সোমবার , ১৭ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ || ৩রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ - বর্ষাকাল || ১০ই জিলহজ, ১৪৪৫ হিজরি

শিক্ষা বাণিজ্য ও একটি পরিসংখ্যান

প্রকাশিত হয়েছে -

শেরপুর শহরের খ্যাতনামা একটি স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী লাবণ্য (ছদ্মনাম)। এ স্কুলের মাসিক বেতন ৮৫০ টাকা।
পরীক্ষায় ভালো ফলের আশায় একটি কোচিং সেন্টারেও যায় লাবণ্য, সেখানেও তার পরিবারকে গুনতে হয় তিন হাজার টাকা। লাবণ্যের বড় ভাই রিয়াদ (ছদ্মনাম) একই স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। পরীক্ষার ফলাফলে শীর্ষস্থান পেতে তিন বিষয়ে প্রাইভেট পড়ছে সে। যেখানে খরচ হয় ছয় হাজার টাকা। সরকারি চাকরিজীবীর ওই পরিবারের বড় ছেলে রিশাদ রাজধানীর কমার্স কলেজে এবার এইচএসসিতে পড়ছে। ইংরেজি ও অ্যাকাউন্টিংয়ে প্রাইভেট পড়ার সুবাদে তার খরচ হচ্ছে ৫ হাজার ৫০০ টাকা। তিন সন্তানের পেছনে ওই পরিবারের মাসে প্রাইভেট ও কোচিং খরচ চলে যাচ্ছে ১২ হাজার টাকার মতো। অন্যান্য স্থানে প্রাইভেট পড়ার পেছনে শিক্ষার্থীদের যে পরিমাণ টাকা খরচ হয়, স্থানভেদে তা অনেকটাই এ রকম।

একটি পরিবার তার সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে মাসে কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনির পেছনে কী পরিমাণ টাকা খরচ করে কিংবা একজন শিক্ষার্থী এক বছরে তার শিক্ষা ব্যয়ের কত শতাংশ প্রাইভেট ও কোচিংয়ের পেছনে খরচ করে— সরকারের কাছে এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই।

কোচিং ও প্রাইভেট বাণিজ্যের হিসাব জানতে দেশে (গতবছর) প্রথমবারের মতো একটি জরিপ করে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। জরিপে দেখা গেছে, একজন শিক্ষার্থী বছরে তার শিক্ষার পেছনে যে টাকা ব্যয় করে, তার মধ্যে ৩০ শতাংশ চলে যায় কোচিং, আর হাউস টিউটরের ফি বাবদ। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থী বছরে যদি শিক্ষা খাতে ১০০ টাকা খরচ করে, তার মধ্যে ৩০ টাকা খরচ হয় কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনিতে। ওই শিক্ষার্থীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৮ শতাংশ টাকা খরচ হয় বই, খাতা-কলম বা অন্য কোনো শিক্ষা উপকরণ কেনার পেছনে। তৃতীয় সর্বোচ্চ টাকা ব্যয় হয় ভর্তি, সেশন ফি, পরীক্ষা ফি বাবদ, যা ১৭ শতাংশ। এ ছাড়া যাতায়াত ও টিফিন বাবদ খরচ হয় ১৬ শতাংশ, টিউশন ফিতে ১০ শতাংশ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইউনিফর্ম কেনায় ৯ শতাংশ অর্থ খরচ হয়। বিবিএস বলছে, সাধারণত শহরের শিক্ষার্থীরা কোচিং ও প্রাইভেট পড়তে গিয়ে বেশি টাকা খরচ করে আর তাদের খরচের হার ৩৩ শতাংশ। আর গ্রামের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক কম টাকা খরচ করে। এই হার ২৬ শতাংশ।

