অক্সিজেন তৈরীর কারিগড় ইন্তাজ আলী

টাইমস ডেস্ক : গাছ মানেই অক্সিজেন। অর্থাৎ আমাদের বেঁচে থাকার জন্য যে অক্সিজেন প্রয়োজন হয় তার সবুজ গাছপালা থেকেই পেয়ে থাকি। আর এ গাছপালা নিয়ে যিনি সার্বক্ষনিক ব্যাস্ত থাকেন এবং আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় যে অক্সিজেন উৎপাদনের পাশপাশি পরিবেশ রক্ষায় যিনি অগ্রনী ভূমিকা রাখছেন তিনি হচ্ছে ইন্তাজ আলী।

শেরপুর জেলা সদর থেকে চার কিলোমিটার দূরের ভাতশালা ইউনিয়নের ছোট্ট গ্রাম বয়ড়া পরানপুর। শেরপুর-ঢাকা মহাসড়ক ঘেঁষা গ্রামটিতে গেলেই নজর কাড়ে সবুজের সমারোহ। মাঠগুলোতে দাঁড়িয়ে অছে ছোট বড় সাইজের বিভিন্ন প্রজাতির অসংখ্য চারা। এ গ্রামের প্রায় ২০০ পরিবারের প্রায় এক হাজার মানুষ নার্সারির কাজে যুক্ত। ছোট্ট বয়ড়া পরানপুর গ্রামটি এখন পরিচিতি পেয়েছে নার্সারি গ্রাম হিসেবে। এর নেপথ্যে যার অবদান তিনি হলেন মো. ইন্তাজ আলী। নার্সারি ব্যবসার মাধ্যমে একজন সামান্য দিনমজুর থেকে স্বাবলম্বী হয়েছেন ইন্তাজ।

ইন্তাজ আলী (৫৫) পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। ১৫ বছর বয়সে বাবা ছাবেদ আলী মারা যান। এরপর ১৯৯৪ সালে তিনি গাজীপুরে বালাদেশ কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিউটে (বারি) একজন কৃষি শ্রমিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। বেতনের সামান্য টাকায় সংসার চলছিল না। এক বছর পর ১৯৯৫ সালে স্ত্রী ফাতেমা বেগমের জমানো ৪ হাজার ৫০০ টাকা মূলধন খাটিয়ে তাঁর বসতবাড়ির মাত্র ৫ শতক জমিতে ছোট্ট পরিসরে একটি নার্সারি গড়ে তোলেন এবং পাঁচ হাজার চারা উৎপাদন করেন।

প্রথম বছর তার প্রায় ১৫ হাজার টাকা লাভ হয়। ওই টাকা দিয়ে গ্রামের এক প্রতিবেশীর ২৫ শতাংশ জমি বন্দোবস্ত নিয়ে নার্সারির পরিধি বাড়ান। ইন্তাজ আলী তার নার্সারির নাম দেন সিদ্দিক নার্সারি। দিনে দিনে পরিচিতি বাড়ে। প্রসার হয় ব্যবসার। এরপর ইন্তাজ আলীকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। তার পথ ধরেই এ গ্রামে শুরু হয় নার্সারি ব্যবসার বিস্তার। সেইসাথে তিনি হয়ে ওঠেন সবার মডেল।
বর্তমানে ইন্তাজ আলীর নার্সারিটি প্রায় দুই একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখানে চার শতাধিক প্রজাতির ফলদ, বনজ ঔষধি এবং ফুলের প্রায় দুই লাখেরও বেশি চারা রয়েছে। চারা বিক্রি করে ইন্তাজ আলী মাসে গড়ে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় করেন।
বিভিন্ন সময়ে যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ একাডেমির প্রশিক্ষণার্থীরা ও শেরপুর কৃষি প্রশিক্ষণ ইনষ্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা হাতে কলমে প্রশিক্ষণ নিতে ইন্তাজের নার্সারিতে আসেন।

ইন্তাজ আলী নার্সারি ব্যবসায়র পাশপাশি তার সংসারের নার্সারিতেও পিছিয়ে নেই। তিনি পাঁচ সন্তানকেই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। বড় ছেলে আবু বক্কর সিদ্দিক (২৮) কলেজের প্রভাষক বড় মেয়ে খাদিজা খাতুন (২৪) প্রাথমিক বিদালয়ের শিক্ষক, মেজো মেয়ে তাসলিমা আক্তার (২০) সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রশিক্ষক। এ ছাড়া তৃতীয় মেয়ে ফারিয়া তাবাসসুম (১৯) রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক শ্রেণিতে ও কনিষ্ঠ ছেলে আরিফ হোসেন (১৭) কৃষি ডিপ্লোমা ইনষ্টিটিউটে অধ্যয়নরত। ফলে এলাকায় তার আদর্শ নার্সারি ব্যবসায়ীর পাশপাশি এক জন্য আদর্শ পিতা হিসেবেই সুনাম রয়েছে।

ইন্তাজ আলীর নার্সারি ব্যবসার সফলতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বয়ড়া পরানপুর গ্রামের বহু লোক এখন এ পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে নূর হোসেন আকরাম হোসেন, আসকর মোল্লা, খোরশেদ আলী, কুবেদ আলী, সাদেক আলী, আমতাল আলী, রহিম উদ্দিন, হাছেন আলী, হোসেন আলী, বাজিত আলী, আবদুল কাদিরসহ অনেকেই আজ নার্সারির সফল মালিক।

