আজো রহস্যাবৃত আব্রাহাম লিঙ্কনের জীবনের যে দিকটি

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ষোড়শ প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন। তাকে নিয়ে এখন পর্যন্ত এত এত গবেষণা হয়েছে, বইপত্র প্রকাশিত হয়েছে এবং চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে যে, তার ব্যাপারে অজানা বিষয় খুব কমই আছে। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও পরিচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবেও তাকেই বিবেচনা করে থাকে অনেকে।

কিন্তু সেই লিঙ্কন সম্পর্কেও এখন পর্যন্ত এক রহস্য অনুদ্ঘাটিত রয়ে গেছে। এ যাবতকালের সকল প্রেসিডেন্টই ছিলেন চার্চের সদস্য। ব্যতিক্রম কেবল লিঙ্কন। তরুণ বয়সে প্রকাশ্যে তিনি নিজের অবিশ্বাসের কথা জানান দিয়ে বেড়াতেন। রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিণত হওয়ার পর প্রায়ই ঈশ্বরের ব্যাপারে কথা বলতেন বটে, কিন্তু নিজেকে কখনোই খ্রিস্টান বলে স্বীকার করেননি তিনি। অন্তত তেমন কোনো দালিলিক প্রমাণের হদিস আজ অবধি পাওয়া যায়নি।

তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে, লিঙ্কন কি আসলে একজন নাস্তিক ছিলেন? লিঙ্কনের ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে জনমনে কৌতূহল রয়েছে আজো। মজার ব্যাপার হলো, লিঙ্কনের একদম কাছের মানুষদেরও দাবি, তারা কখনো লিঙ্কনের ধর্ম বিশ্বাসের প্রকৃত স্বরূপ বের করতে পারেননি। তিনি তার পরিবারের জন্য স্প্রিংফিল্ড, ইলিনয়ের ফার্স্ট প্রিসবাইটেরিয়ান চার্চ এবং ওয়াশিংটন ডিসির নিউ ইয়র্ক এভেনিউ প্রিসবাইটেরিয়ান চার্চে আসন ভাড়া নিয়েছিলেন, কিন্তু নিজে কখনোই এই দুইটি চার্চের কোনোটিতে যোগ দেননি।

যদিও তিনি শেষ বয়সে এসে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রশ্নের উত্তর পেতে উৎসাহী হয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও কখনো নিজেকে খ্রিস্টান হিসেবে পরিচয় দেননি। এমনকি এটি জানার পরেও যে তার এমন সিদ্ধান্ত তাকে রাজনৈতিকভাবে কোনঠাসা করে দিতে পারে।

“তিনি একবার বলেছিলেন, কীভাবে কোনো দৃশ্যমান ধর্মীয় বিশ্বাস না থাকার দরুণ ভোটারদের কাছে তার জনপ্রিয়তার উপর এক প্রকার কর ধার্য হয়েছিল,” বলেন আমেরিকান গৃহযুদ্ধ যুগ নিয়ে গবেষণা করা, গেটিসবার্গ কলেজের অধ্যাপক ও “আব্রাহাম লিঙ্কন: রিডিমার প্রেসিডেন্ট” বইটির রচয়িতা, অ্যালেন গুয়েলজো।

“এটি ছিল এমন একটি বিষয়, যেটির ব্যাপারে তিনি খুব ভালোভাবেই সচেতন ছিলেন, যেটির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু তারপরও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এমন কিছুর ভান না করার, যা আদতে তিনি নন।”

অধিকাংশ মানুষের মতোই, সমগ্র জীবনভর লিঙ্কনের ধর্মীয় বিশ্বাস ওঠানামা করেছে। একটি ব্যাপ্টিস্ট পরিবারে বেড়ে ওঠার পরও, তিনি নিজে শিশু বয়সে কিংবা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর কখনো দীক্ষা নেননি। বরং বয়স যখন সবে বিশের কোঠায় পড়েছে, তখন তিনি প্রায়ই সবার সামনে নিজের ঈশ্বর ও ধর্মের প্রতি অবিশ্বাসের কথা বলতেন।

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

এ ব্যাপারে গুয়েলজো বলেন, “তিনি প্রকৃতপক্ষে অবিশ্বাসের প্রশ্নে খুবই আক্রমণাত্মক হয়ে পড়তেন। শুরুর দিকে তাকে চিনতেন এমন একাধিক ব্যক্তি বলেছেন, তিনি নাকি ধর্মের ব্যাপারে মানুষকে ভড়কে দিতে পছন্দ করতেন।”

উদাহরণস্বরূপ, লিঙ্কন প্রায়ই বলতেন, বাইবেল নাকি নিছকই একটি সাধারণ বই, কিংবা যীশু খ্রিস্ট ছিলেন একজন অবৈধ সন্তান। “যখন তার বয়স বিশের দশকের শেষ ভাগে কিংবা ত্রিশের দশকের শুরুর দিকে, তখন তিনি সংযম করতে শুরু করেছিলেন, কেননা তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে অন্যথায় তিনি রাজনৈতিকভাবে খুব বেশিদূর অগ্রসর হতে পারবেন না।”

১৮৪৩ সালে যখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস হুইগ মনোনীত হতে ব্যর্থ হন, তখন লিঙ্কন আবিষ্কার করেন যে ধর্মের সঙ্গে সখ্য না থাকায় তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ ব্যাপারে তিনি নিজেই পরবর্তীতে লেখেন, ‘আমি বুঝতে পারছিলাম, কোনো খ্রিস্টানই আমাকে সমর্থন করবে না, যেহেতু আমি কোনো চার্চের সঙ্গে জড়িত নই।”

তিন বছর পর যখন তিনি অবশেষে হাউজে হুইগ মনোনয়ন লাভ করেন, তখন প্রতিপক্ষ পিটার কার্টরাইট তাকে ধর্মের প্রশ্নে আরো বেশি করে আক্রমণ করতে থাকেন। ততদিনে লিঙ্কন বুঝে গেছেন, নিজের অবিশ্বাসের কথা জনে জনে বলে বেড়িয়ে কোনো লাভ নেই, বরং সমালোচকদের মুখ বন্ধ করার রাস্তা খোঁজা প্রয়োজন।

তখন লিঙ্কন একটি হ্যান্ডবিল প্রকাশ করেন, “এ কথা সত্য যে আমি কোনো খ্রিস্টান চার্চের সদস্য নই। কিন্তু তাই বলে আমি কখনো ধর্মগ্রন্থের সত্যকে অস্বীকার করিনি, এবং আমি কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মকে হেয় করে কোনো উক্তিও করিনি, বিশেষ করে খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে তো কখনোই নয়।”

অথচ রাজনৈতিক প্রয়োজনে আত্মপক্ষ সমর্থন করার পরও, লিঙ্কন সরাসরি কখনোই বলেননি যে তিনি খ্রিস্টান বিশ্বের উপর আস্থাভাজন। বরং, “তিনি এমন সব অভিযোগের উত্তর দিতে থাকেন, যেসব অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আদতে কখনো আনাই হয়নি। তিনি কেবলই প্রসঙ্গকে অন্যদিকে নিয়ে যেতে থাকেন,” বলেন গুয়েলজো।

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

লিঙ্কন নির্বাচনে জয়ী হন, এবং বয়স পঞ্চাশোর্ধ হওয়ার পরও তিনি নিজের ধর্ম বিশ্বাসের ব্যাপারে আগের অবস্থান ধরে রাখেন। তবে একের পর এক ধারাবাহিক দুর্যোগ—১৮৫০ সালে পুত্র এডওয়ার্ক বেকারের মৃত্যু, ১৮৬১ সালে গৃহযুদ্ধের সূচনা, এবং ১৮৬২ সালে আরেক পুত্র উইলিয়াম ওয়ালাসের মৃত্যু—কিছু সময়ের জন্য লিঙ্কনকে ধর্মের ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলে। তখন তিনি গুরুত্বের সঙ্গে ঈশ্বরের অস্তিত্বের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করতে থাকেন, এবং চিন্তা করেন যে ঈশ্বর আসলে যুক্তরাষ্ট্র এবং দাসত্বের সংবিধান সম্পর্কে কী চাইতে পারেন।

১৮৬২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লিঙ্কন লেখেন, “গৃহযুদ্ধের এই পর্যায়ে, সম্ভবত ঈশ্বর এমন কিছু চাইছেন, যার সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের চাওয়ার মিল নেই। মানবিক যুদ্ধ শুরু হতে না দিয়ে ঈশ্বর চাইলে ইউনিয়নকে বাঁচাতে পারতেন, কিংবা ধ্বংসও করে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি কোনো পক্ষকে চূড়ান্ত বিজয়ী হতে দিলেন না, বরং যুদ্ধ চলতেই থাকল।”

