ইতিহাস এমনও হয়!

নিচু অঞ্চল গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া। ঝোপ-ঝাড় আর ডোবা-নালা ছাড়া কী-ই বা ছিল তখন? অন্য অঞ্চলের মানুষ অনেকটা তাচ্ছিল্যই করতো টুঙ্গিপাড়াকে। সেই গ্রাম ইতিহাসে অন্যন্য হয়ে উঠবে; ভেবেছিল কেউ?

স্বয়ং শেখ লুত্ফর রহমান অথবা মা শাহেদা বেগম কি ভেবেছিলেন; তাদের ঘরেই জন্ম নিবেন ইতিহাস রচয়িতা? হয়তো ভেবেছিলেন। এমন সন্তানের জন্ম যাদের ঘরে সৃষ্টিকর্তাও নিশ্চয় তাদের পক্ষেই থাকেন। আগ থেকে বুঝিয়ে দেন অনেক কিছুই। হয়তো এজন্যই দুরন্ত খোকাকে কখনো আটকাননি বাবা শেখ লুত্ফর রহমান। আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথাই বলছি। যাকে জন্ম দিয়ে ইতিহাসে স্থায়ী জয়গা করে নিয়েছে গোপালগঞ্জ। যার নামে উল্টাতে হয় ইতিহাসের শত শত পাতা। কারণ, বঙ্গবন্ধু এক মূর্তিমান ইতিহাস, গৌরবের ইতিহাস, প্রাণের ইতিহাস।
যার মহত্ম ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে হিমালয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন কিউবার জননেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রো।তিনি বলেছিলেন, ‘আই হ্যাভ নট সিন দ্য হিমালয়াস। বাট আই হ্যাভ সিন শেখ মুজিব। ইন পারসোনালিটি অ্যান্ড ইন কারেজ, দিস ম্যান ইস দ্য হিমালয়াস। আই হ্যাভ দাজ হ্যাড দি এক্সপেরিয়েন্স অব উইটনেসিং দ্য হিমালয়াস।’

ক্যাস্ত্রোর এই মন্তব্যের বাংলা প্রতিরূপ হলো, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, তবে আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসে এ মানুষটি হিমালয়ের সমতুল্য আর এভাবেই আমি হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতা লাভ করেছি।’

বাঙালি যাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দিল; যাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ হিসেবে আপামর মানুষের মণিকোঠায় দেয়া হলো স্থান তাকে কেন ক্যাস্ত্রো হিমালয়ের সঙ্গে তুলনা করলেন?
আমরা জানি, আজকের যে হিমালয়, পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট যেখানে অবস্থিত, সেই স্থানটিও এক সময় সমতল ছিল। এবং হাজার লক্ষ কোটি বছর আগে সেখানে ছিল গভীর সমুদ্র। পৃথিবীপৃষ্ঠে কোনো এক সময় বড় রকমের একটি ভূমিকম্প হয় এবং সেই ভূমিকম্প থেকেই আজকের হিমালয় উত্থিত হয়, সৃষ্ট হয় মাউন্ট এভারেস্ট।

বঙ্গবন্ধুও ঠিক হিমালয়ের মতো উত্থিত হন বাঙালি জাতির বুকে। হাজার বছরের বাঙালি জাতির স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বেও যে আকাঙ্ক্ষা তার পূর্ণরূপ পায় বঙ্গবন্ধুর সাহস ও নেতৃত্ব গুণে।

১৯৪৭ থেকে ৭১ পর্যন্ত সময়কালে আমরা পেয়েছি অনেক নেতাকেই। তাদের অবদানও হয়তো কোনো অংশে কম নয়, কিন্তু সব কিছু ছাড়িয়ে জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও ভালোবাসার কেন্দ্র হয়ে ওঠা, জনগণের পাশে থেকে জনমানুষের নেতা হয়ে ওঠার বিরল গুণাবলি ছিল তার মধ্যে। জনগণের ভাবনা, চেতনা, স্বপ্ন, অভিলক্ষ, প্রত্যাশা সব কিছু তিনি ধারণ করতে পেরেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু জন্মেছিলেন ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ। তখন ব্রিটিশের শাসন চলছে এই উপমহাদেশে। বঙ্গবন্ধু ব্রিটিশদের সেই বঞ্চনাকে উপলব্ধি করেছিলেন মর্মে মর্মে। এ কারণে ছাত্রাবস্থাতেই তিনি যুক্ত হয়েছিলেন রাজনীতির সঙ্গে।

বঙ্গবন্ধুর জীবনপর্ব যদি আমরা অবলোকন করি তাহলে দেখব, তিনি আগাগোড়াই ছিলেন আপসহীন এবং দেশ ও জনগণের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ। তার আপসহীন সত্তার কারণেই সম্ভব হয়েছে অজেয়কে জয় করা।

তার সম্পর্কে ড. কামাল হোসেনের একটি মন্তব্য স্মরণ করা যেতে পারে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের প্রারম্ভিকলগ্নে একটা অভিজ্ঞতার উদাহরণ টেনে তিনি বলেছিলেন, বলা হতো অসম্ভবকে সম্ভব করা হলো, সেটা বঙ্গবন্ধু করেছেন। এবং আমার মনে আছে কিসিঞ্জার উনাকে যে ট্রিবিউটটা দেন, ‘ইউ হ্যাভ ডিফাইড হিস্ট্রি।’ আমাদের ইতিহাসসেবীদের দৃঢ়বিশ্বাস ছিল এভাবে একটি রাষ্ট্র ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠা হতে পারে না, কিন্তু তোমরা করে ফেললে।’

যা হওয়ার নয়, যা অসম্ভব, যা সমীকরণে মেলে না, যা অসাধ্য তার সবটাই যেন ধরা দিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের কাছে। বঙ্গবন্ধুকে বিবিসি বাংলার জরিপে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বলা হয়েছিল। এই জরিপেও প্রতীয়মান হয় তিনি বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। এই যে হয়ে ওঠা, মানুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলন সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এসবের জন্য যে বিরল গুণ থাকা দরকার তা বঙ্গবন্ধুর মধ্যে ছিল।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যে নাম শুনলেই ভেসে ওঠে সেই ছবিটি, যেখানে একটি লোক জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে তর্জনী তুলে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছেন। যে ভাষণে স্বাধীনতার ডাক পেয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সর্বস্তরের বাঙালি। সেদিনের সে ভাষণে জেগে উঠেছিল তরুণ সমাজ। তরুণদের শক্তি একত্রিত হয়ে পাকিস্তানি হানাদারের বিরুদ্ধে কাজ করেছিল বুলডুজার হিসেবে।

বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। যিনি চিরভাস্বর হয়ে আছেন বর্তমান প্রজন্মের কাছে। আজীবন অসামপ্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন বলেই সারাটা জীবন সামপ্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু আজ আমাদের মাঝে নেই। তবু মনে হয় আজ যদি তিনি থাকতেন, অনেক কিছুই অন্যরকম হতে পারত। আজ ২০১৯ সালেও তিনি সমান প্রাসঙ্গিক। তার লালিত জাতীয়তাবাদের ভিত্তির উপরেই দাঁড়িয়ে আছে গোটা বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর অবদানকে তরুণ প্রজন্ম সবসময় স্মরণ করে শ্রদ্ধাভরে। পালন করে তার আদর্শ।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।