উন্নত হলেও মানবিক হয়নি কারাগারগুলো

কারাগারের ইতিহাস পাঠে জানা যায়, উপমহাদেশে ভারতের রাজা অশোকের সময়কাল থেকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রাপ্ত বন্দিকে ৩ দিন একটি কুঠুরিতে বেঁধে রাখা হতো।

এ ধরনের কয়েদখানার অস্তিত্ব জমিদারি ব্যবস্থাপনায়ও ছিল। তবে উপমহাদেশে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগমনের পর কারা ব্যবস্থাপনা নতুন আঙ্গিকে গঠিত হয়।

১৮১৮ সালে রাজবন্দিদের আটকার্থে বেঙ্গল অ্যাক্ট জারি করা হয়। বর্তমানে ঢাকা, রাজশাহী, যশোর, কুমিল্লা এবং কয়েকটি জেলা ও মহকুমা কারাগার ওই সময়ে নির্মিত হয় এবং ১৭৮৮ সালে একটি ক্রিমিনাল ওয়ার্ড নির্মাণের মধ্য দিয়ে ঢাকা কারাগারের নির্মাণ কাজ শুরু হয়।

১৮৬৪ সালে সব কারাগার পরিচালনা ব্যবস্থাপনার মধ্যে এক সমন্বিত কার্যক্রম প্রতিষ্ঠিত হয় ঈড়ফব ড়ভ জঁষবং চালুর মাধ্যমে।

১৯২৯ সালে অবিভক্ত বাংলার কলকাতার প্রেসিডেন্সি, আলীপুর, মেদিনিপুর এবং বাংলাদেশের ঢাকা ও রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার হিসেবে ঘোষিত হয়।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর ৪টি কেন্দ্রীয় কারাগার, ১৩টি জেলা কারাগার এবং ৪৩টি উপ-কারাগার নিয়ে বাংলাদেশ জেলের (BDJ) যাত্রা শুরু। পরবর্তীকালে ১৯৯৭ সালে বন্দিসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে উপ-কারাগারগুলোকে জেলা কারাগারে রূপান্তর করা হয়।

বর্তমানে ১৩টি কেন্দ্রীয় কারাগার এবং ৫৫টি জেলা কারাগার নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে বাংলাদেশ জেল (সূত্র : Bangladesh jail history)। বাংলাদেশ কারাগারের ভিশন হচ্ছে, ‘রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ’। এছাড়াও কারাগারের অন্যতম একটি লক্ষ্য হচ্ছে, বন্দিদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করা। কিন্তু জেলখানায় প্রায় ২ মাস অবস্থানকালে আমি বুঝতে পেরেছি- মানবিকতা এখনও যোজন যোজন দূরে? কারাগারগুলোর সুন্দর বা সুউচ্চ ভবন তৈরিসহ বাহ্যিক উন্নতি ঘটছে বটে, তবে মানবিকতার উন্নতি হয়নি।

জেলগেটে যাওয়ার পর ব্যক্তিগত তথ্য নেয়া শেষে গণনার জন্য ফাইলে বসতে হয় (হাঁটু গেড়ে ক্রীতদাসের মতো বসা), যা প্রায় ২০০ বছর আগে দাস প্রথার অনুসরণে করা হয়। গণনা শেষ করে কারাগারের ভেতরে প্রবেশের আগে সবার স্পর্শকাতর অঙ্গ হাতিয়ে চেক করা হয়।

তারপর আবার ফাইল (গণনা) করে ভেতরে প্রবেশ করানো হয়। ভেতরে প্রবেশ করিয়ে আবার ফাইল করা হয়; তারপর নিয়ে যাওয়া হয় আমদানিতে (যে ঘরে বন্দিদের প্রথম রাত কাটাতে হয়)।

সেখানে রুমে প্রবেশের আগে একবার ফাইল করা হয়, রুমে ঢুকিয়ে আবার ফাইল করা হয়। আমি নিশ্চিত, এরকম ঘন ঘন ফাইল করার উদ্দেশ্য একটাই- শুধু শুধু শাস্তি দেয়া। ভেতরে প্রবেশ করার পর বন্দিরা শতভাগ কারারক্ষীদের নিয়ন্ত্রণে এবং পর্যবেক্ষণে থাকার পরও এ ধরনের অমানবিক কাজ চলে।

