আজানের সূচনা হয়েছিল যেভাবে

ইসলামের সমস্ত বিষয়গুলোকে নির্দিষ্ট কিছু শিরোনামে বলতে চাইলে ইবাদত, লেনদেন, আচার ব্যবহার, আখলাক ও আকীদার আলোচনা আসবে। ইসলামের মূল হচ্ছে আকীদা বিশ্বাস। আর বাকিগুলো হচ্ছে শাখাগত বিষয়।

ইবাদতই এগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ। ইবাদতের প্রধান হচ্ছে নামাজ। নামাজের বিধান পূর্ববতী নবীগণের মধ্যেও ছিল। ইসলামে নামাজ ফরজ হয়েছে মেরাজের রজনীতে। সে ঘটনা আমরা জানি। প্রথম দেয়া হয় পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ। তা কমিয়ে আসতে আসতে সর্ব শেষ চূড়ান্ত হয় পাঁচ ওয়াক্ত।

নামাজ মেরাজের রজনীতে ফরজ হলেও, নামাজের জন্য আজান দেয়ার প্রচলন কিন্তু তখনো হয়নি। তা হয়েছে আরো পরে। মদিনায় হিজরতের পর। প্রচলন পরে হলেও রাসূল (সা.) মেরাজের রজনীতেই আজান শুনেছিলেন। কারো কারো মতে হজরত জিবরাইল (আ.) সে রাতে নবী করিম (সা.)-কে আজান শিক্ষা দিয়েছিলেন। তবে এই মতের পক্ষের হাদিসগুলো সনদগতভাবে দুর্বল হওয়ায় কেউ কেউ এই মতটিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। মদিনায় আজানের প্রচলন হওয়ার ঘটনাটি ছিল এ রকম। মদিনায় হিজরতে পর মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকল। মক্কায় এতদিন স্বাধীনভাবে দ্বীনি কাজ আঞ্জাম দেয়া সম্ভব হয়নি। মদিনায় স্বাধীনভাবে দ্বীনি কাজ করা ও মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষিতে নামাজের জন্য লোকদেরকে ডাকার প্রয়োজন দেখা দিল। একদিন রাসূল (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে পরামর্শ করলেন যে, নামাজের জন্য লোকদেরকে একত্রিত করার কী পদ্ধতি হতে পারে। কেউ কেউ পরামর্শ দিল, খৃষ্টানদের ন্যায় নামাজের সময় হলে ঘণ্টা বাজানো হোক। কয়েকজন পরামর্শ দিল, ইহুদিদের ন্যায় নামাজের সময় হলে সিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হোক। হজরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) বলেন, একজন লোক ঠিক করলেই তো হচ্ছে। সে নামাজের সময় হলে লোকদেরকে ডেকে ডেকে জমা করবে। কিন্তু নবী করিম (সা.) এর নিকট কোনোটিই পছন্দ হচ্ছিল না। তাই বিষয়টি অমীমাংসিত অবস্থায় ওই দিনের বৈঠক শেষ হলো।

ওই দিনেরই রাতের ঘটনা। আব্দুল্লাহ ইবনে জায়েদ (রা.) স্বপ্নে দেখেন এক লোক দুটি ঘণ্টা নিয়ে যাচ্ছে। তিনি ওই লোককে বলেন, হে আল্লাহর বান্দা! তুমি কি ওগুলো আমার কাছে বিক্রি করবে? ওই লোক প্রশ্ন করেন তুমি এর দ্বারা কী করবে? সাহাবি বলেন, এগুলো বাজিয়ে লোকদেরকে নামাজের দিকে ডাকব। তখন ওই লোক বলেন, নামাজে ডাকার জন্য আমি তোমাকে এর চেয়ে সুন্দর পদ্ধতি শিখিয়ে দিচ্ছি। এর পর ওই লোক আজানের শব্দগুলো শিখিয়ে দেন। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে জায়েদ ফজরের সময় নবী করিম (সা.)-কে আজানের শব্দগুলো শুনালেন। রাসূল (সা.) শুনে বলেন এটা সত্য স্বপ্ন। রাসূল (সা.) তাকে নির্দেশ দিলেন, হজরত বেলালকে আজান শেখাও। হজরত বেলাল আজান শিখে আজান দেয়া শুরু করেন। আর এভাবেই আজানের সূচনা হয়েছে।

কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, হজরত উমর (রা.) বেলালের আজান শুনে ঘুম থেকে ওঠে দৌঁড়ে গেলেন যে, আমিও তো স্বপ্নে এগুলো দেখেছি। রাসূল (সা.) তার কথা শুনে বলেন, সমস্ত তারিফ আল্লাহ তায়ালার জন্য। ঘটনাটি এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ বিদায়া ওয়ান নিহায়াতে। কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়, হজরত উমর (রা.) এ ঘটনা ঘটারও বিশ দিন আগে আজানের শব্দগুলো স্বপ্নে দেখেছিলেন। আবু দাউদ, তিরমিজীসহ আরো বহু হাদিসের কিতাবে ইকামতের আলোচনাও এসেছে। অর্থাৎ আজানের সঙ্গে স্বপ্নে ইকামতও শিখিয়ে দেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে হজরত বেলাল (রা.) ফজরের নামাজে ‘আস সালাতু খাইরুম মিনান নাওম’ বাক্যটি যুক্ত করেন। হজরত নবী করিম (সা.) এটাকে পছন্দ করেছেন। বিধায় এখন এটাও আজানের অংশ।

অনেকে বিভ্রান্তি ছড়ান যে, আজান এসেছে একজন সাহাবির স্বপ্নের মাধ্যমে, যিনি নবী ছিলেন না। তারপরও তার স্বপ্নকে মেনে নিয়ে আজানের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে বৈধতা দেয়া হয়েছে। অতএব ওলি আউলিয়াদের স্বপ্ন শরীয়তের দলীল, যেমন ওই সাহাবির স্বপ্ন দলিল হয়েছে। মূল বিষয় হচ্ছে, আজান শুধু স্বপ্নের মাধ্যমেই বৈধতা পেয়েছে বিষয়টি এমন নয়। বরং পরবর্তীতে এ ব্যাপারে সরাসরি ওহি নাজিল হয়েছিল। যেমন এক হাদিসে এসেছে, হজরত উমর (রা.) ঘণ্টা বানানোর জন্য দুটি কাঠ কিনেন। কিন্তু ওই রাতেই তিনি স্বপ্নে আজানের শব্দগুলো শিখেন। দৌঁড়ে রাসূল (সা.)-কে সংবাদ দিতে গেলে, তিনি বলেন, তোমার সংবাদ দেয়ার আগেই এ ব্যাপারে ওহি নাজিল হয়েছে। (বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খন্ড-২, পৃষ্ঠা-৪৭১) আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের আকিদা হচ্ছে, নবীগণের স্বপ্ন শরীয়তের দলিল হতে পারে। কিন্তু ওলি আউলিয়াদের স্বপ্ন দলিল হতে পারে না। তাই এ ব্যাপারে বিভ্রান্তি ছড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।

আজানের শব্দ সংখ্যা কম। তবে এর মাধ্যমে দ্বীনের মৌলিক শিক্ষা পেশ করা হয়েছে। ইমাম কুরতুবী (রাহ.) এ ব্যাপারে খুবই চমৎকার আলোচনা করেছেন। তিনি লেখেন, ‘আজানের শব্দ সংখ্যা কম হওয়া সত্তেও দ্বীনের মৌলিক বিষয় তথা আকীদার বিষয়গুলো সেখানে আলোচনা হয়েছে। আজানের সূচনা হয়েছে, আল্লাহু আকবার শব্দ দিয়ে। এর মধ্যে আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্ব ও বড়ত্বে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় শব্দ হচ্ছে ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। এখানে আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদ ও তার সঙ্গে শরিক না থাকার বিষয় আলোচনা হয়েছে। এরপর নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নবুওয়াতকে সাব্যস্ত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ’ অর্থাৎ আমি সাক্ষ দিচ্ছি মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসূল। এর পর দ্বীনের খুটি নামাজের আলোচনা হয়েছে। কারণ নামাজ ইবাদত হওয়া, নবী ছাড়া কারো মাধ্যমে জানা সম্ভব নয়। তারপর মানুষকে চির সফলতার দিকে ডাকা হয়েছে। এর দ্বারা মূলত আখেরাতের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। কারণ প্রকৃত সফলতা হচ্ছে, যা আখেরাতে লাভ হবে। শব্দগুলো দুইবার বলার কারণ হচ্ছে, বিষয়ের ওপর তাকিদ দেয়া। আজানের দ্বারা নামাজের ওয়াক্ত আসা, জামাতের দিকে আহ্বান জানানো হয়। এর দ্বারা দ্বীনের একটি প্রতীকেরও বহিঃপ্রকাশ ঘটে। আজানের জন্য কিছু শব্দকে নির্বাচন করা হলো, যা মুখে ঘোষণা করতে হয়; কোনো কাজকে নয়। কারণ, মুখে বলা সহজ, কাজ করে দেখানোর চেয়ে। যেন যে কোনো জায়গার, যে কেউ আজানের মাধ্যমে ইসলামের সুমহান বার্তা মানুষের কাছে পৌছে দিতে পারে। (মাআরেফুস সুনান, খন্ড-২, পৃষ্ঠা-১৬৮)

