ইসলামের দৃষ্টিতে মহামারির কারণ ও করণীয়

মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা মানবজাতি সৃষ্টি করে আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে ভূষিত করেছেন।

আর এ সৃষ্টির সেরা জীব যদি তার আসল মালিককে ভুলে যায় এবং তাঁর আদেশ-নিষেধ অমান্য করে, তাহলে তার মালিক তার প্রতি শুধু অসন্তুষ্টই হন না, বরং তাকে শাস্তি দিতে বাধ্য হন।

তবে আল্লাহ তায়ালা যেহেতু অতিশয় মেহেরবান ও দয়ালু, তাই তিনি তাত্ক্ষণিক শাস্তি প্রয়োগ করেন না।

তিনি অবকাশ দেন, বারবার সুযোগ দেন। তা ছাড়া আমাদের প্রিয় নবী (সা.) আল্লাহ তায়ালার কাছে এ দোয়া করেছিলেন যে তাঁর উম্মতকে যেন আগেকার উম্মতের মতো শাস্তি তথা মানবাকৃতিকে বানর, শূকর ইত্যাদির আকৃতিতে রূপান্তর, পাথরের বৃষ্টি, ভূমি উল্টিয়ে দেয়ার মতো কঠিন প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিনষ্ট করা না হয়।

মহামারির কারণ:

মানুষ পাপ করতে করতে যখন পাপের সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখনই আল্লাহর শাস্তি নাজিল হয়। পাপিষ্ঠ ফেরাউনকে আল্লাহ তায়ালা তখনই ধরেছেন, যখন সে নিজেকে আল্লাহ বলে দাবি করেছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন : ‘হে মুসা! তুমি ফেরাউনের কাছে যাও, সে অত্যন্ত উদ্ধত হয়ে গেছে।’ (সূরা: ত্বাহা, আয়াত ২৪)।

নমরুদকে আল্লাহ তায়ালা তখনই শাস্তি দিয়েছেন, যখন সে নিজেকে প্রভু বলে দাবি করেছে। অনুরূপভাবে আদ, সামুদ প্রভৃতি জাতিকে তাদের সীমাহীন পাপাচারের কারণে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।

বনি ইসরাইলরা আল্লাহর কিতাব তাওরাতকে অস্বীকার, উত্তম জিনিস তথা মান্না ও সালওয়ার পরিবর্তে খারাপ জিনিস তথা ভূমির উৎপন্ন জিনিস চাওয়া, আমালেকা সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আল্লাহর অগণিত নিয়ামত ভোগ করেও অকৃতজ্ঞ হওয়ার কারণে চির লাঞ্ছনা ও আল্লাহর ক্রোধে পতিত হয়েছে।

আগের নবীদের এসব কাহিনী পবিত্র কোরআনে আলোচনা করে আল্লাহ তায়ালা এটিই বোঝাতে চেয়েছেন যে, যদি উম্মতে মুহাম্মদী (সা.)ও তাদের মতো পাপাচারে লিপ্ত হয়, তবে তাদের পরিণতিও অনুরূপ হবে এবং একই ভাগ্য বরণ করতে হবে।

মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা বলেন,

ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ

‘স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা ফিরে আসে।’ (সূরা: রূম, পারা: ৩০, আয়াত: ৪১)।

قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِن قَبْلُ كَانَ أَكْثَرُهُم مُّشْرِكِينَ

‘বলুন, তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর এবং দেখ তোমাদের পুর্ববর্তীদের পরিণাম কি হয়েছে। তাদের অধিকাংশই ছিল মুশরিক।’ (সূরা: রূম, পারা: ৩০, আয়াত: ৪২)।

হাদিস শরিফে প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :

…لَمْ تَظْهَرْ الْفَاحِشَةُ فِي قَوْمٍ قَطُّ حَتَّى يُعْلِنُوا بِهَا إِلَّا فَشَا فِيهِمْ الطَّاعُونُ وَالْأَوْجَاعُ الَّتِي لَمْ تَكُنْ مَضَتْ فِي أَسْلَافِهِمْ

‘…যখন কোনো কওমের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা তা প্রকাশ্যেও করতে শুরু করে তবে তাদের মাঝে দুর্ভিক্ষ ও মহামারি ব্যাপক আকার ধারণ করে, যা তাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে ছিল না।’ (ইবনু মাজাহ, আসসুনান : ৪০১৯)।

করণীয়:

(১) হাদিসে বর্ণিত মহামাারির কারণগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো প্রতিকারের চেষ্টা চালানো। উপরোক্ত হাদিসে অশ্লীলতার ব্যাপক সয়লাব হওয়াকে মহামারির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং শুধু চীনই নয়, অশ্লীলতায় সয়লাব হয়ে যাওয়া প্রতিটি দেশ ও জাতির সচেতন হওয়ার সময় এসেছে।

(২) বেশি বেশি তাওবা ও ইস্তিগফার করা। কারণ তাওবা বালা-মুসিবত দূর করে দেয়।

(৩) মহামারি কবলিত ভূমিতে অবস্থা করলে সেখান থেকে বের হওয়া যাবে না, বরং সবর করতে হবে। কারণ সবাই যদি মহামারি কবলিত এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়, তাহলে আক্রান্তদের সেবাযত্ন করার কেউ থাকবে না। তাই ব্যাপকভাবে নিজ পরিবার-পরিজন ও সমাজের মানুষদের ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া উচিত নয়। তবে অবশ্যই পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

(৪) আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে এবং আল্লাহ যে তাদের শহীদের সওয়াব দান করবেন সে ব্যাপারে আশা রাখতে হবে।

(৫) যদি মহামারি এলাকা থেকে দূরে থাকে তবে মহামারি এলাকার আশেপাশে যাবে না।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।