জানতে চাইলে জরিপের সমন্বয়ক জাফর আহমেদ খান বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহযোগিতা নিয়ে আমরা দেশের ছয় হাজার ১২০টি খানা থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি। নমুনা আকারে সাতটি বিভাগের প্রায় ২৭ হাজার মানুষের সাক্ষাত্কার নিয়ে জরিপটি করা হয়েছে। ’ জাফর আহমেদ খান বলেন, ‘জরিপে আমরা দেখেছি সরকারি স্কুলের চেয়ে বেসরকারি স্কুলের খরচ দিগুণ। এ ছাড়া একজন শিক্ষার্থী তার শিক্ষা খাতে যে পরিমাণ টাকা খরচ করে তার বড় একটি অংশই চলে যায় প্রাইভেট ও কোচিং বাণিজ্যে।

রমরমা কোচিং বাণিজ্য বন্ধে বছর চারেক আগে হাইকোর্ট থেকে একটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কোচিং বন্ধে একই বছর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকেও একটি নীতিমালা জারি করা হয়েছিল। কোচিং বাণিজ্য বন্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে থাকলেও তাতে যে কোনো কাজ হয়নি; সেটি প্রমাণিত হলো বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক এ জরিপে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ মনে করেন, শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে পূর্ণ শিক্ষা পেলে কোচিং বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে সঠিকভাবে পাঠদান করেন না। সে কারণে শিক্ষার্থীরা কোচিং বা প্রাইভেট পড়ার দিকে ঝুঁকছে। প্রাইভেট ও কোচিং সেন্টার শুধু রাজধানীতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা ছড়িয়ে পড়েছে জেলা, উপজেলা ও পৌরসভায়ও। এসব বন্ধে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তা কোনো কাজে আসছে না।

শিক্ষকরা ক্লাসে পাঠদান করে যাওয়ার পর প্রাইভেট ও কোচিং কতটা জরুরি তা জানতে উল্লিখিত পরিবারের তিন শিক্ষার্থীর সঙ্গেই কথা বলেন এই প্রতিবেদক। তাদের সবার কণ্ঠেই ছিল একই সুর। ক্লাসে যদি শিক্ষক ভালো করে পড়ান, তাহলে কোচিং ও প্রাইভেট পড়ার কোনো প্রয়োজন হয় না। কিন্তু শিক্ষকরা ক্লাসে ঠিকভাবে মনোযোগ দেন না। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের অনেক কথাই বোঝা যায় না। কোনোমতে ৪৫ মিনিট সময় কাটিয়ে দেন। অনেকটা বাধ্য হয়েই প্রাইভেট ও কোচিংয়ে ভর্তি হতে হয়েছে বলে জানাল তারা। প্রাইভেট পড়াতে অনেক শিক্ষক চাপ প্রয়োগ করেন বলেও অভিযোগ এই তিন শিক্ষার্থীর। অথচ যে শিক্ষকদের ক্লাসে শিক্ষার্থীদের যত্ন করে পড়ানোর কথা, তাঁরা সেই যত্ন নিচ্ছেন ব্যাচে কোচিং করিয়ে। শিক্ষার্থীদের বাসা কিংবা কোচিংয়ে পড়িয়ে শিক্ষকরা হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা।

Advertisements

জরিপে উঠে এসেছে, সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খরচ দিগুণেরও বেশি। তাতে দেখা গেছে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত একজন শিক্ষার্থীর বার্ষিক খরচ ৩১ হাজার ৬১৪ টাকা। যার বিপরীতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত একজন শিক্ষার্থীর শুধু তার শিক্ষা খাতে বার্ষিক খরচ ৫২ হাজার টাকা। এ খরচ শুধু একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষা খাতের। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচের এই তারতম্যের মূলে ভর্তি ও রেজিস্ট্রেশন ফির আকাশ-পাতাল পার্থক্য। দেখা গেল, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বাবদ খরচ হয় গড়ে সাত হাজার টাকার মতো। অথচ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে ভর্তি বাবদ খরচ হয় ১৫ হাজার ২১০ টাকা। টিউশন ফিতেও বড় ধরনের পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে টিউশন ফিতে খরচ হয় সাড়ে ৯ হাজার টাকা। যার বিপরীতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে খরচ হয় প্রায় ২০ হাজার টাকা। বিবিএসের করা জরিপে আরো দেখা গেছে, সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক কলেজগুলোতে বছরে শিক্ষা খাতে একজন শিক্ষার্থীর ব্যয় ১৬ হাজার ৫১৮ টাকা। কিন্তু বেসরকারি কলেজে খরচ হয় ১৭ হাজার ৩১২ টাকা। আর সরকারি কলেজগুলোতে (উচ্চ মাধ্যমিকের পরও পড়ার সুযোগ আছে যেখানে) বার্ষিক খরচ হয় ২৪ হাজার ১২২ টাকা। বেসরকারি কলেজে খরচ হয় ২৬ হাজার ৩৮৮ টাকা।