আমদানি হল আরেক ভয়ংকর কক্ষ, যার আয়তন ৪৫০-৫৫০ বর্গফুট এবং যার নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে কয়েদিদের (সাজাপ্রাপ্ত আসামি) হাতে; যারা বন্দিদের ক্রীতদাস মনে করে এবং ফাইল করে বসিয়ে রাখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

ফাইলে বসে অনেকের খারাপ লাগলে বা হাত-পা ধরে এলে একটু দাঁড়ালে বা দাঁড়াতে চাইলে অকথ্য ভাষায় বকাবকি ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়।

প্রবেশকালীন সর্বাঙ্গ চেকের পর আমদানিতে আবারও বন্দিদের স্পর্শকাতর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চেক করা হয় এবং ভীতিমূলক আচরণ করা হয়, যাতে বন্দিরা ঘাবড়ে যায়।

সারা দিনের ধকল অর্থাৎ থানা থেকে গারদ, গারদ থেকে জেলখানা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় না খেয়ে থেকে শারীরিকভাবে খুব ক্লান্ত থাকে বন্দিরা। যেহেতু সঙ্গে কোনো খাবার নেয়ার ব্যবস্থা নেই, তাই বন্দিরা ক্ষুধার জ্বালায় তীর্থের কাকের মতো চেয়ে থাকে কয়েদিদের দিকে। কয়েদিরা তাদের ইচ্ছেমতো সময়ে জেল থেকে প্রদত্ত খিচুড়ি বন্দিদের খেতে দেয়; যাতে তেল, লবণ ও মসলা কিছুই নেই। এক প্লেটে দু’জন করে খেতে দেয়া হয়। তাছাড়া পানি পানের কোনো ব্যবস্থা নেই। কারও পানি পিপাসা লাগলে টয়লেটের পাশে থাকা কল বা ড্রাম থেকে হাতে-প্লেটে করে পানি খেতে হবে। সেখানে মগ বা গ্লাসের ব্যবস্থা নেই।

সবচেয়ে ভয়ংকর অমানবিকতা চোখে পড়ে ঘুমানোর সময়। ছোট্ট জায়গায় ১৫০-২৫০ বন্দি ঘুমাতে হয় এক কাত হয়ে, ঠেসে ঠেসে একজনের শরীরের সঙ্গে আরেকজনের শরীর জড়িয়ে। এক কাত হয়ে ঘুমাতে হয় বলে কেউ একে ইলিশ বা English ফাইল বলে।

এই ফাইলে ঘুমানোর সময় অনেকের শ্বাসকষ্ট হয়। তাছাড়া একজনের শরীরের ঘামে অন্যজনের শরীর ভিজে যায়। অথচ মাত্র ৩০০-৪০০ বর্গফুট জায়গা বাড়িয়ে দিয়ে এ সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।

এর মধ্যে যদি কারও মধ্যরাতে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে হয়, তবে সবাইকে মাড়িয়ে টয়লেটে যেতে হয়। ১৫০-২৫০ মানুষের জন্য টয়লেট আছে মাত্র ৪টি। রাত ৩টায় ঘুম থেকে উঠিয়ে নেয়া হয় Case Table-এ; যেখানে বন্দিদের সব তথ্য রাখা হয়। রাত ৩টা থেকে সকাল ৭-৮টা পর্যন্ত ফাইলে বসিয়ে রেখে সব তথ্য নেয়া হয়। ২০০ বছরের পুরনো এ পদ্ধতি বাদ দিয়ে জেলে প্রবেশের সময়ই বন্দিদের কাছ থেকে এসব তথ্য নেয়া যায়।

মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত এভাবে বন্দিরা অসহনীয় দুর্ভোগ সহ্য করে। পরবর্তী সময়ে আবার আমদানিতে ফিরে এসে খাবার অনুপযোগী ১টি আটার রুটি, যা খুবই শক্ত এবং অল্প একটু গুড় (বর্তমানে খিচুড়ি দেয়ার ব্যবস্থা চালু হয়েছে) খেয়ে আবার দীর্ঘ সময় অপেক্ষা।

