আমরা কী খাচ্ছি!

খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল নিয়ে এ দেশে নতুন আলোচনার অবকাশ খুবই কম। বরং ভেজাল থেকে কী করে নিস্তার পাওয়া সম্ভব, সে বিষয়ে উৎকণ্ঠাই এখন বেশি। তরিতরকারি, মাছ-মাংস, ফলমূল, প্রস্তুতকৃত খাবার বা পানীয়, দুধ—সব কিছুতেই ভেজাল। শিশুখাদ্যও ভেজালমুক্ত নয়। রাসায়নিকের ব্যবহার এবং বালু-কাঁকর মেশানোর কারণে চাল-ডালেও ভেজাল। আগে তো ভেজালমুক্ত হওয়া, পরে খাদ্যপণ্যের মান নিয়ে কথা। বাজারে লভ্য পাস্তুরিত দুধের মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সেসব আবার নামি প্রস্তুতকারক কম্পানিগুলো উৎপাদন করছে। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিজ রিসার্চ, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) গবেষণাপত্রপ্রসূত প্রতিবেদন এরই মধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, বাজারে লভ্য পাস্তুরিত দুধের ৭৫ শতাংশেই ভেজাল রয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ।

আইসিডিডিআরবির প্রতিবেদনটি যুক্ত করে একটি রিট করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী। রিটের ভিত্তিতে আদালত গত বছরের ২১ মে বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের নিয়ে কমিটি করে বাজারে থাকা পাস্তুরিত দুধ পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দিতে বলেছিলেন খাদ্যসচিব ও স্বাস্থ্যসচিব এবং বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালককে। গত মঙ্গলবার বিএসটিআই প্রতিবেদন দাখিল করে। তাতে ১৪টি কম্পানির দুধ পরীক্ষার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই) বলেছে, এসব দুধের নমুনায় আশঙ্কাজনক বা ক্ষতিকর কিছু পাওয়া যায়নি।

বিএসটিআইয়ের প্রতিবেদনের যথার্থতা নিরূপণ এবং করণীয় নির্ধারণের বিষয়টি এখন আদালতের হাতে। কিন্তু বাজারে লভ্য দুধ ও অন্যান্য পণ্যের মান নিয়ে এখনো প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদ ও বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টারের পরীক্ষায় বাজারে লভ্য নামি সাত ব্র্যান্ডের পাস্তুরিত দুধে মাত্রাতিরিক্ত কলিফর্ম ও অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে, যা ক্ষতিকর। ঘি, ফ্রুট ড্রিংক, গুঁড়া মসলা, ভোজ্য তেলসহ অন্তত আটটি পণ্যে ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেছে। বাজারে লভ্য সাতটি পাস্তুরিত ও তিনটি অপাস্তুরিত দুধের নমুনা বিএসটিআই স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়। কোনোটিতে কাঙ্ক্ষিত মাত্রার ‘সলিডস নট ফ্যাট’ পাওয়া যায়নি। বিএসটিআই স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী দুধে ‘ফ্যাট ইন মিল্ক’ ৩.৫ শতাংশ থাকার কথা। কিন্তু নমুনায় আছে ৩.৬ থেকে ৩.৬১ শতাংশ। এগুলোতে প্রচুর পরিমাণ অ্যান্টিবায়োটিক রয়েছে, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। ফরমালিন ও ডিটারজেন্টের উপস্থিতিও রয়েছে। প্রচলিত ১১টি ফ্রুট ড্রিংকসের সবগুলোতে ক্ষতিকর বিবেচনায় নিষিদ্ধ সাইক্লামেট রয়েছে। প্লাস্টিক ব্যাগে বাজারজাত মরিচ ও হলুদের গুঁড়ায় অতিরিক্ত জলীয় পদার্থ রয়েছে। হলুদে রয়েছে ‘মেটানিল ইয়েলো’ নামের কাপড়ের রং। ছয় কম্পানির ঘি ও ১০ কম্পানির সরিষা বা সয়াবিন তেল মানোত্তীর্ণ নয়।

খাদ্যপণ্যে ভেজাল বা মানহীনতা কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা সহজেই অনুমেয়। ভোক্তারা তা ভালো করেই জানে। এমন অবস্থা কিছুতেই কাম্য নয়। নামি কম্পানির খাদ্যপণ্যও যদি মানহীন ও ভেজাল হয়, তাহলে মানুষের ভরসার আর জায়গা থাকে না। আমরা আশা করি, জনস্বাস্থ্যের কথা ভেবে সরকার দ্রুত পরিত্রাণের ব্যবস্থা করবে।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।