আজান সম্পর্কে প্রচলিত ভুল:
আজান ও আজানের উত্তর নিয়ে আমাদের সমাজে কিছু প্রচলিত ভুল আছে। যেমন হাদিসে এসেছে, আজানের উত্তরে শ্রোতা ওই শব্দগুলোই বলবে যা মুয়াজ্জিন আজানে বলে। তবে হাইয়ালাস সালাহ ও হাইয়ালাল ফালাহ বলার সময় শ্রোতা বলবে ‘লা হাওলা ওলা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’। কিন্তু আমাদের সমাজের কাউকে কাউকে ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ’ বলার সময় দরূদ পড়তে শুনা যায়। এটা মূলত ভুল। নিয়ম হলো আজান শেষে যে কোনো দরূদ পাঠ করে দোয়া পড়া। দ্বিতীয় যে ভুল সমাজে প্রচলিত, নবী করিম (সা.) এর নাম শুনার সময় আঙ্গুলে চুমু খেয়ে তা চোখে লাগানো। আজান ও ইকামত উভয় ক্ষেত্রেই এটা করা হয়। এর সূত্র হচ্ছে মুসনাদে দাইলামি নামক কিতাব। ওই কিতাবে প্রচুর হাদিসের নামে বানোয়াট কথা রয়েছে। তো এমন একটি বানোয়াট হাদিস হচ্ছে ‘হজরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) যখন মুয়াজ্জিনকে আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ বলতে শুনলেন তখন তিনিও তা বলেন এবং তর্জনী আঙ্গুল দুটিতে চুমু খেয়ে তা চোখে বুলিয়ে দিলেন। (তা দেখে) রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আমার দোস্তের মতো আমল করবে তার জন্য আমার সুপারিশ অবধারিত।’ এই হাদিস সম্পর্কে হাদিস ও রিজাল শাস্ত্রের পণ্ডিত ব্যক্তিদের মতামত হচ্ছে বানোয়াট হাদিস। আমাদের দেশের মানুষের ধর্মীয় আবেগের প্রবলতার কারণে অনেকে বিশ্বাসই করতে পারেন না যে, হাদিস বানোয়াট বা মিথ্যা হতে পারে।

রাসূল (সা.) এর যুগের পর যখন আস্তে আস্তে ফেতনা ছড়াতে থাকে তখন বিভিন্ন গোমরা দল নিজেদের মতের স্বপক্ষে হাদিস বানাতে থাকে। আল্লাহ তায়ালাও তখন এমন ব্যক্তিদের দুনিয়াতে পাঠান, যারা দ্বীনের শিক্ষাকে হেফাজতের জন্য নিজেদের জীবন যৌবনকে ব্যয় করেছেন। যাদের মেধা ও সততা অতুলনীয়। উল্লিখিত হাদিসের ব্যাপারে ওই সকল হাদিসবেত্তাদের মত তুলে ধরছি। আল্লামা সাখাবী বলেন, এ হাদিস প্রমাণীত নয়। আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতি বলেন, মুয়াজ্জিনের শাহাদাতে নবী করিম (সা.) এর নাম শুনে আঙ্গুলে চুমু খাওয়া ও তা চোখে মুছে দেয়ার ব্যাপারে যতগুলো হাদিস আছে সবগুলোই জাল ও বানোয়াট। আল্লামা লাখনোভী (রা.) লেখেন ‘ইকামত বা অন্য কোথাও নবী করিম (সা.) এর নাম শুনে নখে চুমু খাওয়া (এবং তা চোখে বুলিয়ে দেয়া) সম্পর্কে কনো হাদিস বা সাহাবির কোনো আসর বা আমল বর্ণিত হয়নি।’ (বিস্তারিত জানতে এসব হাদিস নয় বইয়ের প্রথম খন্ডের ১০৭ পৃষ্ঠা দেখুন) আজান দেয়ার সময় কথা বললে ঈমান চলে যাওয়া বা চল্লিশ বছরের নেকি নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথাও শুনা যায়। এখানেও যে হাদিসগুলো পেশ করা হয় সব ভিত্তিহীন।

তবে আজানের জবাব দিতে হলে অন্য কোনো কথা বা কাজ বন্ধ রাখা দরকার এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই বলে আমলে আনার জন্য হাদিস বানিয়ে বলা কখনো সমর্থনযোগ্য নয়। বহু হাদিসের কিতাবে হাদিস বানানোর গোনাহ সম্পর্কে হুশিয়ারি এসেছে। রাসূল (সা.) বলেন, যে আমার ব্যাপারে কোনো মিথ্যা বলবে সে যেন নিজের ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়। (সহীহ মুসলিম) হাদীসের মান না জেনে মানুষের সামনে বর্ণনা করাও এক ধরনের অন্যায়। তাই যে কোনো বিষয়ের হাদিস বলার আগে তা জেনে নেয়া।

আজান সম্পর্কে আরেকটি ভুল হচ্ছে ঝড় তুফানে আজান দেয়া। ওই অবস্থার দোয়া আছে তা পড়তে হবে। বা আল্লাহর বড়ত্বসূচক কোনো বাক্য স্মরণ করা যায়। কিন্তু আজান দেয়া যাবে না। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সঠিক আমল করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।