You dont have javascript enabled! Please download Google Chrome!

এলো খুশীর ঈদ

তালাত মাহমুদ

মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে সবচেয়ে বড় উৎসব হচ্ছে ঈদুল ফেতরের উৎসব। এক মাস সিয়াম সাধনার পর সাওয়াল চাঁদের প্রথম তারিখে মুসলিম জাহানের কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মুসলমান পবিত্র ঈদুল ফেতরের আনন্দ উপভোগ করে থাকেন। ধনী-দরিদ্র, মনিব-চাকর, শত্রু-মিত্র, আপন-পর, ছোট-বড় সবাই সেদিন এক হয়ে যান। সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে মুসলিম উম্মাহর যে বহিঃপ্রকাশ ঘটেÑ তার তুলনা হয় না।

ঈদুল ফেতরের দিনে শিশু-কিশোর, ছেলে-মেয়ে থেকে জওয়ান-বুড়ো, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল বয়েসী মানুষ সকাল বেলায় গোসল সেরে নতুন পোশাক পরিধান করে আর নানা প্রকার মিষ্টান্ন খেয়ে সকলের সাথে সুখ-আনন্দ ভাগাভাগি করে ঈদের জামায়াতে নামায আদায় করে থাকেন। বাসা-বাড়িতে রান্না হয় বিভিন্ন জাতের মিষ্টান্ন এবং পোলাও-কুর্মা, মাংস সহ অনেক রকমের খাবার। শিশু-কিশোর আর কিশোরী মেয়েরা দলবেঁধে গ্রামে গ্রামে আর শহরের মহল্লায় মহল্লায় বেড়াতে যায়। অনেকে আবার আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে গিয়ে আপনজনের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করে থাকেন।

রমযান ও ঈদ উপলক্ষে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘ ছুটি থাকে। এ সময়ে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা নানা বাড়ি, ফুফু ও খালা বাড়িতে বেড়াতে যায়। শহুরে ছেলেমেয়েরাও তাদের গ্রামের আত্মীয় বাড়িতে বেড়াতে যায়। গ্রামের যে সমস্ত মানুষ শহরে চাকুরী করেন। বিশেষ করে গার্মেন্টস শিল্পে, বিভিন্ন অফিস, আদালতে এবং বিভিন্ন বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকেন। তারা দল বেঁধে গ্রামের বাড়িতে চলে আসেন আত্মীয় স্বজনের সাথে একত্রে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে। তখন গ্রামের পরিবেশ পাল্টে যায়। গ্রামের হত-দরিদ্র মানুষও আনন্দে মেতে ওঠে। কারণ শহর থেকে আগত লোকজন গ্রামে ফিরে এসে এসব দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে নতুন পোশাক ও টাকা দিয়ে সাহায্য করে থাকেন।

যাকাতের সম্পদ ও তার ব্যবহার : পবিত্র কোরআনে যাকাত আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাদীস শরীফে তার ব্যাখ্যা ও বাস্তব কর্মরূপ উপস্থাপন করা হয়েছে। নবী করীম (সা:) এর হাদীস থেকে জানা যায়, সোনা, রূপা, ব্যবসার পণ্য, কৃষিপণ্য, নগত অর্থ, পশু সম্পদ ইত্যাদিতে যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য এগুলোর পরিমাণ যেমন ভিন্ন, তেমনি এসবের যাকাতের হারও ভিন্ন। নিম্নলিখিত সম্পদের উপর যাকাত ফরজ হয় ঃ (১) স্বর্ণ-রৌপ্য ও নগদ অর্থ, (২) ব্যবসা পণ্য, (৩) কৃষি পণ্য, (৪) পশু সম্পদ (৫) খনিজ সম্পদ (৬) অন্যান্য সম্পদ।

যেসব সম্পদে যাকাত ফরজ নয় : নিম্নোল্লিখিত সম্পদ সমূহের উপর যাকাত নেই। (১) বসবাসের বাড়ি-ঘরের উপর যাকাত নেই, তা যত মূল্যবানই হোক না কেন। (২) যে কোন প্রকারের মণি-মুক্তা ইত্যাদির উপর যাকাত নেই। (৩) কৃষি ও সেচ কাজের জন্য যে পশু যেমন- গরু, মহিষ, উট প্রতিপালন করা হয় তার উপর যাকাত নেই। (৪) কল-কারখানা, যন্ত্রপাতি ও ফার্মের উপর যাকাত নেই। (৫) গৃহ পালিত পশু যদি ব্যক্তিগত প্রয়োজনে রাখা হয়, যেমন : দুগ্ধপানের জন্য গাভী, বোঝা বহনের জন্য গরু-মহিষ, যানবাহনের জন্য ঘোড়া, হাতী, উট তাহলে তার সংখ্যা যতই হোক তার কোন যাকাত দিতে হবে না। (৬) যে সব জিনিস ভাড়ায় খাটানো হয় – যেমন : সাইকেল, রিক্সা, ট্যাক্সি, সিএনজি, অটো, বাস, ট্রাক, ফার্নিচার, ক্রোকারিজ ইত্যাদি অথবা যে সব দোকান ও বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয় তার উপর কোন যাকাত নেই। তবে এসব থেকে যে আয় হবে তা যদি নিসাব পরিমাণ হয়, তাহলে বছর অতীত হওয়ার পর যাকাত দিতে হবে। ঐসব জিনিসের উপর কোন যাকাত নেই। এরূপ মালের ও দামের অন্যান্য পণ্য সামগ্রীর উপরও কোন যাকাত নেই। সুতরাং প্রত্যেক মুসলমান ব্যক্তিকে তার হালাল মালামাল রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচালন ও ব্যবহারের বিষয়ে জানা থাকতে হবে এবং ফেৎরা, যাকাত, ছৎকায়ে জারিয়া ইত্যাদি বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। তাতে সুফল পাওয়া যাবে এবং অকল্যাণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।

ফেৎরার বিবরণ : ঈদের দিন ছোবহে সাদেকের সময় যে ব্যক্তি হাওয়ায়েজে অছলিয়া অর্থাৎ জীবিকা নির্বাহের অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ (যথা- পরিধানের বস্ত্র, শয়নের গৃহ এবং আহারের খাদ্য দ্রব্য) ব্যতীত সাড়ে সাত তোলা সোনা অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা অথবা এই মূল্যের অন্য কোন মালের মালিক থাকিবে, তাহার ফেৎরা দেওয়া ওয়াজিব হইবে। সে মাল তেজারত বা ব্যবসায়ের জন্য হউক বা না হউক বা সে মালের বৎসর অতিবাহিত হউক বা না হউক। ফেৎরাকে ‘ছদকায়ে ফেৎর’ বলে। (২ দেরহাম পরিমাণ সম্পত্তির অধিকারীকে মালেকে নেছাব বলে। আমাদের দেশী হিসাবে ২০০ দেরহামে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা হয়)। ……….(হাদীস শরীফে আছে, গরীব হওয়া সত্ত্বেও কষ্ট করে যে আল্লাহর রাস্তায় ছদকা দেয়, তাহার দানকে আল্লাহ তাআলা অনেক বেশী পছন্দ করেন)। যদি কেহ করর্যদার (্ঋণগ্রস্ত) থাকেন, তবে ঋণ বাদে যদি মালেকে নেছাব হয়, তবে ফেৎরা ওয়াজিব হবে, নতুবা নয়। ঈদের নামাযের পূর্বেই ‘ছদকায়ে ফেৎরা’ দিয়ে পরিষ্কার হওয়া মুস্তাহাব। যদি একান্ত আগে না দিতে পারে, তবে পরে দিলেও আদায় হবে। একজনের ফেৎরা একজনকে, একজনের ফেৎরা কয়েকজনকে ভাগ করে দেওয়া উভয়ই জায়েজ আছে। ……………যাহার জন্য যাকাত খাওয়া হালাল তাহার জন্য ফেৎরা খাওয়াও হালাল।

যাকাতের মাল নিতে গিয়ে প্রতি বছরই পদদলিত হয়ে অনেক মানুষ মারা যায়। এক্ষেত্রে যাকাতের অর্থ সরকারের ‘যাকাত তহবিলে’ অথবা বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ইসলামী সংস্থা কিংবা বিভিন্ন মাদ্রাসার লিল্লাহ তহবিল ও এতিমখানায় দান করে দেওয়াই যুক্তিযুক্ত। সরকারী ভাবে দুঃস্থ ও গরীব মানুষের মাঝে খাদ্য ও বস্ত্র বিতরণ করা হয়। এই অর্থও সরকারের ‘যাকাত তহবিল’ থেকে সুষ্ঠু ও সুন্দর ভাবে বিতরণ করা সম্ভব। ‘আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম’ একটি বহুল পরিচিত সেবা মূলক ইসলামী প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানেও যাকাতের অর্থ দান করা যায়। দেশের অনেক স্থানে এতিমখানা রয়েছে, বিভিন্ন মাদ্রাসায় এতিম শিক্ষার্থীদের জন্য লিল্লা বর্ডিং রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ধণাঢ্য ব্যক্তিরা অনায়াসে তাদের যাকাতের অর্থ দান করে দিতে পারেন। এতে শিক্ষার্থীদের কল্যাণ সাধিত হবে।

