড়াচ্ছে ততই যেন তার প্রতি আমি দূর্বল হয়ে পড়ছি। সারাক্ষণ মোবাইলে মিসকল দেয়া আর কথা বলা হয়ে ওঠে এক প্রকার নেশার মত। ফুল না পেলে বুলবুলি যেমন, মধু না পেলে মৌমাছিরা যেমন, চাঁদ না দেখলে চকোর যেমন বিচলিত হয়ে পড়ে, ঠিক তেমনি মিসকল না পেলে ও কথা না শুনলে আমিও অস্থির হয়ে পড়ি। তখন বুঝতাম না এর নাম প্রেম না ভালবাসা। এভাবেই চলে অনেক দিন।
এর মাঝে চলে আসে ১৪ ফেব্রুয়ারী বিশ্ব ভালবাসা দিবস। সেই দিন ছিল আমাদের বিদ্যালয়ের পিকনিক ময়মনসিংহের আলাউদ্দিন্স পার্ক। ওইখান থেকেই তার সঙ্গে কথা হয় অনেকবার। মেয়েটি সন্ধ্যার আগ মুহুর্তে মোবাইলে একটা বার্তা (এসএমএস) পাঠায়। তাতে লেখা ছিল, আজকের এ দিনে আমার মনের মানুষকে মনের কথা জানাতে অনুরোধ করেছেন। আমি বললাম আজ নয়, সময় হলেই জানাব। এভাবেই চলতে থাকে দীর্ঘদিন। কলেজে ভর্তি হওয়ার পরেই হঠাৎ ফোন দিয়ে আমায় বলে আগামী শুক্রবার আমার বিয়ে। আমি জবাবে কিছু না বলে কলটা কেটে দেই। আবারও কল আসে, রিসিভ করইে শুনতে পেলাম, কিছু না বলেই কেটে দিলে কেন? আমি জবাবে কিছু না বলে রেখে দেই। সেই যে রেখে দিয়ে চলছি, আজও আর কোন কথা হয়নি এ পর্যন্ত।

বিঃদ্র- লেখাটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক।

লেখক
সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী
মো. জাহিদুল হক মনির
১০ম ব্যাচ (এমজিএস)
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।