You dont have javascript enabled! Please download Google Chrome!

একজন তারা’র প্রস্থান এবং আত্মজ অনুভূতি

:রফিকুল ইসলাম আধার:

আকাশের বুকে থাকা যে জোছনা পৃথিবীজুড়ে আলো ছড়ায়; দূর করে তাবৎ জগতের নিকষ কালো অন্ধকার, সেই জোছনাও একসময় ঢেকে যায় ঘন কালো মেঘে, ঢেকে যায় তার চারপাশের ঝলমলে তারাগুলোও। অথবা হারিয়ে যায় সেই জোছনা ও তারাগুলো ঘন কালো মেঘের গহ্বরে। তবে মেঘ কেটে গেলে, দূর্যোগের ঘনঘটা থেমে গেলে আবারও স্ব-মহিমায় যুগপৎ বেরিয়ে আসে জোছনা ও তার চারপাশের তারাগুলো। এমনটিই প্রকৃতির অমোঘ বিধান। কিন্তু অনেকটা বিপরীত মনে হলেও আরও অমোঘ যে সত্যটি আমাদের শিক্ষা দেয় তা হচ্ছে, আকাশের তারা সাময়িক লুকিয়ে থেকে প্রাকৃতিক নিয়মে একসময় বেরিয়ে এলেও পৃথিবী তথা জগত সংসারে বিচরণকারী তারারা একবার হারিয়ে গেলে তাদের আর ফিরে আসা হয় না। চূড়ান্ত দূর্যোগের পর তাদের আর স্ব-মহিমায় ভেসে উঠতেও দেখা যায় না। তারা পাড়ি জমান না ফেরার দেশে। তাদের প্রস্থান হয় চিরতরে। আর এ অমোঘ সত্যটি আজ আমার আত্মজ অনুভূিতকে মর্মে মর্মে ক্ষত-বিক্ষত করছে ‘তারা’ নামে এক স্বজনের বিয়োগ ব্যথায়।
হ্যা আমি তারা’র কথা বলছি। আমিনুল ইসলাম তারা’র কথা। শেরপুর শহরের প্রান্ত ঘেঁষে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো গড়ে উঠা ছায়া সুনিবিড় শান্ত পল্লী রামকৃষ্ণপুরের মধ্যবিত্ত কৃষক ও সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার থেকে নানা চড়াই-উৎরাইয়ে বেরিয়ে আসেন আমিনুল ইসলাম তারা। পিতা আব্দুল বছির সরকারের দীর্ঘ অসুস্থতায় সংসারে টানা-পোড়েনের মধ্যে অনেক কষ্টে নিজের চেষ্টায় তার শেরপুর উচ্চ বিদ্যালয় (বাগরাকসা) থেকে ১৯৮৭ সনে এসএসসি এবং পরবর্তীতে শেরপুর সরকারি কলেজ থেকে বি.কম ও টাঙ্গাইলের করোটিয়া সা’দত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স (এম.কম) পাস করার বিষয়টিই ছিল এক কঠিন বিজয় রেকর্ড।
পড়াশোনার পাঠ চুকানোর শেষ পর্যায়ে আমার ইমিডিয়েট ছোটবোন ফরিদা ইয়াছমিন স্বপ্নাকে বিয়ে করে তিনি আমার ভগ্নিপতির খাতায় নাম লেখালেও বয়সিক ও সহপাঠী সূত্রে বন্ধুর পাশাপাশি এক রক্তের সূত্রে ভাই ছিলেন। তারপরও বিয়েসূত্রে আমার প্রতি তার দেয়া সম্মানটা ছিল সবসময় আলাদা। শ্রেণিমত অন্যদের ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ছিল না।
১৯৯৭ সনের দিকে চাকরিতে ঢুকলেও ১৯৯২ সনের দিকে বিয়ের পর থেকে চলতি বছরের ২৬ জুন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কেবল শহরের উপকণ্ঠ দমদমা মহল্লাস্থ আমার বাড়ির পাশেই নয়, পরিবারের স্বজন হিসেবেই দেখেছি ও পেয়েছি তাকে। ভূমি অফিসের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তার (উপ-সহকারী ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা) মত একটি কঠিন ও ব্যস্ততম দায়িত্বের পরও একজন মানুষ কিভাবে পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও সমাজের প্রতিটি মানুষকে সন্তুষ্ট রাখতে পারেÑ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ছিলেন তারা। যে কারণে কেবল স্ত্রী ও ২ সন্তান অনার্স (বাংলা) তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত আরমিন আক্তার তিশা ও দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ফাহিম ফয়সল সিয়ামই (মিলেনিয়াম বয়) নয়, স্বজন, প্রতিবেশি ও সমাজের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা থেকে শুরু করে কর্মস্থলের প্রতিটি স্তরের প্রতিটি মানুষকেই তার প্রতি সন্তুষ্ট দেখা গেছে। ভদ্রতা, ন¤্রতা ও সদা হাস্যোজ্জ্বল মুখের কথা-বার্তা আর আচরণে তিনি মানুষের হৃদয় থেকে হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন। কর্মতৎপরতা