You dont have javascript enabled! Please download Google Chrome!

আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে

মহান সৃষ্টিকর্তার বিশেষ অনুগ্রহ সন্তান-সন্ততি। নারী জনমের পূর্ণতা ও পারিবারিক পরিমণ্ডলে মায়া-মমতার কোমল পরশ নিয়ে একটি শিশু জানান দেয় তার আগমনীবার্তা। নবজাতকের প্রত্যাশায় পারিবারিক আবহে দোলা দিয়ে যায় অপেক্ষার প্রহর- সবার মনে থাকে একটি সুস্থ-সুন্দর শিশুর আকাঙ্ক্ষা।

নবজাতকের মাধ্যমেই মানব বংশ এগিয়ে যায় যুগ-যুগান্তরের পথচলায় শতাব্দী থেকে সহস্রাব্দে। মহান সৃষ্টিকর্তার বিশেষ অনুগ্রহ সন্তানাদির জন্ম প্রক্রিয়া থেমে গেলে তো মানুষ ও মানবতা বিলুপ্তির অন্ধকারে হারিয়ে যেত।

একটি শিশু জন্ম নিলে তাকে নিয়ে নতুন করে ভাবনা শুর হয় তার পরিবারের। তার ব্যপারে সকাল সন্ধ্যা ভাবতে ভাবতেই দিন কাটে পরিবারের। ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে মায়ের ভালোবাসার আর বাবার স্নেহের শিশুটি। কোল ছেড়ে হাঁটা শুরু করলে মায়ের চিন্তার অন্ত থাকে না। কোথায় যাচ্ছে, কিভাবে যাচ্ছে, আছাড় খাচ্ছে না তো- অথচ ছোট শিশুটির গন্ডি কিন্ত শুধুই ঘরের মেঝে।

শিশুটি জানালা দিয়ে বাইরে বের হতে থাকলে আমাদের ভেতর নিরাপত্তাহীনতা জাগে। তার কাছে নিয়ে যায় আমাদের সঞ্চিত সকল ভীতি। তাকে লিখিত বই দিয়ে বলি বনের ভেতর ছিলো বাঘ। সে হাসে। তাকে লিখিত বই দিয়ে বলি আকাশের ভেতর ছিলো বিদ্যুৎ। সে হাসে। তাকে লিখিত বই দিয়ে বলি জলের ভেতর ছিলো কুমির। সে হাসে।

তখন আমরা বুঝি বইয়ের ভেতর সে এখনো প্রবেশ করেনি। বইয়ের ভেতর তাকে প্রবেশ না করালে চলবে কেনো। আমরা বই আনি বাজার থেকে। আমরা ভয় আমদানি করি নানা জায়গা থেকে যাতে আমাদের শিশুটি জানালা বন্ধ করা শিখে ফেলে। ভয়ের বর্ণমালা, জানালা বন্ধ করার বর্ণমালা যেনো সে শেখে তাড়াতাড়ি। আমরা এই প্রার্থনা করতে থাকি।

আমরা লোভ করি আমাদের সন্তানের জন্য। আমরা লোভ করি আমাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিন্তির জন্য। নিজস্ব মৃত্যুর আগে আমরা আমাদের সন্তানের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে চাই শুধু, আর কিছু চাই না। আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে, অন্যের সন্তানগুলো বড্ড হাভাতে, ওরা মরুক পচুক… শুধু আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।

আর সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ নিশ্চিন্ত রাখতে আমাদের অনেক অনেক টাকা প্রয়োজন হয়। তাই আমরা অধিক মুনাফার লোভে মাছে ফলে ফর্মালিন মেশাই, উপরির লোভে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে দেই, বৃক্ষ কেটে বিরাণ করি পৃথিবী, পাথর তুলে নদী মারি, রাসায়নিক মিশিয়ে নদী মারি, খাল বিল দখল করি, অন্যের জমি দখল করি, দুর্বল ভবন নির্মাণ করি, দুর্ঘটনাপ্রবন সড়ক আর সেতু নির্মাণ করি… নিজ নিজ সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রয়োজনে আমরা সবকিছু করতে পারি। হ্যাঁ, সবকিছু করতে পারি আমরা। পুরো পৃথিবী ধ্বংশ হয়ে যাক, অন্যের সন্তানেরা মরে ক্ষয়ে যাক, শুধু আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে। আমরা তাকে আগলে রাখি সযতনে।

আমার সন্তান যে ভবিষ্যতে বাঁচবে, সেই ভবিষ্যতে শুধু ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স আর পর্যাপ্ত জমি গাড়ি থাকলেই চলবে। আমার সন্তানের ভবিষ্যতে নিরাপদ পৃথিবী লাগবে না, প্রকৃতি পরিবেশ লাগবে না, বিশ্বস্ত বন্ধু লাগবে না, সুহৃদ স্বজন লাগবে না, ভালোবাসার সঙ্গী লাগবে না, নিরাপদ খাদ্য লাগবে না, প্রকৃত শিক্ষা লাগবে না, বনে পশু পক্ষী কিছুই লাগবে না, বিশ্বাস করুন কিচ্ছু লাগবে না… এমনকি আমার সন্তানের সেই সাদ্দাতের বেহেশতসম ভবিষ্যত পৃথিবীতে কোনো মানুষও লাগবে না… আমাদের শুধু একটাই একমাত্র চাওয়া… “শুধু আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে”।

অথচ এটা কখনো ভাবি না যে, যেই নবজাতকের কাছে আমার অঙ্গিকার ছিলো, এই বিশ্ব আমি তার জন্য করে যাবো বাসযোগ্য। সেটা ভুলে স্বার্থপরের মতো, আমরা নিজেদের সন্তানের কথাই শুধু ভাবি।

কিন্তু একটা সময় দুধে-ভাতে থাকা আমার সন্তান আমার চোখের সামনেই বেড়ে ওঠে। বড় হয়ে যায়, অনেক বড়। আমার সন্তান হয়ে ওঠে ঐশি। আমার সন্তান হয়ে ওঠে শহরের ত্রাস, জঙ্গী, মাদক ব্যবসায়ী আর দেশদ্রোহী। কখন যে বুকের ভেতরের স্বপ্নটা দুঃস্বপ্নে রুপান্তরিত হয়, বুঝতেই পারি না। আমার সন্তান মাদকের টাকার জন্য আমার গলায় ধরে ছুরি, পাশের ফ্ল্যাটে করে ডাকাতি।

একদিন সকালে পত্রিকার পাতা খুলে দেখি ফ্রন্ট পেজে আমার সন্তানকে ইভটিজিং এর দায়ে কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। আরেকদিন হঠাৎ টিভি নিউজে দেখি জঙ্গি সংগঠনে জড়িত থাকার অভিযোগে আমার সন্তানকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গ্রেপ্তার করেছে।

থামুন! অসহ্য হয়ে গেছেন তাই নাহ ? অনেক পড়েছেন, চোখটা বন্ধ করুন। কল্পনা করুন, যেই সন্তানের জন্য এত কিছু করলেন, সেই সন্তান আজ আপনার আর আপনার বংশের মুখে চুনকালি দিয়ে এখন পুলিশ হেফাজতে বা ক্রস ফায়ারে নিহত!

ভাবা যায়, এসব কথা ? একজন বাবা অথবা মা হিসেবে কখনোই এসব ভাবতে পারছেন না নিশ্চয়।

আসুন অন্য ভাবে কল্পনা করি, পারিবারিক দায়বদ্ধতার পাশাপাশি জঙ্গিবাদের উত্থানের পেছনে বিশ্লেষকরা ভগ্ন পরিবার, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত আসক্তি, মাদকাসক্তির ব্যাপকতা, পারিবারিক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অসামঞ্জস্যতার কারণে হতাশা, মহতী আদর্শের অনুপস্থিতি, সামাজিক বিশৃংখলা, সুস্থ বিনোদনের অভাব, ধর্মের অপব্যাখ্যাকে দায়ী করেছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পরিবারকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। সন্তানের সুন্দর আগামীই প্রত্যেক পিতামাতার কাম্য।

অন্নদামঙ্গল কাব্যের কবি ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর যেমন বলেছেন, “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে” সেটাই যদি অভিভাবকের অভিপ্রায় হয়, তাহলে- ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে পারিবারিক বেষ্টনীর মধ্যে শাসন ও সোহাগে বড় করতে হবে। পরিবারের সদস্যদের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য, ধর্মীয় অনুশাসন মানাসহ ভবিষ্যৎ জীবনের প্রাথমিক শিক্ষাটা পরিবার থেকেই দিতে হবে।

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের

error: Alert: কপি হবেনা যে !!