এক পর্যায়ে লিঙ্কন তার বন্ধু, সিনেটর অরভিল হিকম্যান ব্রাউনিংকে বলেন, তিনি ভেবে দেখেছেন ঈশ্বর হয়তো ইউনিয়নকে সাহায্য করতেন না, যদি তারা দাসত্ব বন্ধ না করে। অথচ যুদ্ধ শুরুর সময় লিঙ্কন নিজেও এ ব্যাপারে কিছু ভাবেননি। তিনি যখন পরবর্তীতে আরো কয়েকজনের কাছে এ কথা বললেন যে ঈশ্বর চান দাসত্বের সমাপ্তি ঘটুক, তখন তারা খুবই অবাক হয়েছিলেন। এর কারণ লিঙ্কন তো কখনো প্রার্থনা করা বা ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে কথা বলা দূরে থাক, চার্চেই নিয়মিত যোগ দিতেন না। এরকম একটি দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেন এক ক্যাবিনেট মিটিংয়ে, যেখানে তিনি ইম্যানসিপেশন প্রক্লেমেশন ইস্যু করার প্রস্তাব রাখেন।

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

গুয়েলজো বলেন, “যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো যে তিনি কেন এটি করছেন, তখন তার উত্তর ছিল- আমি আমার স্রষ্টার কাছে শপথ নিয়েছি, যদি ইউনিয়নের সৈন্যরা মেরিল্যান্ডে কনফেডারেটের সৈন্যদের হারাতে পারে, যা তারা আসলেই করেছে। তাহলে আমি তাদের জন্য একটি ঘোষণাপত্র পেশ করব। তার এ কথাটি গোটা ক্যাবিনেটের মাঝেই চরম বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছিল এবং একজন সদস্য তো তাকে কথাটি আবারো বলতেও অনুরোধ জানিয়ে বসেন।”

১৮৬৫ সালে লিঙ্কন হত্যা হওয়ার পরে, মেরি টড লিঙ্কন তার স্বামীর ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। তবে তার সেসব উত্তর খুব একটা বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে পারেনি। কেননা তিনি লিঙ্কন আসলেই কী বিশ্বাস করতেন বা কবে থেকে বিশ্বাসী হলেন, এমন সব প্রশ্নের পারস্পরিক সাংঘর্ষিক জবাব দিতে থাকেন। এর ফলে সমালোচকরা উল্টো তাকে নিয়েই হাসাহাসি করতে শুরু করে দেয়।

যদিও লিঙ্কন বলেছিলেন যে ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই তিনি দাসত্ব বন্ধ করেছেন, কিন্তু তারপরও তার অনেক ঘনিষ্ঠ বন্ধুই তার ধর্মীয় বিশ্বাসের ব্যাপারে অনিশ্চিত থেকেছেন, কেননা এ বিষয়টি নিয়ে জীবদ্দশায় লিঙ্কন বরাবরই খুব গোপনীয়তা রক্ষা করেছেন।

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

১৮৬৫ সালের ১৪ এপ্রিল খুন হন লিঙ্কন। ১৫০ বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে যাওয়ার পর, এখন আমাদের পক্ষে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সত্যিই কঠিন যে আসলেই লিঙ্কন বিশ্বাসী ছিলেন কি না। তবে এ কথাও অনস্বীকার্য যে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার ব্যবহৃত বাইবেলগুলোর জনপ্রিয়তাই সবচেয়ে বেশি। বারাক ওবামা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প দুজনেই তাদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে তথাকথিত “লিঙ্কন বাইবেল” ব্যবহার করেছেন।

তবে পরিহাসের বিষয় হলো, লিঙ্কন নিজেই ওই বাইবেলটি হাতে পাননি মধ্যরাতে শপথ গ্রহণে উপস্থিত হওয়ার আগ পর্যন্ত। একজন সুপ্রিম ক্লার্ক তড়িঘড়ি করে তার শপথের জন্য বাইবেলটি নিয়ে এসেছিলেন, এবং সেটিই এখন ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছে।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।