You dont have javascript enabled! Please download Google Chrome!

একটি সুযোগ চাই, আমি আত্মহত্যা করতে চাই না

আমি ইমরান হাসান রাব্বী। একজন সংবাদকর্মী। অসুস্থতার কারণে অনার্সের একটি পরীক্ষাতে উপস্থিত থাকতে পারিনি। কাল রবিবার আমার ফাইনাল (বিশেষ) এক্সাম। কিন্তু বই খুলে বইয়ের দিকে চোখ পড়তেই ভেসে উঠছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য আত্মহত্যা করা ছেলেটার মুখ। কানে বেজে উঠছে তার লিখা শেষ ফেসবুক স্ট্যাটাস। তাই বন্ধ করে অনলাইনে দুটি কথা না লিখে পারলাম না।

আমি চ্যালেন্জ করে বলতে পারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসে উপস্থিতির উপরে আলাদা মার্কস না থাকলে কিংবা নির্দিষ্ট ইনকোর্স পরীক্ষায় উপস্থিত নাথকলে পরীক্ষা দেয়া যাবেনা- এই ব্যাপারটা না থাকলে, অল্প সংখ্যক ব্যতিক্রম ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর অধিকাংশ ক্লাস শূন্য থাকতো। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলোর অবস্থাতো আরো খারাপ। এর মানে কি ছাত্রছাত্রীরা ফাঁকিবাজ? না, এর মানে অধিকাংশ শিক্ষক জানেই না ‍”পড়াতে হয় কিভাবে”। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থী উপস্থিতির হার বাড়ানোর জন্য ক্লাসে বসে থাকে- কেউ ফেসবুকিং করে, কেউ ঘুমায়, কেউবা আবার গার্লফ্রেন্ডের সাথে ফুচকা চটপটি খেতে ক্যাম্পাসে আসে।

এখন ধরা যাক কোন একজন ছাত্র কোন কারণে ক্লাসে উপস্থিত থাকতে পারলো না দীর্ঘদিন। হতে পারে সে অসুস্থ, হতে পারে তার বাবা/মা মারা গেছে, হতে পারে তার জীবন-সংশয় হয়েছে- মৌলবাদীরা তাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে, হতে পারে সে জীবিকার তাগিদে কোন কর্মে ব্যস্ত- এই কারণে সে রুটিন মেনে ক্লাসে আসতে পারছেনা। তো এই যে ছাত্রটি এসব কারণে ক্লাসে উপস্থিত হতে পারলোনা, তার সাথে কি হয় বলে আপনার ধারণা? নাম্বার তো বাদই দিলাম, তার ফাইনাল পরীক্ষায় বসাটা অনিশ্চিত হয়ে যায়, এমনকি সে যদি এসব সমস্যার প্রমাণ সহ আবেদন করে তবুও। পরবর্তীতে, কোন দোষ না থাকার পরও, নিজের সমস্যার পক্ষে প্রমাণ থাকার পরও, মোটা অংকের জরিমানা দিয়ে ঐ ছাত্রকে পরীক্ষা দেয়ার অনুমতি দেয়া হলেও হতে পারে। আমি এগুলো ভালো করে জানি, কারণ যা যা বললাম, সেগুলো আমার সাথেই ঘটেছে।

একজন ছাত্র কোন সমস্যার মুখোমুখী হলে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভাগ তাকে সাহায্য না করে,যেকোন মূল্যে হেনস্তা করতে ওৎ পেতে থাকে, কখনো স্রেফ পশুর মত আচরণ করে। অনেক শিক্ষক দিনের পর দিন ক্লাস নেননা, নিজেদের খেয়াল খুশি মত ক্লাস ফালান এবং দ্বিগুণ খেয়াল খুশিতে অনেক সময় হুট করে বাতিলও করে দেন। আমার জানা মতে কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে এর জন্য জবাবদিহি করতে হয়না। কিন্তু কোন ছাত্র, যৌক্তিক কারণে অনুপস্থিত থাকলেও তাকে সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হয়।

ঠিক এই একইচাপে ছেলেটি আত্মহত্যা করেছে। ক্লাসে অ্যাটেনডেন্স কম থাকায় তাকে সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষায় অংশ নিতে দেয়া হয়নি। নিম্ন শ্রেণীর বদমাশ বিশ্ববিদ্যালয় গুলো এমনিতেই চার বছরের শিক্ষা জীবন শেষ করায় ৫/৬ বছরে, অসংখ্য উপায়ে নষ্ট করে লাখো শিক্ষার্থীর জীবনের মূল্যবান সময়টুকু। তার উপর একটা ছেলেকে পরীক্ষা দিতে না দেয়ার ফলে তার জীবনের যে সময়টা নষ্ট হয়- তার ক্ষতিপূরণ কী হবে?

নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে হচ্ছে। জরিমানা দিয়ে হোক বা যেভাবেই হোক পরীক্ষা গুলো দিতে পারছি। কিন্তু এমন অনেককেই দেখেছি, সিস্টেমের ফাঁদে যারা আটকে গেছে বিচ্ছিরি ভাবে, বের হতে পারছেনা কোন ভাবেই। এই ফাঁদ থেকে বের হওয়া ভীষণ কঠিন ব্যাপার। কারণ সময় নষ্ট হওয়া, জুনিয়রদের সাথে ক্লাস করা আর সবার টিটকিরির জন্য যে পরিমাণ মানসিক হীনমন্যতা এবং যন্ত্রণার সৃষ্টি হয় সেটা ঠেলে উপরে ওঠা প্রায় অসাধ্য।

যতটুকু জেনেছি, যে ছেলেটি আত্মহত্যা করেছে সে মাত্র ফার্স্ট ইয়ারে পড়ছিল। তাকে একটি সুযোগ দিলে কি বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব ক্ষতি হয়ে যেত? অ্যাটেনডেন্স এর জন্য মার্কস তো আছেই। যে উপস্থিত থাকবে সে মার্কস পাবে, যে থাকবেনা সে পাবেনা। এর জন্য পরীক্ষায় বসতে না দেয়াটা, একই অপরাধে দুবার সাজা দেয়ার মত হয়ে গেল। নাকি শিক্ষকরা নিজেদের পড়ানোর স্টাইল সম্পর্কে ভালো ভাবে জানেন বলেই ক্লাসে যেকোন রকমে স্টুডেন্ট বসিয়ে রাখার জন্য এত এত নিয়ম জারী করে রেখেছেন?

নাকি ধরে নিবো, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়- একটি খুনী বিশ্ববিদ্যালয়। এটি তাদের এক ছাত্রকে খুন করেছে। দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এক একটি খুনী বিশ্ববিদ্যালয়। এগুলো প্রতিনিয়ত অসংখ্য সৃজনশীল এবং বিচিত্র উপায়ে এর ছাত্র ছাত্রীদের খুন করে। বাংলাদেশ একটি খুনীদের দেশ। এদেশের প্রতিটি মানুষ , প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এক একটি পেশাদার খুনী। এই বিষাক্ত খুনী দেশ যার ঘরে আগুন লাগায়, তাকেই জেলে ভরে অপরাধী হিসেবে। ইবলিস প্রধান এই দেশে শয়তানের বাচ্চারা নিরাপদে থাকে, আর মানুষ গুমরে কেঁদে মরে। তবে কেঁদে মরাটাই কি আমাদের নিয়তি?

কেন, কিজন্যে একটি প্রাণ অসময়ে ঝরে গেলো, এর পিছনের ঘটনা কি- এটা খুঁজে বের করুন। নতুন আরেকটাও প্রাণ যাতে হারিয়ে না যায়, সেই সিস্টেম চালু করুন। উপস্থিতির হার একটি শিক্ষার্থীর পরীক্ষায় অংশগ্রহণের যোগ্যতা হতে পারে না। এই তথাকথিত সিস্টেম চেন্জ করুন। অামি একটি সুযোগ চাই, আমি আত্মহত্যা করতে চাই না। চাই না আরেকটা সুন্দর নিষ্পাপ প্রাণ এভাবে অকাতরে চলে যাক।

 

(পাঠকের কথা বিভাগের এই লেখার যাবতীয় বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য লেখকের একান্তই নিজস্ব। শেরপুর টাইমস ডট কম এর জন্য দায়ী নয়।)

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের

error: Alert: কপি হবেনা যে !!