এর মধ্যেই আমদানির বন্দিদের ৫০০-৭০০ টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন ওয়ার্ডের (বন্দিদের নির্দিষ্ট রুম) ইনচার্জদের কাছে বিক্রি করা হয়। বিক্রিকৃত মক্কেল (তাদের ভাষায়) বন্দি যে ওয়ার্ডে যাবে, তার ইনচার্জকে থাকার জন্য আলাদা সিটভাড়া প্রদান করতে হয়; তা না হলে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

সিট ভাড়া ও P.C-র খাবার ওয়ার্ড ইনচার্জের সঙ্গে সাপ্তাহিক চুক্তিতে করা হয়। P.C-কে কেউ বলেন Personal Cash, আবার কেউ বলে Prisoners Canteen. যাই হোক, P.C- র খাবারগুলো মন্দের ভালো; কিন্তু দাম তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। দুপুরে শুধু ডাল-ভাত দেয়া হয়, ডালে কোনো ধরনের তেল বা মসলা ব্যবহার করা হয় না, হলেও নামমাত্র।

অথচ প্রত্যেক বন্দির জন্য যথেষ্ট পরিমাণ তেল-মসলা বরাদ্দ দেয়া আছে জেল কোড অনুসারে। বন্দিদের জন্য প্রতিদিন বরাদ্দ ডাল ১৪৫ গ্রাম, মসলা ১৫ গ্রাম, সবজি ২৯১ গ্রাম, ভোজ্যতেল ৪১ গ্রাম, মাছ ৭২.৯০ গ্রাম, খাসির মাংস ৭২.৯০ গ্রাম এবং গরুর গোশত ৭৭.৫৬ গ্রাম। বরাদ্দকৃত খাদ্যের তিন ভাগের এক ভাগও পায় না বন্দিরা।

কারাগারের সবচেয়ে অমানবিক যে বিষয়টি আমি পর্যবেক্ষণ করেছি তা হল, কারাগারে প্রবেশের পর বন্দিরা আশপাশের বন্দিদের সঙ্গে যখন একটি সৌহার্দ্যরে পরিবেশ তৈরি হয়; তখনই জেল কর্তৃপক্ষ তাকে চালান (অন্য কারাগারে প্রেরণ) করার জন্য প্রস্তুত করে; অর্থাৎ একসঙ্গে ৩০০-৪০০ জনের চালান তালিকা প্রস্তুত করে থাকে।

এর মধ্যে খুবই দরিদ্র শ্রেণি বাদে বাকি সবাইকে এককালীন নগদ ৩-৪ হাজার টাকা প্রদান করে চালান ঠেকাতে হয়। জেলে প্রতি পদে পদে টাকার প্রয়োজন।

এমনিতেই উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে সে নিজেই বন্দি থাকায় উপার্জন বন্ধ। তার ওপর পুলিশ ও উকিলকে টাকা দিতে দিতে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে যায় তার পরিবার।

আমার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জেলখানার প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ বন্দি নিরপরাধ অথবা মিথ্যা মামলার আসামি; যারা হয়তো বা প্রতিবাদী কিংবা দুঃসাহসী, নির্ভীক ও কিছুটা বেপরোয়া বা ডানপিঠে হওয়ার জেরে খুবই ছোটখাটো কোনো কারণে কারাবন্দি হয়ে আছে। তাদের সংশোধন না করে শোষণ করা হচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

আমরা যদি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের দিকে তাকাই, তবে দেখতে পাই- পরিবারের সবচেয়ে মেধাবী ছেলেমেয়ের পাশাপাশি ডানপিঠে, দুরন্ত প্রকৃতির ছেলেমেয়েরা দেশের জন্য নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিয়েছে আনন্দ চিত্তে।

তাই কারাগারের বন্দিদের অবহেলা না করে তারা যাতে আলোর পথ দেখতে পায় অর্থাৎ কারাগার যাতে শোষণাগার না হয়ে সংশোধনাগার হয় সে ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হবে।

সুত্র:- যুগান্তর।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।