বিবিএসের জরিপ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, আশির দশকে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা কম ছিল; তাঁদের মর্যাদাও ছিল না। তখন থেকেই মূলত কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনির যাত্রা শুরু। সেটি আর থামানো যায়নি। এখন তো শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বেড়েছে; তাঁদের মর্যাদাও বেড়েছে। কিন্তু শিক্ষকরা তো কোচিং বাণিজ্য থেকে বেরিয়ে আসেননি। বরং সেটি দিন দিন বাড়ছে। মঞ্জুরুল ইসলাম মনে করেন, দেশে কোচিং বাণিজ্য নিয়ে একটি অশুভ ও দুষ্ট চক্র তৈরি হয়েছে। এবং এরা দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। তা না হলে শিক্ষামন্ত্রী কিভাবে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। এ দুটি পাবলিক পরীক্ষার কোনো দরকারই ছিল না। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত সব জায়গায় কোচিং বাণিজ্য ছড়িয়ে দিতে এই দুটি পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে।

এই শিক্ষাবিদ বলেন, শিক্ষকদের এখন সব মনোযোগ কোচিংয়ের দিকে। সে কারণে শ্রেণিকক্ষে গিয়ে অনেক শিক্ষককে ঘুমাতে দেখা যায়। দেশের খ্যাতনামা কিছু প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের এখন ড্রয়িংয়েও কোচিং করতে হয়। অভিভাবকদের মনে একটা বিষয় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে যে সন্তানকে কোচিং না করালে পাস করানো যাবে না। আর অভিভাবকরাও সে পথে পা বাড়িয়েছেন।

এদিকে বিবিএসের জরিপে আরো দেখা গেছে, একটি পরিবার তার আয়ের ৬০ শতাংশ অর্থ ব্যয় করে খাদ্য কেনায়। ২৯ শতাংশ টাকা খরচ করে খাদ্য বহির্ভূত পণ্য কেনায়। ৭ শতাংশ টাকা খরচ হয় শিক্ষা খাতে। আর ৪ শতাংশ টাকা খরচ হয় স্বাস্থ্য খাতে।

দেশের প্রায় ৬৬ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২০ হাজার কিন্ডারগার্টেন ও ২৪ হাজারের বেশি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রায় একই চিত্র। আর তা হলো কোচিং আর প্রাইভেট টিউশনি। উচ্চ মাধ্যমিক কলেজের অবস্থাও মাধ্যমিকের চেয়ে উন্নত নয়। পাঠক্রমে পরিবর্তন এসেছে, বইয়ে পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু স্কুলে পড়ানোর ধরন আর কোচিং বাণিজ্যে কোনো পরিবর্তন আসেনি। এমনকি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নানা কৌশলে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করেন বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। বহু স্কুলে কোনো শিক্ষার্থী ওই স্কুলের শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট না পড়লে তাকে ফেল করিয়ে দেওয়ার অভিযোগ আছে অনেক। আর প্রাইভেট ও কোচিং করলে পরীক্ষার প্রশ্ন পাওয়া, বেশি নম্বর পাওয়াসহ অনেক সুবিধা পাওয়া যায়।

 

(তথ্যসূত্র : কা.ক/ ২৯ এপ্রিল, ২০১৬)