ও দক্ষতার গুণে প্রতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিও তিনি পেয়েছিলেন। ২০১৬ সনে ঝিনাইগাতী উপজেলার নলকুড়া ও গৌরীপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কর্মরত থাকাবস্থায় রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘বিশেষ ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রশিণ কোর্স-২০১৬’ সফলভাবে শেষ করায় তাকে শেরপুর ও জামালপুর জেলার শ্রেষ্ঠ উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা হিসেবে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।
স্বাধীনচেতা ও প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার এ মানুষটি ছিলেন অধূমপায়ী। সেইসাথে তিনি ছিলেন যেমন পরিশ্রমী, তেমনি খোদাভীরু মানুষ। কঠিন ব্যস্ততার পরও তাকে এলাকার ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকা-েও দেখা গেছে। দমদমা মহল্লার ঐতিহ্যবাহী অনির্বাণ তরুণ সংঘের তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ও সাবেক সভাপতি। অনেক সমবয়সীর কাছে তিনি তারার বদৌলতে ‘স্টার’ ও জুনিয়রদের কাছে ‘স্টার ভাই’ বলেও সমধিক উচ্চারিত হতেন। সঙ্গত কারণে হয়তো ফুলপ্রিয় এ মানুষটির পরিপাটি বাসার দেয়ালে নিজের নাম না লেখার পরও ‘তারা’ খচিত কারুকাজই জানান দিতো তার পরিচয়। পরিবর্তিত অবস্থানের সুবাদে তিনি দমদমার ঐতিহ্যবাহী পুরাতন জামে মসজিদ ও দমদমা হাফেজিয়া মাদ্রাসার পাশাপাশি পৈত্রিক এলাকা রামকৃষ্ণপুরের পুরাতন মসজিদ ও পার্শ্ববর্তী ঐতিহ্যবাহী নিমতলা হাফেজিয়া মাদ্রাসার উন্নয়নেও কাজ করেছেন।
এ কর্মতৎপর ও সুস্থ-সবল মানুষটি প্রায় ১০ মাস আগে হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষায় শনাক্ত হয় তিনি দূরারোগ্য ব্যধি ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত। ওই সমস্যার কারণে মৃত্যুর প্রায় ৬ মাস আগেই ডান হাত-পা ও মাথার একাংশের অনুভূতি শক্তি হারান। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের পরিচালক প্রফেসর ডাঃ দীন মোহাম্মদের তত্ত্বাবধানে সফল অস্ত্রোপচার হলেও ধীরে ধীরে তিনি মৃত্যুর দিকে ধাবিত হন। চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহে চলে যায় সংসারের সঞ্চিত সমুদয় অর্থ। আর ওই কঠিন সময়টাতে পরিবারের একান্ত দু’চার জনের সাথে অকৃপণ সময় ব্যয় করেছেন তার অপর এক স্বজন-বন্ধু ডাঃ আনিসুর রহমান, যিনি এলাকায় বাবুল নামেই সমধিক পরিচিত। যা হোক, মানুষের আসা-যাওয়ার অমোঘ নিয়মের কোন ব্যত্যয় না ঘটিয়েই জগত সংসার থেকে তাকে বিদায় নিতে হয়েছে। তবে তার বিদায়টা অপরিণত ও অগোছালো সময়ে হয়েছে বলেই ব্যথাটা মুছবার নয়। অন্তত স্ত্রী ও ২ সন্তানকে তা হয়তো অনেকটা পথই বয়ে বেড়াতে হবে।
অপরিণত মৃত্যুর কারণে চাকরির পুরো সময়কালটা পর্যন্ত তিনি স্পর্শ করতে পারেননি। ২০ থেকে ২১ বছর কেটেছে চাকরিতে। তারপরও চাকরির সময়কাল ও মৃত্যু পরবর্তী সুবিধা যতটুকুই তার পরিবার-উত্তরাধিকারীগণ পাবেন, তা নিয়েই হয়তো কষ্টে চলতে হবে তাদের। এক্ষেত্রে প্রয়োজন জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতা ও আশু প্রয়োজনীয় সহায়তা।
শত ব্যস্ততার পরও স্ব-মহিমায় নিজেকে ‘তারা’র মতোই উজ্জ্বল করে গড়ে তুলেছিলেন যে আমিনুল ইসলাম তারাÑ তিনি জগত সংসার থেকে হারিয়ে গেলেও আকাশের তারার মাঝে মিশে থাকুন। আর প্রতিটি পরিবার ও সমাজে জন্ম হোক নতুন তারাদের এবং সেইসব অঙ্গন হয়ে উঠুক ‘তারার মেলা’Ñ তার সদ্য প্রস্থানে এ প্রত্যাশা।

লেখক:
সাংবাদিক, আইনজীবী ও রাজনীতিক, শেরপুর।

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের

error: Alert: কপি হবেনা যে !!