ঈদুল ফেতরের বিবরণ
‘ঈদ’ শব্দের অর্থ খুশী বা আনন্দ। ফেতর শব্দের অর্থ কিছু খেয়ে রোযা ভঙ্গ করা। রমযান শরীফের এক মাস রোযা রাখার পর শাওয়ালের চাঁদের প্রথম তারিখে খাওয়া দাওয়া ইত্যাদিতে যে আনন্দ উৎসব করা হয়, তাকে ঈদুল ফেতর বলে। ঐ তারিখে অতিরিক্ত ছয় তাকবীরের সাথে দু’রাকাত নামায জামায়াতে পড়া ওয়াজিব। এই নামায কেউ ঈদুল ফিতরের নামায বলে। ওয়াক্ত শাওয়ালের চাঁদের প্রথম তারিখে অনুমান দুই খন্ড বেলার পর হতে দ্বি-প্রহর সূর্য ঠিক মস্তকের উপরে আসার পূর্ব পর্যন্ত ঈদুল ফেতরের নামাযের সময়। কোন বিশেষ কারণে ঐ দিন নামায পড়তে না পারলে পরের দিনেও নামায পড়া যায়।
ঈদুল ফেতরের দিনের মুস্তাহাব : ঐদিন নামাযের পূর্বে ভালরূপে মিশওয়াক বা দাঁত মেজে গোসল করা উত্তম। পরিষ্কার এবং পবিত্র কাপড় পরিধান করা, চোখে সুরমা দেওয়া আতর বা সুগন্ধি দ্রব্য ব্যবহার করা, নামাযের পূর্বে মিষ্টি দ্রব্য মিষ্টান্ন বা উত্তম খাদ্য খাওয়া এবং বিতরণ করা। ঈদগাহের পথে চুপেচাপে নিম্নের তাকবীর পাঠ করতে করতে ঈদগাহ বা ঈদের জামায়াতে উপস্থিত হওয়া এবং নামাযের পূর্বে ছদকায়ে ফিতর আদায় করা।

ঈদুল ফেতরের দিনের তাকবীর : আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ্। অর্থ : আল্লাহ মহান আল্লাহ মহান, আল্লাহ ভিন্ন অন্য কোন মাবুদ নেই। আল্লাহ মহান আল্লাহ মহান এবং যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর জন্য।

ঈদুল ফেতরের নামাযের শর্ত : যাদের জুময়ার নামায পড়তে হয়, তাদেরকে ঈদুল ফিতরের নামাযও পড়তে হয়। আবার যাদের উপর জুময়ার নামায ফরয নয়, তাদের উপর ঈদুল ফেতরের নামাযও ওয়াজিব নয়। জুময়ার নামায আদায়ের জন্য যা শর্ত, ঈদুল ফেতরের নামায আদায়ের জন্যও সেই সব শর্ত প্রযোজ্য। তবে একমাত্র ব্যতিক্রম এই যে, জুময়ার নামাযের খুৎবা নামাযের পূর্বে পড়া শর্ত এবং ঈদের নামাযের খুৎবা ঈদের নামাযের পরে পড়া শর্ত। সূত্র : সিরাতুল জান্নাত ও প্রাত্যহিক জীবনে ইসলাম।

প্রিয় পাঠক : বর্তমান বিশ্বে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। ইহুদি-নাসারা চক্র নানা কুট-কৌশলে মুসলিম দেশগুলোতে তাদের নিয়োজিত কথিত মুসলমান এজেন্টদের মাধ্যমে অশান্তির সৃষ্টি করে চলেছে। শুধু তাই নয়, পশ্চিমা দুনিয়ার ‘দাজ্জাল শক্তি’ ইতিমধ্যে অনেক মুসলিম রাষ্ট্রে আগ্রাসন চালিয়ে অগণিত মুসলিম নারী ও শিশুকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। ধ্বংস করে দিয়েছে সে সব মুসলিম রাষ্ট্রের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির মজবুত ভিত্তি। মৌলবাদ ও জঙ্গীবাদের আখ্যা দিয়ে মুসলমানদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করা হচ্ছে। অথচ ‘আল্ কায়েদা’, ‘আইএস’ এসব পশ্চিমা দুনিয়ার তথা ইঙ্গ-মার্কিন চক্রেরই সৃষ্টি। গোপনে গোপনে মুসলিম দেশে অমুসলিম প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। মুসলমানদের ঘাড়ে অমুসলিমদের কতৃত্ব চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ কিসের আলামত? এসব নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। প্রয়োজনে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। পবিত্র ঈদুল ফেতরের এই দিনে আনন্দ উপভোগের পাশাপাশি ইসলাম ও মুসলিম জাতিকে রক্ষার অঙ্গিকার করতে হবে। তা না হলে নবম শতাব্দীতে স্পেনে মুসলিম নিধনের মত করুণ পরিণতির শিকার হতে হবে মুসলমান জাতিকে।

লেখক : কবি সাহিত্যিক সাংবাদিক, কলামিস্ট; সভাপতি, কবি সংঘ বাংলাদেশ ও লেকশি এবং প্রধান সহকারী সম্পাদক দৈনিক ঢাকা রিপোর্ট।

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের

error: Alert: কপি হবেনা যে !!