জেলা নার্সারি মালিক সমিতির সভাপতি ও বয়ড়া পরানপুর গ্রামের লিজা নার্সারির মালিক মো. সাদেক আলী বলেন, প্রায় ২০ বছর আগে ইন্তাাজ ভাই আমকে নার্সারি ব্যবসা করার জন্য পরামর্শ দেন। তাঁর পরামর্শমতো আমি মাত্র ১৩ শতাংশ জমিতে নার্সারির কাজ শুরু করি। পরে নার্সারির আয় থেকে আড়াই একর জমির মালিক হয়েছি এবং সেখানে নার্সারির কাজ করছি। তার পরামর্শে এই গ্রামে অর্ধশতাধিক নার্সারি গড়ে উঠেছে। এখানে প্রায় এক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

নূরজাহান নার্সারির মালিক মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, প্রায় এক একর জমিতে নার্সারি করেছি। এই ব্যবসা অনেক লাভ জনক। ইন্তাজ আলীর পরামর্শেই এ ব্যবসায় এসেছি। এটিই এখন আমার একমাত্র পেশা। এ ব্যবসা থেকে প্রতিবছর লক্ষাধিক টাকা আয় হয় বলেও জানান তিনি।
ইন্তাজ আলী জানান, তার নার্সারিতে দেশি-বিদেশী জাতের ফলদ, বনজ এবং ঔষধি গাছের চারা কলমসহ ফুলের চারাও উৎপাদিত হচ্ছে। ফলের মধ্যে রয়েছে কাঁঠাল, জলপাই, আম, জাম, পেয়ারা, আঙুর চালতা, নাশপাতি, লিচু, কমলা, আপেল, সফেদা, বড়ই, নারকেল, জামরুল, গোলাপজাম, আমড়া, বিলাতি গাব ইত্যাদি।

বনজ চারার মধ্যে রয়েছে মেহগনি, সেগুন, একাশিয়া, মিলজিয়াম, শিলকড়ই, রেইনট্রি, শিশু ইপিল ইপল, চাম্বল, রাজকড়ই, কদম, গর্জন, জারুল প্রভূতি।

ঔষধির মধ্যে রয়েছে নিম, বহেড়া, হরীতকী, আমলকী, অর্জুন, শিমুল, শতমূল, ঘৃতকাঞ্চন, শঙ্খমূল, উলট কম্বল, যষ্টিমধুসহ দুই শতাধিক প্রজাতির চারা। এছাড়াও ফুলের প্রায় ১০০ প্রজাতির চারা পাওয়া যায় ইন্তাজের নার্সারিতে।

ইন্তাজ তার নার্সারিতে আপেলকুল, বাউকুল, থাইকুল, লেবু, লিচুসহ বিভিন্ন প্রজাতির চারার কলম তৈরি করেন। জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার মাস চারা বিক্রির মৌসুম হলেও সারা বছরই কমবেশি চারা বিক্রি হয়। স্থানীয় ক্রেতা ছাড়াও চারা সংগ্রহ করতে সিলেট, সুনামগঞ্জ, টাঙ্গাইল, জামালপুর, ময়মনসিংহ ফুলপুর ও হালুয়াঘাট এবং কুড়িগ্রামের বাজীবপুর ও রৌমারী উপজেলা থেকে বহু ক্রেতা এখানে আসেন।
ইন্তাজ আলী বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ, অ্যাগ্রোফরেষ্ট্রি ইমপ্রুভমেন্ট পাটনারশিপ প্রকল্প প্রকল্প, ইন্টারকো অপারেশন এবং রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইনষ্টিটিউটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ফল গাছের বংশবিস্তার, নার্সারি ও মাতৃগাছ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।

এছাড়া প্রতিবছর জেলা প্রশাসন, বন বিভাগ ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আয়োজিত বৃক্ষমেলা, ফলদ বৃক্ষমেলা ও কৃষিপ্রযুক্তি মেলায় তিনি তার নার্সারি প্রদর্শনী স্টল দিয়ে থাকেন। ২০০৪ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত তাঁর স্টল টানা ১২ বছর প্রথম হয়। ২০১০ সালে বৃক্ষরোপণে কৃতিত্বের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে তাকে প্রথম পুরস্কার দেওয়া হয়।

ইন্তাজ আলীর ভবিষ্যত পরিকল্পনা হলো, প্রতি বাড়িতে অন্তত দুইটি করে এবং জেলার সকল সড়কের পাশে গাছ লাগিয়ে সবুজ প্রকৃতিতে ভরিয়ে দিবে জেলা তথা দেশকে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর শেরপুরের উপপরিচালক মো. আশরাফ উদ্দিন জানান শেরপুর জেলার সবুজায়ন ও বৃক্ষরোপণ কাজে ইন্তাজ আলী তাঁর নার্সারির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে অবদান রেখে আসছেন। এ জন্য সরকারি পর্যায়ে তিনি সম্মাননাও পেয়েছেন।

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের