আধূনিক যুগেও শেরপুরে পাহাড়িদের ভরসা সনাতনি ‘কূয়া’

পানির অপর নাম জীবন। আর এই পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য পৃথিবীর শুরু থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ নানা ধরণের পদ্ধতি অবিস্কার করে চলেছে। তার মধ্যে ইন্দারা বা কূয়া অন্যতম। কিন্তু বর্তমানে টিউবওয়েল, গভীর নলকূপ, বিদ্যুৎচালিত মটর ইত্যাদি ব্যবহার করে মানুষ খাবার পানি সংগ্রহ করলেও প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদে এখনও কূয়ার ব্যবহার হচ্ছে।

বিশেষ করে শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় এলাকার প্রায় অর্ধ শত গ্রামে স্থানীয় আদিবাসী ও বাঙালী পরিবারের সদস্যরা এ কূয়ার পানিতেই খাবার পানি এবং গোসল থেকে শুরু করে গৃহস্থলি সকল কাজে ব্যবহার করে আসছে। উল্লেখিত গ্রামগুলের পাহাড়ি এলাকায় মাটির নিচে প্রচুর পরিমানের পাথর থাকার কারণে সেখানে কোন টিউবওয়েল স্থাপন সম্ভব নয়। সরকারী ভাবে সামান্য কিছু রিংওয়েল ও গভীর নলকূপ বসানো হলেও তা খুবই অপ্রতুল। ফলে গ্রামবাসীর একমাত্র ভরসা এসব কূয়া।

জানাগেছে, শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী নালিতাবাড়ি, ঝিনাইগাতি ও শ্রীবর্দী উপজেলার গারো পাহাড় এলাকা ঘেষা গ্রামগুলোতে শত শত বছর ধরে খাবার পানিসহ গৃহস্থলি সকল কাজে পানির একমাত্র উৎস হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসেছ কূয়া বা ইন্দারা। যাদিও এক সময় ওইসব পাহাড়ি জনপদে পাহাড়ি ঝড়না বা ছড়া থেকেও খাবার পানিসহ অন্যান্য কাজে পানি ব্যবহার করতো স্থানীয়রা। কিন্তু বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পাহাড়ের সে ঝর্না বা ছড়া শুকিয়ে গেছে। কেবলমাত্র বর্ষার সময় এখানে পানির প্রবাহ থাকলেও পরিবর্তিত পরিবেশের কারণে খাবার উপযোগী না থাকার কারণে সে পানিও এখন আর কেউ ব্যবহার করে না। তাই প্রত্যন্ত আদিবাসী পল্লীগুলোতে এখন একমাত্র কূয়ার পানি পান করে আসছে যুগের পর যুগ ধরে।

ভুক্তভোগি পাহাড়িরা জানায়, বর্ষায় ওইসব কূপ পানিতে তলিয়ে গেলে পাহাড়ি পথ বেয়ে দুর দুরান্ত থেকে যেসব স্থানে নলকূপ আছে সেসব বাড়িতে গিয়ে পানি আনতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে অসচেতনরা বর্ষায় ওই কুয়ার পানি খেয়ে ডায়রিয়া, পেটের পীড়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়। তবে সচেতনরা ওই পানি ফুটিয়ে ব্যবহার করে থাকে।

এদিকে চৈত্র-বৈশাখ মাসের খড়ানের সময় এ কুয়ার পানিও অনেক কমে যায়। ফলে পাহাড়িদের ভোগান্তির শেষ থাকে না। এসব নলকূপের পানি খোলাস্থানে হলেও কেউ কেউ কূপের উপর ছাউনি দিয়ে রাখে যেন পানিতে কোন রকম ময়লা না পড়ে। আবার অনেক কূপের উপর কোন রকমের ছাউনি বা ঢাকনা ব্যবহার করা হয় না। তারপরও এসব কূপের পানি খেয়ে পাহাড়িদের কোন রকম অসুখবিসুখ হয়না বলে জানালেন তারা।

ঝিনাইগাতি উপজেলার নকসি কোচ পাড়া গ্রামের আদিবাসী কোচ নেতা যুগল কোচ বলেন, পাহাড়ি এলাকায় মাটির নিচে প্রচুর পাথর থাকায় গভির নলকুপ ছাড়া পানি উঠানো সম্ভব নয়। আর এ গভির নলকুপ বসাতে যে খরচ হয় তাতে হত দরিদ্র পাহাড়িদের পক্ষে নলকুপ বসানোও সম্ভব নয়। ফলে পহাড়িদের বাধ্য হয়েই ওই নলকুপের পানি খেতে হয়। আমাদের দাবী সরকারী ভাবে এসব কূপের আর্সেনিক পরীক্ষা করাসহ গভির নলকূপের ব্যবস্থা করা হলে দরিদ্র পাহাড়িদের ভোগান্তি কমতো।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের উপ সহকারী প্রকৌশলী মো. মানিরুজ্জামান জানায়, জেলার সীমান্তবর্তী তিন উপজেলার পাহাড়ি জনপদে বর্তমানে ৩৭ টি রিং ওয়েল টিউবওয়েল রয়েছে এবং আরো ৩০ টির বরাদ্দ হয়েছে। এছাড়া সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় ৬৪০ টি পানির উৎস বের করা হয়েছে। এসব স্থানে গভীর নলকূপ, তারা গভীর নলকূপ, অগভীর নলকূপ এবং রিং ওয়েল পাম্প এর মাধ্যমে পানির সংস্থাপন করা হবে।

সর্বশেষ অগ্রাধিকার মূলক গ্রমীন পানি সরবরাহের আওতায় ৮৬৬ টি নলকূপের বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এসবের পাশপাশি ঝিনাইগাতি উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টি’র পানি ধরে রেখে ‘রেইন ওয়াটার হার্ভেষ্টার’ প্রকল্পের কাজ চলছে। এসব নলকূপের কাজ শেষ হলে হত দরিদ্র এবং সীমান্তের পাহাড়ি এলাকার মানুষের জন্য পানির সমস্যা আর থাকবে না।

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের