করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত বিশ্ব প্রয়োজন দায়িত্বশীলতা ও প্রতিরোধ

বিশ্বে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত ও ভয়ঙ্কর শব্দটি হলো নভেল করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯। করোনা ভাইরাসের সঙ্গে পূর্বপরিচিত হলেও করোনা ভাইরাসের নতুন এই স্ট্রেইনটি অর্থাৎ ঈঙঠওউ-১৯ সম্পর্কে কিছুদিন আগেও বিশ্ববাসীর কোনো ধারণা ছিল না। ২০১৯ সালের শেষ দিকে চীনের উবেই প্রদেশের উহান শহরে প্রথম এ ভাইরাসটি মানবদেহে শনাক্ত হওয়ার পর চমকে যায় বিশ্ব। ভাইরাসটি শ্বাসনালিতে প্রথম সংক্রমিত হয়। প্রথমে জ্বর, গলাব্যথা, মাথাব্যথা, শরীরে ব্যথা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়, যেমনটি সাধারণ সর্দিজ্বরে হয়ে থাকে। এর সঙ্গে দ্রুতই শুকনো কাশি এবং সপ্তাহখানেকের মধ্যে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে যায়। এমতাবস্থায় অনেকেরই হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মতো অবস্থা সৃষ্টি হয়ে থাকে।

২০১৯ সালের শেষ দিকে চীনের উহান শহরে অজ্ঞাত কারণে নিউমোনিয়ার মতো সমস্যাটি প্রথম বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নজরে আসে ৩১ ডিসেম্বর। ২০২০ সালের ৩০ জানুয়ারি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে পাবলিক হেলথ ইমারজেন্সি অব ইন্টারন্যাশনাল কনসার্ন বা বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। কয়েক দিন পর ১১ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটির নামকরণ করে কোভিড-১৯। বর্তমানে অ্যান্টার্কটিকা বাদে বাকি সব কয়টি মহাদেশের প্রায় ১০০টির বেশি দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। সর্বশেষ বাংলাদেশও এ তালিকার অন্তর্ভুক্ত। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, ইরান রয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে এবং মৃতের সংখ্যা তিন হাজারের ওপর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যে হাই অ্যালার্ট জারি করেছে।

বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় মানুষের চলাফেরা সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণ করা বা গতিবিধি তদারক করা কোনো সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকার, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগও খুবই জরুরি। এ ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কিছু দিকনির্দেশনা করোনা প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখতে সহায়ক হবে।

ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিজেকে সংক্রমণ মুক্ত রাখতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ আছে। এসব পদক্ষেপ যেমন নিজেকে সংক্রমণ মুক্ত রাখবে, তেমনি সংক্রমিত ব্যক্তি থেকে অন্যদের সংক্রমণ মুক্ত রাখতে সাহায্য করবে।

সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে যাওয়া যাবে না। নিয়মিত হাত ও মুখম-ল ভালো করে সাবান পানি দিয়ে পরিষ্কার রাখতে হবে। চোখে-মুখে হাতের স্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে। হাঁচি-কাশি হলে অবশ্যই রুমাল বা টিস্যু দিয়ে মুখ ঢেকে রাখতে হবে, যাতে হাঁচি-কাশির সঙ্গে নিঃর্গত কফ অন্যের গায়ে না লাগে। রুমাল বা টিস্যু না থাকলে পরিধানের কাপড় বিশেষ করে শার্টের আস্তিন দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে নিতে হবে। কারণ সংক্রমিত ব্যক্তি থেকে হাঁচি-কাশির কফের সঙ্গে ভাইরাসের জীবাণু ছড়ায়। সংক্রমিত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির সঙ্গে নিঃর্গত কফের কণা সুস্থ কারও নাকে-মুখে স্পর্শ করলে সেখান থেকে নিঃশ্বাসের সঙ্গে ভাইরাসটি সুস্থ লোকের দেহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার সুযোগ পায়। এই সুযোগে দেহাভ্যন্তরে পৌঁছে শ্বাসনালিতে ভাইরাসটি সংখ্যা বৃদ্ধি করতে থাকে এবং সংখ্যা বৃদ্ধির একটি পর্যায়ে ব্যক্তিটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। সংখ্যা বৃদ্ধির এই সময়টিই হলো ইনকিউবেশন পিরিয়ড গণনায় মোটামুটি ১৪ দিন। হাঁচি-কাশির কফ ও নিঃশ্বাসের মাধ্যমে ভাইরাস বা অন্যান্য রোগ-জীবাণু ছড়ানোর এই পদ্ধতিকে বলা হয় ড্রপলেট ইনফেকশন। সংক্রমিত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির সময় ওই ব্যক্তির কাছ থেকে অন্তত এক মিটার দূরে থাকতে হবে ড্রপলেট ইনফেকশন থেকে নিরাপদ থাকার জন্য। এ ক্ষেত্রে উভয়ের জন্য ফেস মাস্ক ব্যবহার করা জরুরি। বিশেষ করে যারা করোনা আক্রান্ত এলাকা ভ্রমণে থাকবেন বা বিমানবন্দরে যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের প্রচুর অপরিচিত মানুষের সমাগম থাকে, সেখানে অবশ্যই এটি খেয়াল রাখতে হবে। সম্ভব হলে এ সময়টিতে বিদেশ ভ্রমণ স্থগিত রাখাই ভালো। ভ্রমণ শেষে, বিশেষ করে সংক্রমিত দেশ থেকে ফেরার পর ইনকিউবেশন পিরিয়ডের ১৪ দিন নিজেকে স্বেচ্ছায় কোয়ারেনটাইনে রাখা অর্থাৎ নিজ গৃহে অবস্থান করাই নিরাপদ। আর যদি ভ্রমণকালীন বা তার ঠিক পরবর্তী সময়ে গা ব্যথা বা সর্দি-কাশি কিংবা জ্বর জ্বর ভাব থাকে, তবে বিষয়টি গোপন না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ইমিগ্রেশনে বা সংক্রমিত এলাকায় যারা সরাসরি সংক্রমণ নিয়ে কাজ করছেন (স্ক্রিনিং, চিকিৎসাসেবা প্রদান, ল্যাব, করোনায় মৃত ব্যক্তির সৎকার ইত্যাদি) তাদের অবশ্যই পারসোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট (পিপিই) ব্যবহার করতে হবে। পিপিই মানে হাতে গ্লাভস, ফেস মাস্ক, ফেস প্রটেক্টিং ডিভাইস, কোট ও গাউন। পিপিইর ফেস মাস্কটি সাধারণ ফেস মাস্ক নয়, বরং এটি হবে বিশেষ ধরনের ফেস মাস্ক; যা দশমিক ১ মাইক্রন সাইজের করোনা ভাইরাসকে আটকে দিতে পারে।

সরকারি পর্যায়ে অবশ্যই স্ক্রিনিংয়ের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বিশেষ করে বিমান ও স্থলবন্দরে স্ক্রিনিং জোরদার করতে হবে। সংক্রমিত দেশ থেকে আগত লোকদের স্ক্রিনিং এবং স্ক্রিনিং-পরবর্তী তদারকির ব্যবস্থা রাখতে হবে। শনাক্তকরণ কিট ও প্রফেশনালদের জন্য পিপিইর প্রয়োজনীয় সরবরাহ ও প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। করোনার ঝুঁকিপূর্ণদের কোয়ারেনটাইন বা বিচ্ছিন্ন বসবাসের ব্যবস্থা ও করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য পৃথক ব্যবস্থা রাখতে হবে। জনসাধারণের জন্য করোনা ভাইরাসের ঝুঁকি ও চিকিৎসাসংক্রান্ত বিষয়ের তথ্যাদি প্রাপ্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

প্রফেশনালদের, বিশেষ করে হাসপাতালে বা নিজস্ব চেম্বারে যারা রোগী দেখবেন তাদের অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বিশেষ করে করোনা আক্রান্ত কারও চিকিৎসার প্রয়োজন হলে অবশ্যই বিশেষ সতর্কতা হিসেবে নিজে মাস্ক ইত্যাদি ব্যবহার করতে হবে এবং একই ব্যবস্থা রোগীর জন্যও প্রযোজ্য। যথাসম্ভব রোগীর মুখম-ল এলাকা স্পর্শ না করার চেষ্টা করতে হবে। রোগী দেখা শেষ হলে অবশ্যই হাত সাবান দিয়ে ভালো করে ধুয়ে পরবর্তী কাজে মনোনিবেশ করতে হবে। সাবান পানির ব্যবস্থা না থাকলে স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হবে। পরিধেয় কাপড় ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। ডিটারজেন্ট ভাইরাসকে ধ্বংস করতে সক্ষম। মাস্ক নিয়ে যদিও বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা হচ্ছে। তবে যারা করোনায় ঝুঁকিপূর্ণ বা সংক্রমিত, তাদের সংস্পর্শে আসতে হলে অবশ্যই মাস্ক প্রয়োজনে পিপিই পরতে হবে।

মনে রাখতে হবে করোনা ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কার হয়নি। তাই প্রতিরোধ ও সংক্রমণ সীমিত করাই হবে মূল লক্ষ্য।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।